প্রধান মেনু খুলুন

রাধাকান্ত দেব (১০ই মার্চ, ১৭৮৪-১৯শে এপ্রিল, ১৮৬৭) উত্তর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেব-র দত্তকপুত্র গোপীমোহন দেবের পুত্র। বাংলার নবজাগরণের যুগে তার চরিত্র ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত। তিনি একদিকে ছিলেন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের নেতা, অথচ শিক্ষাবিস্তারে তিনি পরম প্রগতিশীল। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুনশি। ওয়ারেন হেস্টিংস ও ওয়েলেসলির অধীনে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনি 'মহারাজা' উপাধি লাভ করেন।

শিক্ষা ও বিবাহসম্পাদনা

১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে পাঁচ বছর বয়সে রাধাকান্ত দেবের শিক্ষা শুরু হয় গৃহশিক্ষক কৃষ্ণমোহন বসুর কাছে। মাত্র দশ বছর বয়সে গঙ্গামণি নাম্নী বালিকার সাথে তার বিবাহ হয়। পরবর্তীকালে ইংরাজী, আরবি, পারসি ও সংস্কৃতে তিনি প্রভূত বুৎপত্তি অর্জন করে ছিলেন। তার রচিত সংস্কৃত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শব্দকল্পদ্রূম রচনা শুরু করেন। আটটি খণ্ডে বিভক্ত এর প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ পায় ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে এবং অন্তিম খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। এই বইটি তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি সহ অন্যান্য ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি সম্মানিত হন। ঠাকুর পরিবারের পাথুরিয়াঘাটা শাখার হরকুমার ঠাকুর তাকে এই গ্রন্থ সংকলনে সহায়তা করেন।[১] এছাড়াও ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে তার রচিত বাংলা শিক্ষাগ্রন্থ ও ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে সংক্ষিপ্ত বাংলা শিক্ষাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

প্রভাবসম্পাদনা

উনিশ শতকে অনেকটা সময় কলকাতার সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী দলপতি ছিলেন রাধাকান্ত দেব। ১৮৪০-এ দেখা যায় তার দলের সদস্য সংখ্যা প্রায় এক হাজার। কলকাতার সবচেয়ে শিক্ষিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের অধিকাংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণরাঢ়ীয় কায়স্থ পরিবারগুলো তার নেতৃত্বের সামনে নতশির। [২]

হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে বিচারপতি স্যার হাইড ইস্ট যে সভা ডাকেন তাতে রাধাকান্ত দেব উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন এই কলেজের পরিচালনমণ্ডলীর সদস্য। পরবর্তীকালে তাকে এই কলেজের অধিকর্তা ও কর্মাধ্যাক্ষ নিযুক্ত করা হয়। ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে ৪ঠা জুলাই স্কুল বুক সোসাইটি স্থাপিত হলে তিনি এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। আবার ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ১লা ডিসেম্বর ক্যালকাটা সোসাইটি স্থাপিত হলে তিনি তার এদেশীয় সম্পাদক নিযুক্ত হন। তিনি প্রতিবছর নিজ ভবনে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমবেত করে পারিতোষিক বিতরণ করতেন। স্ত্রীশিক্ষার ব্যাপারে রাধাকান্ত দেব ছিলেন বিশেষ উৎসাহী। এ বিষয়ে উন্নতি বিধানের উদ্দেশ্যে স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক নামে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন ,১৮২২ সালে। তিনি নিজের পরিবারের মহিলাদের শিক্ষাদানের জন্য ইংরাজ শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত করেন। ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে নারীশিক্ষার ব্যাপারে তিনি ডব্লিউ. এইচ. পিয়ার্সকে পত্র লেখেন। রামমোহন রায়ের ধর্মান্দোলন শুরু হলে কলকাতার রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাকে সনাতন ধর্মের রক্ষকরূপে বরণ করেন।[৩]

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে দেব ও ঠাকুররা কর্তৃত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন। রাধাকান্ত দেব প্রথম সভাপতি, দেবেন্দ্রনাথ প্রথম সচিব।

১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ফেব্রুয়ারি গৌড়ীয় সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর কর্মসমিতির সদস্য নিযুক্ত হন এবং সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে তিনি রামমোহন রায়ের বিরোধিতা করেন। এ সম্পর্কে তিনি লর্ড বেন্টিকের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলেন। ডিরোজিওর নব্যচিন্তাধারা এবং পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ ও বহুবিবাহ রদ সম্পর্কিত আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজের হিন্দু ছাত্রদের শবব্যবচ্ছেদের অনুমতি দেন। রাধাকান্ত দেব রাজসম্মান সূচক স্যার উপাধি প্রাপ্ত হয়ে বহুকাল হিন্দুসমাজপতির সম্মানিত পদে প্রতিষ্ঠিত থেকে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Sengupta, Subodh Chandra and Bose, Anjali, p. 611
  2. "Influence" 
  3. Banglapedia; AF Salahuddin Ahmed, Social Ideas and Social Change in Bengal, 1818-1835, Leiden, 1965.

আরো পড়ুনসম্পাদনা

  • রাধারমণ রায়: কলকাতা বিচিত্রা
  • শিবনাথ শাস্ত্রী: রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ

বহিঃসংযোগসম্পাদনা