সুহৃদ কুমার রায়

সুহৃদ কুমার রায় (ইংরেজি: Suhrid Kumar Roy )( ১ জানুয়ারি, ১৮৯৫ - ১৬ জুলাই , ১৯৫৯ ) ছিলেন একজন খ্যাতনামা ভূবিজ্ঞানী । ভারতের অন্যতম শিলাতত্ত্ব ও অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ববিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তিত্ব। [১]

সুহৃদ কুমার রায়
জন্ম০১ জানুয়ারি ১৮৯৫
মৃত্যু১৬ জুলাই ‌ ১৯৫৯ (বয়স ৬৪)
জাতীয়তাভারতীয়
মাতৃশিক্ষায়তনবঙ্গবাসী কলেজ , প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়
পেশাশৈল তাত্বিক ও অর্থনৈতিক ভূবিজ্ঞানী।
দাম্পত্য সঙ্গীফ্রাঁ হারমিন
সন্তানশঙ্কর রায়
রঞ্জন রায়
প্রতাপ রায়
পিতা-মাতাসয়ারাম রায় (পিতা)

জন্ম ও শিক্ষা জীবনসম্পাদনা

সুহৃদ কুমার রায়ের জন্ম বৃটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কুরুলগাছি গ্রামে । তিনি সয়ারাম রায়ের কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন। এঁরা নদীয়ার রাজ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সুহৃদ কুমারের মাতা অতি অল্প বয়সে প্রয়াত হওয়ায় তিনি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও পিতার সাহচর্যেই প্রতিপালিত হন। বিদ্যালয়ের পড়াশোনা স্থানীয় স্কুলে। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ভবানীপুরের লণ্ডন মিশনারি সোসাইটি ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শ্রেণীতে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে আই.এসসি পাশের পর প্রেসিডেন্সি কলেজ। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ভূবিজ্ঞানে অনার্স সহ স্নাতক হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তিনি আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সংস্পর্শে আসেন। মেঘনাদ সাহা ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হিন্দু হস্টেলে থাকার সুবাদে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রেরণায় জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হন এবং তাঁর সে চেতনা আরো দৃঢ় হয় যখন নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তথা পরবর্তীতে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সংস্পর্শে আসেন। প্রখর স্মৃতি শক্তির কারণে গুপ্ত বিপ্লবী দল যুগান্তর সদস্যদের মধ্যে সখ্যতা ও পত্রবাহকের কাজ করতেন তিনি । দলের সক্রিয় সদস্যদের দ্বারা প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত রড্ডা কোম্পানির অস্ত্র ডাকাতির ঘটনায় জড়িয়ে ধরা পড়েন ও কিছু দিন অন্তরীণ থাকেন। ১৯১৮-১৯ খ্রিস্টাব্দে বনদপ্তরে কাজ পান। কর্মনৈপুণ্যে ও বিশ্বস্ততার সুবাদে পুরস্কৃত হন এবং উচ্চশিক্ষার্থে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ গমন করেন। ১৯২১ - ২৪ খ্রিস্টাব্দে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে আকরিক বিষয়ে বা খনিজতত্ত্ব এবং শিলাতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত স্ফটিকবিজ্ঞানী তথা ক্রিস্টালোগ্রাফার অধ্যাপক পল নিগলী অধীনে গবেষণা করে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন।[২]

কর্মজীবনসম্পাদনা

ইউরোপে হতে ফিরে সুহৃদ কুমার বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বাঁসদা রাজ্যের (বর্তমানে গুজরাটের অন্তর্ভুক্ত) ভূবিজ্ঞানী নিযুক্ত হন। পরে হিমাচল প্রদেশের মাণ্ডিতে লৌহ আকরিক ও খনিজ লবণ সর্বেক্ষণের জন্য ভূবিজ্ঞানী নিযুক্ত হন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা জানুয়ারি ধানবাদের ইণ্ডিয়ান স্কুল অফ মাইন্সের (বর্তমানে ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ) অধ্যাপক ও ভূতত্ত্ববিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ আঠারো বৎসর অধ্যাপনা করেছেন। অধ্যাপনা কালে তিনি অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ববিদ্যার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। সন্নিহিত ঝরিয়ার কয়লাক্ষেত্রের নিম্নমানের কয়লা হতে জ্বালানি জন্য খনিজ তৈল উৎপাদন ও বিহারের (বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের) অভ্র উৎপাদন ও অভ্রশিল্পের অগ্রগতি, হাজারিবাগ জেলার কোডারমার অভ্রশিল্পের অগ্রগতিতে, রঞ্জক পদার্থ নিষ্কাশনে অবদান রেখেছেন। তিনি ভূতত্ত্ববিভাগের সিলেবাস প্রণয়নে সেই মত ফলিত দিক তথা ব্যবহারিক বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪২-৪৩ খ্রিস্টাব্দে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়ায় বিশেষ অধিকারিক হিসাবে বর্তমানে রাজস্থানের উদয়পুর জেলার জাওয়ারে সঞ্চিত দস্তা-তামা আকরিকের ভূতাত্ত্বিক জরিপ করেন এবং সে সম্পর্কে তিনি যে ধারণা দেন তা পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়। মূলতঃ,অধ্যাপনার সাথে অধ্যাপক রায়ের ভূমিকা ছিল শৈলতাত্ত্বিক (petrology) ও অর্থনৈতিক ভূবিজ্ঞানের (economic geology) দিকে। প্রসঙ্গত, জুরিখে গবেষণায় লিপ্ত থাকার সময় জার্মানি দক্ষিণাঞ্চলের বনভূমিতে তথা Hercynian Mountains অঞ্চলে (Southern Black Forest, Germany) শিলাতত্ত্বের উপর বিশেষ পর্যবেক্ষণে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাছাড়া গ্রানাইট পাথর,পাললিক শিলা ও তার অভ্যন্তরস্থ ভারী খনিজ সমাবেশ ইত্যাদির খোঁজ, অর্থনৈতিক দিক থেকে সেই মূল্যবান পদার্থের সম্ভাবনা ইত্যাদি ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু। প্রথম ভারতীয় ভূবিজ্ঞানী হিসাবে তিনি তাঁর ছাত্রদের সাথে বিশেষভাবে এই বিষয়ের উপর অভিজ্ঞতা বিনিময় করতেন। এর ফলে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের শ্রদ্ধাভাজন হতে পেরেছিলেন।

সম্মাননাসম্পাদনা

অধ্যাপক সুহৃদ কুমার রায় ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ ইণ্ডিয়ান আকাদেমি অব সাইন্সের'পৃথিবী ও গ্রহ বিজ্ঞান' বিষয়ে ফেলো নির্বাচিত হন। [৩] ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থার ভূতত্ত্ববিভাগের সভাপতি নির্বাচিত হন। জিওলজিক্যাল,মাইনিং ও মেটালার্জিক্যাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার সভাপতি হন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্গালোরের ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল সাইন্স একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন।

পারিবারিক জীবনসম্পাদনা

অধ্যাপক সুহৃদ কুমার রায় জার্মান মহিলা ফ্রাঁ হারমিন কে বিবাহ করেন। এঁদের তিন পুত্র সন্তান। তারা হলেন - শঙ্কর রায়, রঞ্জন রায় ও প্রতাপ রায়।

জীবনাবসানসম্পাদনা

অবসরের পর অধ্যাপক সুহৃদ কুমার রায় আসানসোলে নিজের বাসভবন "এনক্লেভ" বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ই জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাসভবন "এনক্লেভ" এ ৬৪ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Deceased Fellow Detail" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৫-০৭-২০২০  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)
  2. Biographical Memoirs, page 97 - 101, published by Indian National Academy of Sciences, Bangalore
  3. "Suhrid Kumar Roy" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৬-০৭-২০২০  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)