সুয়েজ খাল

কৃত্তিম খাল

সুয়েজ খাল (ইংরেজি: Suez Canal, আরবি: قناة السويس‎‎) মিশরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত একটি কৃত্তিম সামুদ্রিক খাল। এটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। দশ বছর ধরে খননের পর পথটি ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। উত্তরে ইউরোপ থেকে দক্ষিণে এশিয়া, উভয়প্রান্তে পণ্যপরিবহনে সুয়েজ খাল একটি জলপথ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, এতে করে সম্পূর্ণ আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে আসতে হয়না। খালটি উন্মুক্ত হবার পূর্বে, কখনো কখনো পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে মিশরের স্থলপথ অতিক্রম করে, ভূমধ্যসাগর হতে লোহিত সাগরে এবং লোহিত সাগর হতে ভূমধ্যসাগরে অপেক্ষমাণ জাহাজে পারাপার করা হত। এর ব্যপ্তি ভূমধ্যসাগরের পোর্ট আবু সাঈদ হতে লোহিত সাগরের সুয়েজ (আল-সুওয়েজ) পর্যন্ত। ফার্দিনান্দ দে লেসেপ্স নামক একজন ফরাসি প্রকৌশলী এই খাল খননের উদ্যোক্তা।

সুয়েজ খাল
{{{alt}}}
পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে সুয়েজ খালের ছবি, সৌজন্যে নাসা
মূল মালিক সুয়েজ ক্যানেল কোম্পানি (Compagnie Universelle du Canal Maritime de Suez)
নিমার্ণ শুরু এপ্রিল ১৮৫৯
নিমার্ণ শেষ নভেম্বর ১৮৬৯
বন্ধ স্থান 0
অবস্থা চালু
নৌ-চালনা কর্তৃপক্ষ সুয়েজ ক্যানেল অথরিটি

শুরুতে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৬৪ কিলোমিটার (১০২ মাইল) এবং গভীরতা ছিল ৮ মিটার (২৬ ফুট)। বেশ কিছু সংস্কার ও সম্প্রসারণের পর ২০১০ সালের হিসাব মতে এর দৈর্ঘ্য ১৯০.৩ কিলোমিটার (১২০.১১ মাইল), গভীরতা ২৪ মিটার (৭৯ ফুট) এবং সর্বনিম্ন সরু স্থানে এর প্রস্থ ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট)। এর মধ্যে উত্তর প্রবেশ চ্যানেল এর দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার/১৪ মাইল, মূল খালে দৈর্ঘ্য ১৬২.২৫ কিলোমিটার/১০০.৮২ মাইল এবং দক্ষিণ প্রবেশ চ্যানেল এর দৈর্ঘ্য ৯ কিলোমিটার/৫.৬ মাইল।

এটি একটি এক লেন বিশিষ্ট খাল যাতে দুটি বাই-পাসের স্থান আছে, এগুলো হল বাল্লাহ বাইপাস এবং গ্রেট বিটার লেক। সুয়েজ খালে কোন লক বা ভিন্ন উচ্চতার নৌপথে জলযান নেবার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ গেট নেই। তাই সমুদ্রের পানি অবাধে এই খালের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সাধারণত, বিটার লেকের উত্তরদিকের খালে শীত কালে উত্তরমুখী স্রোত প্রবাহিত হয় এবং গ্রীষ্মে দক্ষিণমুখী স্রোত প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে লেকের দক্ষিণ দিকের খালে স্রোত সুয়েজের জোয়ার-ভাটার সাথে পরিবর্তিত হয়।

সুয়েজ খালের মালিকানা ও পরিচালনা মিসরের সুয়েজ ক্যানেল অথরিটির ওপর ন্যাস্ত। ‌আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, সুয়েজ খাল শান্তিকালীন সময় অথবা যুদ্ধকালীন সময় - সব সময়েই যে কোন দেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক বা যুদ্ধ জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ইতিহাসসম্পাদনা

২৫ এপ্রিল ১৮৫৯ তারিখে নির্মাণ কাজ আরম্ভ হয়,শেষ হয় ২৫ এপ্রিল ১৮৬৯। নৌযান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় ১৭ নভেম্বর ১৮৬৯। এটি ২৬ জুলাই ১৯৫৬ তে জাতীয়করণ করা হয়।এর দৈর্ঘ্য ১৯৩.৩ কি.মি(১২০.১ মাইল)।

ধারণক্ষমতাসম্পাদনা

বর্তমানে প্রতিদিন ৪৯টি জাহাজ সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াত করে। তবে ২০২৩ সাল নাগাদ নতুন সুয়েজ খাল তৈরি হলে সুয়েজ খালের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন ৯৭টি জাহাজ যাতায়াত করতে সক্ষম হবে।

নতুন সুয়েজ খালসম্পাদনা

নতুন সুয়েজ খাল হল সুয়েজ খাল এর একটি শাখা।যা নতুন করে খনন করে নির্মাণ করা হয়েছে সুয়েজ খালের সমান্তরালে । ৩৭ কিলোমিটারের মতো খনন করা হয়েছে, যেটিকে বলা হচ্ছে ‘দ্বিতীয় লেন’। এ ছাড়া খালটিকে আরও গভীর এবং ৩৫ কিলোমিটারের মতো প্রশস্ত করা হয়েছে।এই নতুন রাস্তার ফলে জাহাজগুলোর অপেক্ষার সময় ১৮ ঘণ্টা থেকে ১১ ঘণ্টায় নেমে আসবে। বর্তমানে দৈনিক ৪৯টি জাহাজ চলে এ খাল দিয়ে। সরকার আশা করছে ২০২৩ সালের মধ্যে এই খাল দিয়ে চলবে দৈনিক ৯৭টি জাহাজ। এ ছাড়া ২০২৩ সাল নাগাদ সুয়েজ খাল থেকে বর্তমান আয় ৫ শ ৩০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১৩ শ ২০ কোটি ডলার হবে বলে আশা করছে সরকার। তবে বিশ্লেষকদের মতে জাহাজ থেকে আয় খালের সক্ষমতার ওপর নয় বরং বিশ্বের ব্যবসায়ের সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে।

বিকল্পব্যবস্থাসম্পাদনা

২০২১ সালে এভার গিভেন দ্বারা অবরুদ্ধকরণসম্পাদনা

২০২১ সালের ২৩ মার্চ, আনুমানিক ০৫:৪০ ইউটিসি ( স্থানীয় সময় ৭:৪০) এ, সুয়েজ খালের উভয় পাশ অতি বৃহৎ গোল্ডেন-ক্লাস মালবাহী জাহাজ এভার গিভেন দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এভারগ্রিন মেরিন পরিচালিত জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে নেদারল্যান্ডসে যাত্রাপথে তীব্র বাতাসের দরুন চড়ার মাটিতে আটকে পড়ে। মাটিতে আটকে পড়ার পর এভার গিভেন পাশে সরে আসে, এতে খালটি পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যদিও খালের দৈর্ঘ্যের কিছুটা পুরোনো একটি সরু চ্যানেল দ্বারা সমান্তরালকৃত, যেটিকে এখনো বাধা পেরোনোর জন্যে বাইপাস হিসেবে ব্যবহার করা যায়, উক্ত ঘটনাটি খালের এমন একটি সেকশনে ঘটে যেটিতে কেবল একটিই চ্যানেল ছিল। ঘটনাস্থলের অবস্থান ছিল ৩০.০১৫৭৪° উত্তর ৩২.৫৭৯১৮° পূর্ব।

ঘটনার প্রাক্কালে, বহু অর্থনীতিবীদ এবং ব্যবসা বিশেষজ্ঞ বাধাটি দ্রুত নিষ্পত্তি না করতে পারলে এর প্রভাব সম্পর্কে অভিমত জানান, তারা বলেন যে সুয়েজ খাল বিশ্ব বাণিজ্যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, এবং এই ঘটনার জন্যে স্বভাবতই বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে যেহেতু আটকে পড়া পণ্যগুলোর নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর খাল অতিক্রম করার কথা ছিল।

তাৎক্ষণিক ফলাফল হিসেবে, পণ্যগুলোর ভেতর তেল পরিবহন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে যেহেতু উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মজুদ গন্তব্যে পৌঁছার উপায় না থাকায় আটকা পড়ে ছিল।

আন্তর্জাতিক শিপিং চেম্বার (আই সি এস) ধারণা করে যে প্রতিদিন ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সমমূল্যের কার্গো সুয়েজ খাল অতিক্রম করে থাকে।

বলা হয়েছিল এই অবরুদ্ধতা সারা বিশ্বের কার্গো সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতো। পরিবহণ কোম্পানিগুলো এও বিবেচনা করছিলো যে তাদের জাহাজগুলোকে কেপ অফ গুড হোপের দীর্ঘতর পথ দিয়ে ঘুরিয়ে আনবে কিনা। এরকমটা করা প্রথম জাহাজটি ছিল এভার গিভেনের ভগ্নী জাহাজ এভার গ্রিট।

মার্চের ২৯ তারিখ, একটি মেরিটাইম সেবা সরবরাহকারী সংস্থা ইঞ্চকেপ জানায়, জাহাজটি পুনরায় ভাসতে শুরু করে। অল্প কয়েক ঘন্টার ভেতর, কার্গো ট্রাফিক আগের মত হয়ে পড়ে যার ফলে ৪৫০টি জাহাজের আটকে পড়ার সমাধান হয়ে যায়। এভার গিভেন সফলভাবে খালের বাইরে পার হয়ে যাবার পর যে জাহাজটি সফলভাবে খাল অতিক্রম করেছে সেটি হলো ওয়াই এম উইশ যেটি একটি হংকং ভিত্তিক মালবাহী জাহাজ।

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা