২০১৬ ধূলাগড় দাঙ্গা

ধূলাগড় দাঙ্গা মূলত পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার ধূলাগড় নামক স্থানে সংঘঠিত এক ধর্মিয় দাঙ্গা।২০১৬ সনের ১২ ডিসেম্বর তারিখে স্থানীয় হিন্দু লোকেরা ধর্মীয় উৎসব উপভোগ করার সময় মুসলমান মিছিলকারীদের সাথে তর্কবিতর্ক হয় । ১৩ ও ১৪ তারিখে হিন্দুদের উপর আক্রমণ করে ঘড় পুড়িয়ে দেওয়া হয়, হিন্দু ঘর ও দোকান লুণ্ঠন করা হয়[১][২][৩][৪]

পটভূমিসম্পাদনা

ধূলাগড় হাওড়া জেলার এক বাণিজ্য ও ঔদ্যোগিক কেন্দ্র।[৫] অঞ্চলটি নবান্ন থেকে ২০কিঃমি ও কলকাতা থেকে ২৮কিঃমি দূরত্বে অবস্থিত। ধূলাগড় পঞ্চলা ব্লকের অন্তর্ভুক্ত[৬]। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সন পর্যন্ত ১০৬টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংগঠিত হয়েছে[৭]

আক্রমণসম্পাদনা

১২ ডিসেম্বর তারিখে মিছিলকারীদের বাধা আরোপ করাতে হিন্সু-মুসলমানের সংঘর্ষ হয়। উভয়পক্ষই একে অপরকে বোমা নিক্ষেপ করেছিল[৮][৯] .[৯]।১৩ তারিখে মিলাদ-উল-নবী উৎসব উৎযাপন করার সময় পুনরায় সংঘর্ষ হয়। ক্ষুব্ধ মুসলমান জনতা হিন্দু স্থানীয় বাসিন্দার ঘরে বোমা নিক্ষেপ করে।হিন্দুদের মতে অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রমণ করা হয়েছিল[১০][১১]। মিলাদ-উল-নবীর মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা হিন্দুদের গৃহে বোমা নিক্ষেপ করেছিল। তবে মিছিলকারীদের মতে তাঁদের মিছিলে বাধা আরোপ করায় সংঘাত হয়েছিল[১২]।বহুলোক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল ও অন্যদিকে অনেকেই গৃহহীন হয়েছিল[১১] । অভিযুক্ত ৬৫জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল[১৩]। মুসলমানেরা দেশী বোম্ব বানিয়ে হিন্দু ঘরে নিক্ষেপের আভাস পেয়ে হিন্দু নিজগৃহ ছেড়ে বাচ্চা ও বয়স্কদের সঙ্গ করে পালিয়ে যায়।আক্রমণকারী দুর্বৃত্তরা সুযোগ পেয়ে ঘর লুণ্ঠন করে, টাকা ও সোণা চুরি করে এবং সর্বশেষে গৃহে আগুন লাগিয়ে দেয়[১৪] । পুলিশ ঘটনাস্থলীতে পৌঁছাতে দেরী এবং অসক্রিয়তার ফলে দুর্বৃত্তেরা লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করতে সক্ষম হয়েছিল বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছে[১৪] । তাঁরা হাফিংস্টোন পোস্ট নামক সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন যে মুসলমানেরা পাথর ও বোম্ব নিয়ে পূর্বপরিকল্পিত রূপে প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। অন্য এক প্রতিবেদন মতে আক্রমণকারীরা হিন্দুদের ঘর ছেড়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছিল[১৫]

পরিণামসম্পাদনা

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ প্রকাশ করা প্রতিবেদন মতে স্থানীয় বিতর্ক পরবর্তী সময়ে দাঙ্গার রূপ নিয়েছিল। অবশেষে ৫৮ জন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় ও প্রশাসনের থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল[১৬]। একজন রাজ্যিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে অপরাধীর বিরূদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল[১৭]। গভর্নর কেশরি নাথ ত্রিপাঠী পুলিশ সচিব সুরজীৎ কর ঘোষকে ঘটনাটি তদন্ত করে রিপোর্ট বানানোর আদেশ দিয়েছিলেন[১৮]। বহুসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ করুণ কাহিনী ইন্ডিয়া টুডে নামক সংবাদ মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। যদিও পুলিশ প্রশাসন থেকে ভীত না হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তথাপি ভুক্তভোগী জনতারা ভীতগ্রস্ত ছিল[১১] ।ধূলাগড় দাঙ্গাটি জি-নিউজ চ্যানেল সর্বপ্রথম প্রচার করা হয়েছিল ও এর মূখ্য সাংবাদিক সুধীর চৌধুরীর বিরূদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা পূজা মেহতা ও কেমেরাম্যান তন্ময় মূখার্জী শঙ্করেল আরক্ষী থানায় অভিযুক্ত নথিভুক্তের কোন সন্ধান পায় নাই অপরদিকে নিউ ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল[১৯] । প্রায় এক সপ্তাহ পর সব্যসাচী রমন মিশ্রকে ব্যর্থতার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার স্থানান্তর করে[২০]। দাঙ্গা সংঘটিত এলেকায় বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংবাদ মাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কংগ্রেস, বিজেপি ও সিপিআইএম প্রভৃতি রাজনৈতিক দলকে উক্তস্থানে প্রবেশ করাতে পুলিশ বাধা দিয়েছিল[১৪]। রাজ্য সরকার দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারদের ৩৫০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিয়েছিল যদিও ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণ খুবই স্বল্প বলে উল্লেখ করেছে[১৭]। ভুক্তভোগীরা নিজ গৃহে ফিরে যেতে খুবই চিন্তিত ছিল[১৪][১৭] তাই দাঙ্গার সংঘটিত হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর পর্যন্ত তাঁরা গৃহহারা হয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিল[১৪]। কিছুসংখ্যক ব্যক্তি কলকাতা কলকাতা উচ্চ ন্যায়ালয়ে ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য দাবী জানিয়েছিল।২০১৭ সনের জানুয়ারী মাসে প্রথম বিচারের দিন উকিলেরা অভিযোগ তুলেছিল যে পুলিশেরা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই তাই দাঙ্গাটি অতিমাত্রায় বেড়ে উঠেছিল[২১]

প্রতিক্রিয়াসম্পাদনা

বিজেপি নেতা সিদ্ধার্থ নাথ সিং দাঙ্গার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করেছেন[২২]।পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি দল দাঙ্গাটিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রূপে মানব অধিকার পরিষদকে অবগত করানোর ঘোষণা করে[২২]। বিজেপির অভিযোগ মতে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক গুলশন মল্লিকের তত্বাবধানে আক্রমণকারীদের বহিরাঞ্চল থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল। রূপা গাঙ্গুলি দাবী করেছেন যে আক্রমণের সময় গুলশন মল্লিক উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরও বলেছেন যে মেতিয়াব্রুজ ও অন্যান্য স্থান থেকে আক্রমণকারীরা এসেছিল[২৩]। পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধূলাগড়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন[১৭]। তিনি দাঙ্গাটিকে আঞ্চলিক সমস্যা ও ছোট সংঘর্ষ বলে উল্লেখ করেছেন। সংবাদ মাধ্যমে অসত্য সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন[১৭]।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে অনুরূপ দাঙ্গা বহুবার সংঘঠিত হওয়ার ফলে তাঁকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ আস্থা লঙ্ঘন’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল[৫]। তৃণমূলেরা বলেছিল যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও বিজেপি নেতারা অসত্য বিবরণ প্রকাশ করে সাম্প্রদায়িক ব্যাঘাতের প্রচেষ্টা করছে।

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "The Truth Behind The Riots In Bengal That The Media Doesn't Report"। Huffington Post India। ২০ মার্চ ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৪ এপ্রিল ২০১৭ 
  2. "Dhulagarh riots: West Bengal town on the boil after communal violence"Firstpost। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১৪ এপ্রিল ২০১৭ 
  3. "What actually happened during the Dhulagarh riots?"। Dailyo। সংগ্রহের তারিখ ১৪ এপ্রিল ২০১৭ 
  4. "Howrah: 25 held after communal clash"। The Indian Express। ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১৫ এপ্রিল ২০১৭ 
  5. Merchant, Minhaz (২৮ ডিসেম্বর ২০১৬)। "How Mamata tore the secular fabric of Bengal into shreds"DailyO। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ 
  6. "Block Wise Details of Minority Population as Census 2001: Howrah"। West Bengal State Marketing Board। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  7. http://indianexpress.com/article/india/politics/communal-clashes-soar-in-bengal/
  8. "Dhulagarh riots: West Bengal town on the boil after communal violence"Firstpost। Firstpost। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ১৪ এপ্রিল ২০১৭ 
  9. "Times Now Report From Dhulagarh: The Story India Isn't Reporting"TimesNow। ২০১৬-১২-২৩। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৪-১৫ 
  10. "Dhulagarh riot: Pressure mounts on Bengal govt as Governor summons DGP | Latest News & Updates at Daily News & Analysis"dna (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৬-১২-২২। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৪-১৫ 
  11. "West Bengal: Dhulagarh in Howrah simmers after clashes over a religious procession"India Today। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৪-০২ 
  12. "Dhulagarh riots: West Bengal town on the boil after communal violence"Firstpost (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৬-১২-২৮। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৪-০২ 
  13. "'Beef' thrown in temple: Bengal govt worried as communal clashes spread"Firstpost (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৭-০১-২৯। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৭-১০ 
  14. Kundu, Indrajit (২৮ ডিসেম্বর ২০১৬)। "Rather than protecting, Bengal police gave us 2 minutes to flee our own homes: Dhulagarh riot victims tell India Toda"India Today। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ 
  15. "The Truth Behind The Riots In Bengal That The Media Doesn't Report"Huffington Post India। ২০ মার্চ ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৩-২৮ 
  16. "58 People Arrested In Dhulagarh Case, Claims West Bengal Police"Times Now। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-১২-৩০ 
  17. "Mamata Banerjee denies riot in Dhulagarh, blames social media"Indian Express। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ 
  18. "WB Governor Keshari Nath Tripathi summons DGP Surajit Kar Purkayastha"India Today। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-১২-২৩ 
  19. "Zee News booked for Dhulagarh riot coverage, claims editor Sudhir Chaudhary"The New Indian Express। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৪-০২ 
  20. "Sabya Sachi Raman Mishra removed as SP, Howrah (Rural)"PTI News। ২১ ডিসেম্বর ২০১৬। 
  21. "ধূলাগড়ের ঘটনায় পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে ? জানতে চাইল হাইকোর্ট" (Bengali ভাষায়)। ১২ জুন ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  22. "BJP to move NHRC over Dhulagarh riots"The Hindu। ২১ ডিসেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ 
  23. "Dhulagarh Violence: Alleged Bomb Maker Arrested, Say Police Sources"NDTV.com। সংগ্রহের তারিখ ২ জানুয়ারি ২০১৭