সুরেশচন্দ্র মজুমদার

সুরেশচন্দ্র মজুমদার (ইংরেজি: Suresh Chandra Majumdar) (ডিসেম্বর,১৮৮৮ - ১২ আগস্ট, ১৯৫৪), স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীদের অন্যতম সহকারী, মুদ্রণ শিল্পের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, বাংলা হরফে লাইনো টাইপের প্রবর্তক ও আনন্দবাজার পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । [১]

সুরেশচন্দ্র মজুমদার
জন্মডিসেম্বর, ১৮৮৮
মৃত্যু১২ আগস্ট, ১৯৫৪
জাতীয়তাভারতীয়
নাগরিকত্বভারতীয় ভারত
পেশামুদ্রণ, প্রকাশনা,
পরিচিতির কারণবাংলা হরফের সংস্কার সাধন

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

সুরেশচন্দ্র মজুমদারের জন্ম বৃটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। পিতার নাম মহেন্দ্রনাথ মজুমদার। পড়াশোনা কৃষ্ণনগরের জেলা স্কুলে। এই স্কুলে উচ্চ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে বাঘা যতীনের প্রেরণায় বিপ্লবী কাজকর্মে যুক্ত হন। সেসময় তিনি পিতৃবন্ধুর এক জামাতা পূর্ণচন্দ্র মৌলিকের রিভলবার অপহরণ করে বাঘা যতীনকে দেন। কিছুকাল পরে হাইকোর্টের এক কর্মচারী শামসুল আলমকে ওই রিভলবার দিয়ে হত্যা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি ষোল মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। কারাবাসে থাকাকালে তার পিতৃবিয়োগ ঘটে। পড়াশোনা কিছুদিন স্থগিত হয়। পরে অবশ্য বহু কষ্টে এন্ট্রান্স পাশ করেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

পরীক্ষা পাশের পর উপার্জনের আশায় চলে আসেন কলকাতায় এবং শিক্ষানবিশ কম্পোজিটাররূপে জেনিস কোম্পানিতে যোগ দেন। ক্রমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর সামান্য মূলধন জোগাড় করে "শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেস" নামে তিনি নিজেই এক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতায়। জাতীয়তাবাদী পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আবাল্য বন্ধু প্রফুল্লকুমার সরকারের সাহায্যে ও সম্পাদনায় ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই মার্চ আনন্দবাজার পত্রিকা প্রকাশ করেন। তারই উদ্যোগে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাহিত্য পত্রিকা "দেশ" এবং ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ মালিকানাধীন ইংরাজী সংবাদপত্র 'দ্য স্টেটসম্যান' এর প্রতিপক্ষ হিসাবে ভারতীয়দের ইংরাজী দৈনিক ' হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড' (১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশনা বন্ধ হয়) প্রকাশ করেন। ক্রমশঃ পত্রিকাগুলি জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা হিসাবে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠলে বহু বিপ্লবী কর্মী আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীতে (বর্তমানে এবিপি গ্রুপ) চাকরি পান।সুরেশচন্দ্র নিজে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। তিরিশের দশকে তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসুর মহানিস্ক্রম্মনের ব্যবস্থাপনায় তার যোগাযোগ ছিল। ফলস্বরূপ ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। তার সময়ে জাতীয়তাবাদে আনন্দবাজার পত্রিকার যথেষ্ট অবদান ছিল।

বাংলা হরফে সংস্কার সাধনসম্পাদনা

আনন্দবাজার পত্রিকায় থাকাকালে সুরেশচন্দ্র মজুমদারের অক্ষয় কীর্তি হল বাংলা হরফের সংস্কার সাধন। রাজশেখর বসুর পরামর্শে বাংলা হরফের বিরাট আকারের সংস্কার সাধন করেন লাইনো টাইপের প্রবর্তন করে । তিনি স্বরবর্ণের 'কার'-চিহ্নগুলি সকল ক্ষেত্রে একই আকারের রাখার ব্যবস্থা করলেন এবং এগুলি ব্যঞ্জন বা যুক্তব্যঞ্জনের নিচে বা উপরে না বসিয়ে সামান্য ডানে বা বামে সরিয়ে আলাদা অক্ষর হিসেবে ছাপার ব্যবস্থা করলেন। এছাড়াও তিনি অনেক যুক্তব্যঞ্জনের একই উপাদান ব্যঞ্জনাক্ষরের সাধারণ আদল আলাদা করে সেটির হরফ বানালেন, ফলে যুক্তব্যঞ্জন ছাপানোতেও হরফের সংখ্যার অনেক সাশ্রয় হল। এর ফলে তিনি বাংলা হরফের আগে যেখানে প্রায় ৬০০ টির ব্যবহার ছিল, তা চাবির ডালায় ১২৪টিতে এবং বিবিধ আরও ৫০টিতে নামিয়ে আনতে পেরেছিলেন।

রাজনীতি ও সাংগঠনিক বিষয়সম্পাদনা

১৯২৭ - ৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি উত্তর কলকাতা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি হন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় মুদ্রক সমিতি গঠিত হলে (বর্তমানে যেটি "ওয়েস্ট বেঙ্গল মাস্টার প্রিন্টার্স অ্যাসোসিয়েশন" নামে পরিচিত) তিনি দ্বিতীয় সভাপতি (১৯৪৫- ৫৪) নির্বাচিত হন। পরে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় সংগঠন 'অল ইন্ডিয়া ফেডারেশন অফ মাস্টার প্রিন্টার্স'-এর প্রথম সভাপতি হন। [২] ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্র-স্মৃতি রক্ষা কমিটির সম্পাদক নিযুক্ত হয়ে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী "রবীন্দ্র ভারতী" র সৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের প্রার্থীরূপে গণ পরিষদে নির্বাচিত ও ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে রাজ্যসভার সদস্য হন। [৩] গণ পরিষদের সদস্য হিসাবে স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনায় তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।

জীবনাবসানসম্পাদনা

অকৃতদার সুরেশচন্দ্র মজুমদার ৬৫ বৎসর বয়সে ইংরাজী ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ই আগস্ট পরলোক গমন করেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬ পৃষ্ঠা ৮১৯, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  2. WBMPA "WBMP Association profile"। সংগ্রহের তারিখ ১২ আগস্ট ২০২০ 
  3. "RAJYA SABHA MEMBERS BIOGRAPHICAL SKETCHES 1952 - 2003" (PDF)Rajya Sabha। সংগ্রহের তারিখ ১২আগস্ট ২০২০  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ= (সাহায্য)