অবসরভাতা

অবসর কালীন তহবিল

অবসরভাতা বা পেনশন (বাংলা: Pension) অর্থ এমন একটি তহবিল যেখানে কোনও কর্মীর চাকরিতে নিযুক্ত থাকাকালীন সময়ে কিছু সংখ্যক অর্থ আলাদা করে যোগ করা হয় এবং যেগুলি থেকে পর্যায়ক্রমিক আকারে ব্যক্তির অবসর গ্রহণের পরে সহায়তা প্রদানের জন্য অর্থগুলি প্রদান করা হয়।[১] কতিপয় শর্তপূরণ সাপেক্ষে একজন সরকারি কর্মচারীর অবসর গ্রহণের পর প্রাপ্য অর্থ। কর্মচারীর ইচ্ছানুযায়ী এ ভাতা নির্ধারিত হারে মাসিক ভিত্তিতে কিংবা থোক অঙ্কে এককালীন পরিশোধ করা যায়।[২]

এককালীন ভাতা গ্রহণ করলে কর্মচারীকে মাসিক অবসরভাতা প্রাপ্তির দাবি ত্যাগ করতে হয়। তাই বলা যায় অবসরভাতা চাকুরিজীবীর কল্যাণের জন্য একটি তহবিল যা ব্যক্তির অবসরে যাওয়ার সময় নিয়মমাফিক পদ্ধতিতে অবসর জীবনের কল্যাণের জন্য প্রদান করা হয়। সরকারি কর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪ অনুসারে কোনো কোনো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসহ সকল সরকারি সংস্থার কর্মচারীকে ৫৯ বছর বয়স পূর্ণ হলে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করতে হয়।[২] এ আইনে অবসরগ্রহণের বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। ব্যতিক্রমের আওতায় রয়েছে প্রতিরক্ষা সার্ভিসের সদস্য; সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কর্মচারী; বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত কমিশন, কমিটি বা বোর্ডে নিয়োজিত ব্যক্তি; নির্বাচন বা মনোনয়নের মাধ্যমে নিয়োজিত ব্যক্তি; কিংবা ওই সকল কর্মচারী যাদের কার্যকাল অন্য কোনো আইনে বা আইনের অধীনে নির্ধারিত। কিন্তু কোনো কর্মচারী ৫৯ বছর বয়সে উপনীত হোন বা না-হোন, তার চাকুরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে এ একই আইনে তাকে অবসর প্রদানের ক্ষমতা সরকারকে দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে, চাকুরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে একজন কর্মচারীও স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের দাবি করতে পারেন।[৩]

পারিবারিক অবসরভাতাসম্পাদনা

পারিবারিক অবসরভাতা নামে আরেক ধরনের অবসরভাতা রয়েছে। অবসরগ্রহণের পূর্বে কোনো সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে তার অবসরভাতা গ্রহণের জন্য তিনি পূর্বেই পরিবারের এক বা একাধিক সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন।[২] মৃত কর্মচারীর স্ত্রী বা অন্য কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী না থাকলে কর্তৃপক্ষ ওই কর্মচারীর অবসরভাতা গ্রহণের যোগ্য উত্তরাধিকারী নির্বাচনের অধিকার রাখে। অবসরভাতা প্রাপকের মৃত্যুর পর তার জীবিত স্ত্রী যতদিন পুনর্বিবাহ না করেন ততদিন পর্যন্ত আজীবন অবসরভাতা পাওয়ার অধিকারী। অবশ্য তিনি অবসরভাতা সমর্পণ করে এককালীন থোক অর্থ গ্রহণ করতে পারেন না।[২]

বাংলাদেশের অবসরভাতা বিস্তারিতসম্পাদনা

অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত হারে অবসরভাতা নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত ‘পেনশন সারণি’ নামে পরিচিত এ ভাতার হার সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির মোট মেয়াদের ভিত্তিতে ভিন্নতর হয়ে থাকে। এতে ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন হার রয়েছে। চাকুরির মেয়াদ ১০ বছর পূর্ণ হলে অবসরভাতার প্রাপ্যতা শুরু হয় এবং ২৫ বছর চাকুরিকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। সর্বশেষ প্রাপ্ত বেতনের ভিত্তিতে প্রাপ্য অবসরভাতার শতকরা হার ১০ বছর চাকুরির মেয়াদ পূর্তির ক্ষেত্রে ৩২% থেকে ২৫ বছর মেয়াদ পূর্তির ক্ষেত্রে ৮০% পর্যন্ত।[২] অবসরভাতা মঞ্জুরি একসময় ছিল এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ১৯৯৪ সালে প্রক্রিয়াটি অনেকখানি সহজ করা হয়।[২] কিন্তু তারপরও আবেদনপত্রের সঙ্গে বহুবিধ কাগজপত্রের সংযোগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে হালনাগাদ করাসহ দুই প্রস্ত সার্ভিসবুক সংরক্ষণ করতে হয়। পক্ষান্তরে, গেজেটেড কর্মচারীদের বেলায়ও চাকুরিতে স্থায়ীকরণ, পদোন্নতি, পদাবনতি বা আরোপিত অন্যান্য দন্ড, ছুটি, অবসর গ্রহণ বা মৃত্যু ইত্যাদি তথ্য সম্বলিত বিস্তারিত সার্ভিস রেকর্ড নিয়মিত সংরক্ষণ করতে হয়।[২] অবসরভাতার আবেদন প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৫ মাসের মধ্যে মঞ্জুরি কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট সার্ভিস রেকর্ড/সার্ভিস বুক হালনাগাদ করতে হয়। অনুরূপভাবে অবসরগ্রহণকারী কর্মকর্তার নিকট সরকারের কোনো পাওনা নেই এ মর্মে ‘না-দাবি’ সার্টিফিকেট ৩ মাসের মধ্যে সংগ্রহ করতে হয়। এরপর অবসর ভাতা প্রদানের আদেশ ইস্যু করে হিসাব নিরীক্ষা কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়। ‘না-দাবি’ প্রত্যয়নপত্র প্রাপ্তি বিলম্বিত হলে যে অঙ্কের অবসরভাতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পরিশোধযোগ্য তার অনধিক শতকরা ৮০ ভাগ প্রদানের জন্য সাময়িক অবসরভাতা আদেশ ইস্যু করার সুযোগ রয়েছে। পরিশেষে, একজন সরকারি কর্মচারীকে ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার আওতায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হলে তিনিও খেসারতি অবসরভাতা পাওয়ার অধিকারী হন। তবে এ ভাতার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির আদেশ প্রয়োজন হয়।[২]

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবসরভাতাসম্পাদনা

অনেক দেশ ও অঞ্চল তাদের অবসর গ্রহণের সময় (বা কোনক্ষেত্রে অক্ষম হয়ে গেলে) আয়ের জন্য তাদের নাগরিক এবং বাসিন্দাদের জন্য তহবিল তৈরি করেছে। সাধারণত এসব সুবিধা ভোগের জন্য নাগরিকের কর্মজীবন জুড়ে অর্থ প্রদানের প্রয়োজন পরে।[১] উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় বীমা বা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা নাগরিকের অবসর সময়ে তাদের দ্বারা গচ্ছিত অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবসরভাতা প্রদান করে থাকে। ৮০ টিরও বেশি দেশে সামাজিক অবসরভাতা রয়েছে।[১]

অক্ষম পেনশনসম্পাদনা

অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য কিছু পেনশন প্রদান করা হয়। সাধারণ অবসর সময়ের পূর্বে তাদের জন্য অবসর ও অবসর ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। অবসর গ্রহণের পরিকল্পনাগুলি কীভাবে অবসর সুবিধাগুলি নির্ধারণ করা হয় তার ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত ও শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে।[৪]

নির্ধারিত সুবিধা পরিকল্পনাসম্পাদনা

নির্ধারিত সুবিধা পরিকল্পনা একটি ঐতিহ্যবাহী সংজ্ঞায়িত পরিকল্পনা যাতে অবসর নেওয়ার সুবিধাটি বিনিয়োগের রিটার্নের উপর নির্ভর না করে কিছু সূত্র দ্বারা নির্ধারিত হয় যাতে করে সদস্যগন প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক সুরক্ষা হিসাবে সরকারী অবসরভাতা এক ধরনের সংজ্ঞায়িত সুবিধা সম্পন্ন অবসর পরিকল্পনা। এসব সুবিধা দেয়ার জন্য সরকারের আলাদা একটি হিসাব থাকে যা দেখাশোনার জন্য সরকারের আলাদা একটি শাখা কাজ করে। সংজ্ঞায়িত সুবিধা সম্পন্ন পরিকল্পনার একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ হল চূড়ান্ত বেতন পরিকল্পনা, যার অধীনে প্রদেয় পেনশনটি বছরের বহু বছরের কাজের সমান, অবসর গ্রহণের সময় সদস্যের বেতনের দ্বারা বহুগুণে বৃদ্ধিযোগ্য হার হিসাবে পরিচিত একটি গুণকের দ্বারা গুণিত হয়। চূড়ান্ত অর্জিত অর্থ একটি মাসিক পেনশন বা একক পরিমাণ হিসাবে পাওয়া যায় তবে সাধারণত মাসিক হিসেবে বেশি প্রদান করা হয়।[৫]

তহবিলসম্পাদনা

অবসরভাতা পরিকল্পনা তহবিল সাধারণত অর্থায়িত বা অনুদিত দুই প্রকারের হতে পারে। অপ্রত্যাশিত সংজ্ঞায়িত অবসরভাতা কোনও সম্পদ আলাদা করা হয় না এবং সেই সুযোগগুলি নিয়োগকর্তা বা অন্যান্য অবসর বিধিমোতাবেক প্রদান করা হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশগুলিতে রাজ্য কর্তৃক প্রদত্ত পেনশনের ব্যবস্থাগুলি অনুপলব্ধ, বর্তমান শ্রমিকদের অবদান এবং করের মাধ্যমে সরাসরি অবসর সুবিধা প্রদান করা হয়।[৬] অনেক ইউরোপীয় দেশের সামাজিক সুরক্ষা বা অবসরভাতা সুবিধা ব্যবস্থা অপ্রত্যাশিত,[৫] বর্তমান ট্যাক্স এবং সামাজিক সুরক্ষা অবদানের বাইরে সরাসরি অবসর সুবিধা প্রাপ্তির সুযোগও রয়েছে, যদিও বেশ কয়েকটি দেশে সংকর ব্যবস্থা রয়েছে যা আংশিকভাবে ব্যক্তিগত অর্থায়নে অর্থায়িত হয়।[৫]

বিতর্কসম্পাদনা

বাংলাদেশে অবসরভাতা সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রিতা পরিলক্ষিত হয় দীর্ঘদিন থেকেই, বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে।[৭][৮] বাংলাদেশ অবসর ও কল্যাণ সুবিধা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত (বেতন বাবদ মাসে সরকারি অনুদান) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরের পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ সুবিধা — এ দুই ধরনের সুবিধা পান। এ নিয়ম অনুযায়ী বয়স ৬০ বছর পার হলে অথবা চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসর গ্রহণ করেন। তবে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার ঐ নির্ধারিত পরিমাণে টাকা পায়। কমপক্ষে ১০ বছর পূর্ণ করে স্বেচ্ছায় অবসরে গেলেও জমাকৃত টাকা সুদসহ পাওয়া যায়।[৯] এ অবসরভাতার একটি অংশ ৪ শতাংশ হারে কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বেতন থেকে কেটে রাখা হয়, সেই পরিমাণের ভিত্তিতে সরকার অপর অংশ প্রদান করে ভাতা দিয়ে থাকে। তবে এ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের অভাবে অবসরভাতা সময়মত না পাওয়া নিয়ে অভিযোগ বর্তমান।[৮]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Country map"pension-watch.net 
  2. বাংলাপিডিয়ায় অবসরভাতা
  3. "Social protection in older age | Pension watch"www.pension-watch.net। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০২ 
  4. "Private Pensions/Les pensions privées" (PDF)। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-১৭ 
  5. Philip Coggan (৭ এপ্রিল ২০১১)। "Falling Short"দ্য ইকোনোমিস্ট। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২০ 
  6. "Unfunded Pension Plans"OECD Glossary of Statistical Terms। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০০৯ 
  7. "অবসরভাতার যাতাকলে পিষ্ট এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা"জাগোনিউজ২৪.কম। ২৯ জানুয়ারি ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২০ 
  8. নুর মোহাম্মদ (১৪ ডিসেম্বর ২০১৯)। "অবসরভাতার জন্য শিক্ষকদের কান্না"যায়যায়দিন। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২০ 
  9. "অবসরভাতার জন্য শিক্ষকদের কান্না"প্রথম আলো। ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০২০  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)