স্লাইড ক্যালিপার্স

স্লাইড ক্যালিপার্স এক প্রকারের পরিমাপক যন্ত্র যার সাহায্যে কোন বস্তুর দু প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ণয় করে পরিমাপ করা যায়। এ যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করতে ভার্নিয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় বলে অনেক সময় একে ভার্নিয়ার ক্যালিপার্সও বলা হয়ে থাকে। স্লাইড ক্যালিপার্স ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ধাতুর দৈর্ঘ্য নির্ণয়, কাঠের মাপ-জোখ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

ভার্নিয়ার ক্যালিপারের বিভিন্ন অংশ:
  1. বাহিরের চোয়াল: এ অংশের সাহায্যে গোলাকার বস্তুর বাহ্যিক ব্যাস বা পুরুত্ব নির্ণয় করা হয়।
  2. ভিতরের চোয়াল:এ অংশের সাহায্যে বস্তুর অভ্যন্তরীণ ব্যাস পরিমাপ করা হয়।
  3. গভিরতা নির্ণায়ক:এর সাহায্যে কোন বস্তুর পুরুত্ব বা গর্তের গভীরতা নির্ণয় করা যায়।
  4. প্রধান স্কেল: মিলিমিটার স্কেল
  5. প্রধান স্কেল: ইঞ্চি এককে দাগাঙ্কিত স্কেল
  6. ভার্নিয়ার স্কেল: ভার্নিয়ার স্কেলের একটি অংশ যেটি আনুমানিক 0.1mm পর্যন্ত নিখুত হিসেব করতে পারে।
  7. ভার্নিয়ার স্কেল: ভার্নিয়ার স্কেলের আরেকটি অংশ যা এক ইঞ্চির ভগ্নাংশ পর্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করতে পারে।
  8. ভার্নিয়ার ধারক: এ অংশটি ভার্নিয়ার স্কেলকে প্রধান স্কেলের সাথে আটকে রাখতে ও চলাচল করতে সাহায্য করে।

ইতিহাসসম্পাদনা

ইতালীয় সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত গ্রিক দেশের গিগলিও দ্বীপে প্রাপ্ত জাহাজের ধ্বংসাবশেষের মাঝে সর্বপ্রথম স্লাইড ক্যালিপার্সটি পাওয়া গিয়েছিল। জাহাজের ধ্বংসাবশেষগুলো ছিল খ্রীস্টের জন্মেরো প্রায় ৬ শতক পূর্বের। কাঠের তৈরি উক্ত ক্যালিপার্সটিতে অাধুনিক ক্যালিপার্সের মতই ছিল একটি অাবদ্ধ ও একটি চলাচলে সক্ষম চোয়াল। [১][২] দূর্লভ হলেও, গ্রীক ও রোমানরা স্লাইড ক্যালিপার্স ব্যবহার করা চালিয়ে গিয়েছিল। [৩]
হ্যান সাম্রাজের সময় (২২০ খ্রীস্টপূর্ব - ২২০ খ্রীস্টাব্দ) চায়নাতেও স্লাইড ক্যালিপার্স ব্যাবহারের নমুনা পাওয়া যায়। ব্রোঞ্জ নির্মিত ক্যালিপার্সটির প্রত্যেকটি অংশের সাথেই চায়নার যুগ ও চন্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে সেটি তৈরীর সময় খোদাইকৃত ভাবে লিখা ছিল। [৪]
অ্যামেরিকাবর বিজ্ঞানী জোসেফ অার. ব্রাউন ১৮৯১ সালে সর্ব প্রথম অাধুনিক স্লাইড ক্যালিপার্স অাবিষ্কার করেন, যা এক ইঞ্চির ১ হাজার ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত সঠিকভাবে মাপতে পারতো। তার "Brown and Sharpe" নামের কোম্পানি সর্বপ্রথম তা অ্যামেরিকায় বাজারজাত করা শুরু করেছিল। সাধারন যন্ত্রকারকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল এমন প্রথম ব্যবহারিক যন্ত্রও ছিল এটি। [৫]

গঠনসম্পাদনা

একটি ধাতুর তৈরি আয়তকার দণ্ডের ওপর নির্দিষ্ট এককের দাগ কেটে স্লাইড ক্যালিপার্সের প্রধান স্কেল তৈরি করা হয়। প্রধান স্কেল যেখান থেকে শুরু হয় অর্থৎ যে প্রান্তে শূন্য দাগ কাটা থাকে সেখানে একটি ধাতব চোয়াল থাকে। আবার প্রধান স্কেলের গায়ে চোয়াল যুক্ত একটি ভার্নিয়ার স্কেল পরানো থাকে। এ ভার্নিয়ার স্কেলটি প্রধান স্কেলের ওপর সামনে-পেছনে সরানো যায়। এ স্কেলের সাথে আবার একটি স্ক্রু সংযুক্ত আছে যার সাহায্যে স্কেলটিকে প্রধান স্কেলের যে কোন স্থানে আটকিয়ে রাখা যায়।

ব্যবহারসম্পাদনা

 
ভার্নিয়ার ক্যালিপারের ব্যবহার প্রণালি

প্রথমে যে বস্তুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে হবে তাকে স্লাইড ক্যালিপার্সের চোয়াল দুটির মাঝে রাখতে হবে। তারপর ভার্নিয়ার স্কেলের সাথে লাগানো চোয়াল সামনে এনে এমন ভাবে বস্তুর সাথে লাগাতে হয় যেন প্রধান স্কেলের চোয়াল ও ভর্নিয়ার স্কেলের সাথে সংযুক্ত চোয়াল বস্তুটিকে দু বিপরীত দিক থেকে স্পর্শ করে থাকে। অতঃপর স্ক্রুর সাহায্যে ভার্নিয়ারটিকে প্রধান স্কেলের সাথে আটকানো হয়। এরপর প্রধান স্কেলের পাঠ ও ভার্নিয়ারের পাঠ নেওয়া হয়।
এখন বস্তুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে গেলে কয়েকটি বিষয় জানা প্রয়োজন- ভার্নিয়ার ধ্রুবক, প্রধান স্কেল পাঠ, ভার্নিয়ার সমপাতন, যান্ত্রিক ত্রুটি।

ভার্নিয়ার ধ্রুবকসম্পাদনা

প্রধান স্কেলের ক্ষুদ্রতম এক ভাগের চেয়ে ভার্নিয়ার স্কেলের এক ভাগ ঠিক কতটুকু ছোট তার পরিমাণকে ভার্নিয়ার ধ্রুবক বলে।
এখন প্রধান স্কেলের ক্ষুদ্রতম এক ভাগের দৈর্ঘ্য s এবং ভার্নিয়ার স্কেলের ভাগ সংখ্যা n হলে, ভার্নিয়ার ধ্রুবক= s/n
যেমন: প্রধান স্কেলের ক্ষুদ্রতম এক ভাগের দৈর্ঘ্য 1 মি.মি. এবং ভার্নিয়ার স্কেলের ভাগ সংখ্যা 10 হলে, ভার্নিয়ার ধ্রুবক হবে= 1/10 মি.মি.=0.1 মি.মি. বা 0.01 সে.মি.।

প্রধান স্কেল পাঠসম্পাদনা

মনেকরি, যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে হবে তার একটি প্রান্ত প্রধান স্কেলের শূন্য দাগের সাথে মিলে আছে। এ অবস্থায় ভার্নিয়ার স্কেলের সাথে সংযুক্ত চোয়ালটিকে বস্তুটির অপর প্রান্তে স্পর্শ করাতে হবে। যদি বস্তুটির অপর প্রান্তটি প্রধান স্কেলের M মি.মি. দাগ অতিক্রম করে (ধরি), তবে এটিই হবে ভার্নিয়ার পাঠ।

ভার্নিয়ার সমপাতনসম্পাদনা

দেখতে হবে উপরিউক্ত অবস্থায় ভার্নিয়ারের কোন দাগটি প্রধান স্কেলের কোন দাগের সাথে মিলেছে বা সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে। এ দাগটিই হবে ভার্নিয়ার সমপাতন।

যান্ত্রিক ত্রুটিসম্পাদনা

মূল স্কেলের চোয়াল এবং ভার্নিয়ার স্কেলের চোয়াল যখন পরস্পরকে স্পর্শ করে থাকে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভার্নিয়ার স্কেলের শূন্য দাগ মূল স্কেলের শূন্য দাগের সাথে মিলে যায়। কখনও কখনও যান্ত্রিক ত্রুটি থাকলে নাও মিলতে পারে। ভার্নিয়ারের শূন্য দাগ মূল স্কেলের শুন্য দাগের ডান পাশে থাকলে ত্রুটি হবে ধনাত্মক আবার যদি ভার্নিয়ারের শূন্য দাগ মূল স্কেলের শুন্য দাগের বাম পাশে থাকে তাহলে ত্রুটি ঋণাত্মক হবে। ভার্নিয়ার স্কেলের 0 দাগ প্রধান স্কেলের 0 দাগের ডানে বা বামে থাকা অবস্থায় ভার্নিয়ারের যত দাগ মূল স্কেলের যে কোনো একটি দাগের সাথে মিলেছে, তাকে ভার্নিয়ার ধ্রুবক দ্বারা গুণ করে যান্ত্রিক ত্রুটি নির্ণয় করা হয় । যেমন :

প্রদত্ত চিত্রে, স্লাইড ক্যালিপার্সটির চোয়াল দুটি একত্রতির থাকা অবস্থায় ভার্নিয়ারের শূন্য দাগ প্রধান স্কেলের শূন্য দাগের ডানে থাকায় যন্ত্রটিতে ধনাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে । এখন চোয়াল দুটি একত্রিত অবস্থায় ভার্নিয়ার স্কেলের 5 তম দাগ প্রধান স্কেলের একটি দাগের সাথে মিলে যায় ।যন্ত্রটির ভার্নিয়ার ধ্রুবক 0.02 মিমি. ।সুতরাং,

যান্ত্রিক ত্রুটির মান = (.02×5) mm = + 0.10 m

বস্তুর দৈর্ঘ্য নির্ণয় সূত্রসম্পাদনা

বস্তুর দৈর্ঘ্য(L)= প্রধান স্কেল পাঠ (M)+ ভার্নিয়ার সমপাতন(V)× ভার্নিয়ার ধ্রুবক(VC)- [যান্ত্রিক ত্রুটি (±e)][৬]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Mensun Bound: The Giglio wreck: a wreck of the Archaic period (c. 600 BC) off the Tuscany island of Giglio, Hellenic Institute of Marine Archaeology, Athens 1991, p.27 & 31 (Fig.65)
  2. Roger B. Ulrich: Roman woodworking, Yale University Press, New Haven, Conn., 2007, আইএসবিএন ০-৩০০-১০৩৪১-৭, p.52f.
  3. "hand tool." Encyclopædia Britannica from Encyclopædia Britannica 2006 Ultimate Reference Suite DVD .[Accessed July 29, 2008]
  4. Temple, Robert. (1986). The Genius of China: 3,000 Years of Science, Discovery, and Invention. With a forward by Joseph Needham. New York: Simon and Schuster, Inc. আইএসবিএন ০-৬৭১-৬২০২৮-২. Page 86–87.
  5. Joseph Wickham Roe, English and American tool builders (1916) p. 203
  6. মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান বই (অধ্যায়-২; পৃষ্ঠা-২১)|রচনা:ড. শাহাজাহান তপন,মুহাম্মদ আজিজ হাসান,ড. রানা চৌধুরী|সম্পাদনা: ড. আলী আসগল|প্রকাশক: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,ঢাকা|সংস্করণ: ডিসেম্বর, ২০০৮