প্রধান মেনু খুলুন

শহীদুল জহির

বাংলাদেশী গল্পকার ও ঔপন্যাসিক

শহীদুল জহির (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ - ২৩ মার্চ ২০০৮) ছিলেন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং সরকারি আমলা।[১] অাধুনিক বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার স্বাতন্ত্র্য চর্চার জন্য তিনি পরিচিত।[২] তিনি চারটি উপন্যাস এবং তিনটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের একটি, যেটির জন্য ২০১০ সালে তিনি মরণোত্তর প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১৫ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮), সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫), ও মুখের দিকে দেখি (২০০৬) উপন্যাসগুলোকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য সংযোজন বলে বিবেচিত হয়। পারাপার (১৯৮৫), ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (২০০০), এবং ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪) তার রচিত উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ।

শহীদুল জহির
শহীদুল জহির.jpg
শহীদুল জহির
জন্ম
মোহাম্মদ শহীদুল হক

(১৯৫৩-০৯-১১)১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩
মৃত্যু২৩ মার্চ ২০০৮(2008-03-23) (বয়স ৫৪)
ঢাকা, বাংলাদেশ
মৃত্যুর কারণহৃদরোগ
সমাধিশহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, মিরপুর
২২°০০′২৭″ উত্তর ৮৩°৫৯′০১″ পূর্ব / ২২.০০৭৫৪৫৭° উত্তর ৮৩.৯৮৩৫৩৮৪° পূর্ব / 22.0075457; 83.9835384
জাতীয়তা
যেখানের শিক্ষার্থী
পেশা
  • লেখক
  • সরকারি কর্মকর্তা
কার্যকাল১৯৮৫–২০০৮
পরিচিতির কারণবাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা
আদি নিবাসরায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ
পিতা-মাতা
  • এ কে নুরুল হক (পিতা)

প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষাসম্পাদনা

তিনি ১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার নারিন্দার ৩৬ ভূতের গলিতে (ভজহরি সাহা স্ট্রিট) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার নাম ছিল মোহাম্মদ শহীদুল হক। তার পিতা এ কে নুরুল হক ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা ছিলেন গৃহিণী। তার চার ভাই ও চার বোন ছিল এবং তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার হাশিল গ্রামে। তার দাদা জহিরউদ্দিন ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তার দাদির নাম ছিল জিন্নাতুন নেসা। শহীদুল তার নামের জহির অংশটি তার দাদা নাম থেকে নিয়েছিলেন।[৩] তার পিতার শৈশবে তারা মারা যান। তার নানা ছিলেন সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ার আজিমুদ্দিন আহমেদ ও নানি হামিদা বেগম। এই স্থানগুলি এবং ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া যেখানে তিনি প্রায়ই বেড়াতেন, তার মনে গভীর ছাপ রাখে এবং পরবর্তীতে তার সাহিত্যকর্মে এই স্থানগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৯০ সালে তার বাবা মারা যান এবং এরপর থেকে তার মা ঢাকায় ভাইবোনদের সাথে থাকেন।

শহীদুল জহির তার বিদ্যালয় জীবন শুরু করেছিলেন ঢাকার ৩৬ র‍্যাঙ্কিন স্ট্রিটের সিলভারডেল কেজি স্কুলে, পরবর্তীতে ঢাকা, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ, সাতকানিয়াচট্টগ্রামের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়েছেন। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ওয়াশিংটন, ডি.সি.র আমেরিকান ইউনিভার্সিটিইউনিভার্সি অব বারমিংহামে পড়েছেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

১৯৮১ সালে জহির বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস সহকারি সচিব পদে যোগ দেন। ২০০৮ সালে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে কাজ করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনসম্পাদনা

শহীদুল জহির ছিলেন চিরকুমার। কথা ম্যাগাজিনের সম্পাদক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, তিনি এটি ব্যাখ্যা করতে অক্ষম, "আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না, এটা এমনিতেই ঘটে গেছে"[৪] তিনি কম কথা বলতেন এবং অন্তর্মুখী ছিলেন। তার সাথে বন্ধুত্ব করা কঠিন ছিল তবে তিনি অনেক বন্ধুসুলভ ছিলেন।

মৃত্যুসম্পাদনা

২০০৮ সালের ২৩ মার্চ তিনি ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সামধিস্থ করা হয়।[৫]

সাহিত্যকর্ম এবং শৈলীসম্পাদনা

শহীদুল জহির তার গল্পে জাদুবাস্তববাদী পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেকে আলাদা করে তুলেছেন। তিনি সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে লেখালেখি শুরু করেন।[৩] তার প্রথম প্রকাশিত গল্প "ভালবাসা", যেখানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রভাব স্পষ্ট। ১৯৮৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ পারাপার প্রকাশিত হয়।[৩] বলা হয় যে লাতিন আমেরিকার লেখকদের লেখার জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া তার লেখায় রয়েছে।[৬] এবং তাকে বাংলাদেশের গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেস বলা হয়।[৪] তিনি স্বীকার করেছেন যে দুইজন সমসাময়িক ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হকআখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দ্বারা তিনি প্রভাবিত।[৭] তার কিছু গল্পের কাহিনী মার্ক্সবাদের প্রভাব বহন করে। তার অনেক গল্পে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ব্যবহার করেছেন। তিনি কিছু ইংরেজি গল্পও অনুবাদ করেছেন।

তার কিছু অপ্রকাশিত কবিতাও রয়েছে। এছাড়াও বাংলা কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন তিনি।[৬] তার একটি কবিতার দুইলাইন হল:

... তবুও আমরা আরও একবার সমবেত হলাম,
আর আমাদের সময়ের মাধ্যমে একটি কুঁড়ি ফুলে পরিণত হয়,
একটি রূপালি রূপচাঁদা নোনা পানিতে ভাসে ... 

— শহীদুল জহির, [৬]

পারাপারসম্পাদনা

পরবর্তীতে নাম বদলালেও জন্মনাম শহীদুল হক নামেই প্রথম গ্রন্থ পারাপার লিখেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জহির বলেন, সে সময়ে অন্য শহীদুল হক নামধারী লেখকদের সঙ্গে তার পরিচয়ে ভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছিল বলে তিনি নাম পরিবর্তন করেন। পারাপার শহিদুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ, তার মতে যেটির গল্পগুলি অনেকটা প্রথাগত গঠনে লেখা, যার প্রতিটি গল্পে স্বাতন্ত্র্যে স্বর-বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।[৩] কালি ও কলমের এক পর্যালোচনায় রীতি বা কাঠামোগত দিকের বিচার অনুমানে পারাপার আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পগ্রন্থ চলো যাই পরোক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এ গ্রন্থে "পারাপার" শিরোনামে একটি গল্প রয়েছে। যেখানে প্রতীকীর মাধ্যমে শ্রেণিশত্রু নিপাতের দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। তার প্রথম প্রকাশিত গল্প "ভালবাসা" এ গ্রন্থে যুক্ত হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পুরোদস্ত্তর মনস্তাত্ত্বিক গল্প "মাটি ও মানুষের রং"। অন্যান্য গল্পের মধ্যে রয়েছে "তোরাব শেখ", পুরনো ঢাকার প্রেক্ষাপট রচিত "ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে"।[৩]

গ্রন্থপঞ্জিসম্পাদনা

শহীদুল জহির চারটি উপন্যাস ও তিনটি গল্পগ্রন্থের রচয়িতা।[৮]

উপন্যাসসম্পাদনা

  • জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮)
  • সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫)
  • মুখের দিকে দেখি (২০০৬)
  • আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (২০০৯)

গল্পগ্রন্থসম্পাদনা

  • পারাপার (১৯৮৫)
  • ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯)
  • ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪)

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেসম্পাদনা

শহীদুল জহিরের ১৯৯৮ সালে রচিত "চতুর্থ মাত্রা" গল্প থেকে ২০০১ সালে একই নামে নুরুল আলম আতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৯৯ সালে রচিত "কোথায় পাব তারে" গল্প থেকেও আতিক নাটকও তৈরি করেন। তার "এই সময়" (১৯৯৩) গল্পের উপর ভিত্তি করে ২০০২ সালে আশিক মোস্তফা নির্মাণ করেন চলচিত্র ফুলকুমার। জহিরের "কাঠুরে ও দাঁড়কাক" (১৯৯২) গল্প থেকে দেশ নাট্যদল "জন্মে জন্মান্তর" নামে মঞ্চনাটকও প্রদর্শন করেছে।[৯]

পুরস্কার ও মনোনয়নসম্পাদনা

পুরস্কার এবং মনোনয়নের তালিকা
সংগঠন অনুষ্ঠানের তারিখ বিভাগ বই ফলাফল সূত্র
আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪ উপন্যাসে উল্লেখযোগ্য অবদান বিজয়ী [১০]
আজকের কাগজ সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪ উপন্যাস বিজয়ী [১১]
কাগজ সাহিত্য পুরস্কার ২০০৫ উপন্যাস ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪) বিজয়ী [১২]
প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১৫ ২০১০ বর্ষসেরা বই আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (২০০৯) বিজয়ী মরণোত্তর[১৩]

আরো পড়ুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Shahidul Jahir – Bridging Gap between Language and Reality by Faizul Latif Chowdhury[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. সালেহ উদদীন, সালাম (২৯ মার্চ ২০১৯)। "জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে এর প্রয়োগ"যায়যায়দিন। সংগ্রহের তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 
  3. উদ্দীন আহ্মদ, আশরাফ। "শহীদুল জহির : পারাপারের বিষয়বৈচিত্র্য"kaliokalam.comকালি ও কলম। সংগ্রহের তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 
  4. "New Age Xtra"। ৪ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০১৬ 
  5. লেখক শহীদুল জহির আর নেই[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  6. "দৈনিক সংবাদ"thedailysangbad.com 
  7. "ITTEFAQ.COM" 
  8. "দৈনিক সংবাদ"thedailysangbad.com 
  9. "about crew"। ২০ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০১৬ 
  10. মিজান, মীম (১৯ অক্টোবর ২০১৮)। "শহীদুল জহির : বাংলা গদ্য সাহিত্যে নব্য ধারার প্রবর্তক"। সোনার দেশ। সংগ্রহের তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 
  11. "জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৫"দৈনিক যুগান্তর। ১৭ এপ্রিল ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ 
  12. http://www.newagebd.com/2005/apr/03/time.html[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  13. "আজ প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার বিতরণ" 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা