প্রধান মেনু খুলুন

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে। পূর্ব বাংলায় (বাংলাদেশ তখন পূর্ব বাংলা নামে পরিচিত ছিল) ইংরেজী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে উইলিয়াম বেন্টিংক এর উৎসাহ প্রদানের ফলে বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল নামে এটি সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে।[১] ১৮৭৩ সালে স্কুলটির নতুন নামকরণ করা হয় কলেজিয়েট স্কুল।

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের লোগো.jpeg
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এর লোগো
অবস্থান
সোনাদিঘির মোড়, রাজশাহী
বাংলাদেশ
তথ্য
ধরনপ্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
প্রতিষ্ঠাকাল১৮২৮ (1828)
বিদ্যালয় জেলারাজশাহী
অধ্যক্ষড. নুরজাহান বেগম
ওয়েবসাইট

ইতিহাসসম্পাদনা

দেশের ইংরেজী শিক্ষার প্রসার লাভের জন্য লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং তার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও উৎসাহে ১৮২৮ সালে “বউলিয়া ইংলিশ স্কুল” নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। পদ্মানদীর তীরে বড়কুঠির কাছাকাছি খড়ের দোচালা ঘরের বারান্দায় এর প্রথম কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমদিকে এটি ছিল একটি অবৈতনিক ব্যক্তিগত বিদ্যালয়। সেসময় বিদ্যালয়ের জন্য কোন সরকারী সাহায্য বরাদ্দ না থাকায় রাজশাহীতে বসবাসকারী ইংরেজ কর্মকর্তা, আইনব্যবসায়ী এবং নাটোর দিঘাপতিয়া, দুবলহাটি, পুঠিয়া ও বলিহারের জমিদারদের সাহায্য ও সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি চলতে থাকে।

তৎকালীন শিক্ষা বিস্তারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উইলিয়াম অ্যাডাম ১৮৩৫ সালে নাটোরে শিক্ষা জরিপ শেষে রাজশাহী বউলিয়া স্কুল পরিদর্শনের পর সরকারের কাছে বিদ্যালয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তুলে ধরলে ১৮৩৬ সালে ২০ জুন বিদ্যালয়টিকে সরকারীকরণ করা হয় এবং এটি রাজশাহী জেলা স্কুল হিসেবে অধিগ্রহণ করে। রাজশাহীর সারদা প্রসাদ বসুকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই বছর স্কুলের মোট ছাত্র ছিল ৮৩ জন, যারমধ্যে ৭৮ জন হিন্দু, ২ জন মুসলমান এবং ৩ জন খ্রীষ্টান। ১৮৩৬ সালে ছাত্র সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৮ জন।

১৮৫০ সালে প্রথমবারের মত উঁচু শ্রেণীর মাথাপিছু ১ টাকা হারে বেতন ধার্য করা হয়। ফলে ছাত্র সংখ্যা কিছু কমে যায়। ১৮৪৪ ও ১৮৪৫ সালে ১ জন করে মোট ২ জন এবং ১৮৪৭ সালে তিন জন ছাত্র জুনিয়র বৃত্তিলাভ করে। ১৮৪৯ সালে বিদ্যালয়ে একটি প্রশস্ত পাকা ভবন নির্মিত হয়। ১৮৫৭ সালে ছাত্রসংখ্যা হয় ১৪৬ জন। সেই সময় কোন শিক্ষা বোর্ড ছিল না। অবিভক্ত বাংলায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রবেশিকা (বর্তমান এস.এস.সি.) পরীক্ষা হতো। ১৯৫৮ সালে বিদ্যালয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে। সেই বছরই মেধাবী ছাত্র মোহিনীমোহন চক্রবর্তী প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১০ টাকা মেধা বৃত্তি লাভ করে। এসময় ছাত্র বেতন বৃদ্ধি করা হয় ২ টাকা। সে বছর বিদ্যালয়ে ছাত্র ছিল ২১৫ জন।

এক পর্যায়ে বিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনটি পদ্মা নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়ে। ফলে ভাড়া করা একটি বাড়িতে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলতে থাকে। পুঠিয়ার রাজা যোগেন্দ্র নারায়ন রায়ের আর্থিক সহায়তায় ১৮৬২ সালে বিদ্যালয়টির বর্তমান জায়গায় কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়। ১৮৭৩ সালে বউলিয়া সরকারি ইংলিশ স্কুলের সঙ্গে মহাবিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণী সংযোজিত হয়। তখন থেকেই এর নামকরণ হয় “রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল”। ১৮৭৪ সালে পুঠিয়ার মহারাণী শরৎসুন্দরী দেবীর আর্থিক সহায়তায় স্কুলের অতিরিক্ত দুইটি নতুন ভবন নির্মিত হয়। ১৮৭৫ সালের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৩৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৯ জন পাশ করে। যা তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

১৮৮৪ সালে কলেজের শ্রেণী দু’টিকে পৃথক করে বর্তমান রাজশাহী সরকারি কলেজে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তখন স্কুলটি কলেজ প্রশাসনের অধীনে চলতে থাকে। বাংলার গভর্ণর ফুলার সাহেবের আর্থিক সহায়তায় এবং রাজনীতিবিদ খানবাহাদুর এমাদুদ্দিন সাহেবের সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯০৭ সালে ফুলার হোস্টেলটি নির্মিত হয়। ঐ বছরই বিদ্যালয়ের জন্য পৃথক হিন্দু হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। ১৯১২ সালে বাংলার গভর্ণর প্রথমবারের মত স্কুলটি পরিদর্শনে আসেন।সেসময় ছাত্র সংখ্যা ছিল ৫০০ জন। ১৯২৬সালে হিন্দু হোস্টেলটি রাজা প্রমথ নাথ(পি.এন) হোস্টেলে স্থানান্তরিত করা হয়।

১৯৩০ সালে বৃটিশ বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে বিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা হ্রাস পেয়ে প্রায় ৩০০ জনে নেমে আসে। এই বছর স্কুলের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ঘটে(১) বয় স্কাউট দল গঠন(২) জুনিয়র রেডক্রস সংগঠন এবং(৩) প্রথমবারের মত স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশনা। ১৯৩৬ সালে স্কুলের ছাত্ররা জ্যাকশন শিল্ড ও ১৯৪০ সালে ব্রাবোন শিল্ড জয় করে খেলাধুলাতে ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। ১৯৪০ সালে স্কুলের লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঐ সালেই বিজ্ঞান গ্যালারী নির্মিত হয় (যা ১৯৯২ সালে পরিত্যাক্ত ঘোষিত হওয়ায় ভেঙে ফেলা হয়)।

১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত স্কুলটি রাজশাহী শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে এবংল্যাবরেটরী স্কুল হিসেবে কাজ করে। ১৯৬৯ সালে স্কুলটি পুনরায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিদপ্তরের উপ-পরিচালকের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। ১৯৫৯ সালে প্রদেশের অন্যান্য স্কুল গুলির মধ্যে এই স্কুলটিকে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অধীনে একটি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। ১৯৬২ সালে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি দোতলা বিজ্ঞান ভবনও একটি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মিত হয় যা কলেজ থেকে স্কুলটি কে সম্পূর্ণ পৃথক করে ফেলে। ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মত প্রভাতী শাখা খোলা হয়।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রভাতী শাখায় ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী এবং দিবা শাখায় ৭ম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান কর্মসূচী চালু ছিল। ১৯৯১ সালের মে মাস থেকে সরকারি এক আদেশে বিদ্যালয়ে পুরোপুরি ‘ডাবল শিফট’ কার্যক্রম শুরু হয় এবং তখন থেকেই প্রভাতী শাখায় ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীতে দু’টি করে এবং দিবাকালীন শাখায়ও ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীতে দু’টিকরে শাখায় পাঠদান কার্যক্রম চালু হয়।

১৯৩৬ সালে স্কুলের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়। ছাত্র শিক্ষক ও স্থানীয় হিতৈষী জনগণের প্রচেষ্টায় সে আমলের প্রায়লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে অনুষ্ঠানটি সাড়ম্বরে পালিত হয়। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারীমাসের ২৪ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ১৫০ তম বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হয়। এ বর্ষপূর্তি উৎসবে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র(ম্যাট্রিক১৯৪৬) ফেডারেল ইন্সুলেন্স কোম্পানী, বাংলাদেশ এর তৎকালীন চেয়ারম্যান মরহুম এ.এইচ.এম. আব্দুল মতিন প্রদত্ত প্রায় ৮২ হাজার টাকায় (প্রথমে ৫৪হাজার পরে ২৮ হাজার) “আব্দুল মতিন মেধাবৃত্তি” চালু করা হয়। ২০০৮ সালে এ স্কুলে একাদশ শ্রেণী চালু করাহয় এবং এ শ্রেণীতে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শাখা খোলা হয়। ২০১০ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বপ্রথম এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় ছাত্ররা অংশ গ্রহণ করে।[২]

 
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রবেশপথ
 
একাডেমিক ভবন, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল

শিক্ষা কার্যক্রমসম্পাদনা

২০০৮ সালে এ স্কুলে একাদশ শ্রেণী চালু করা হয় এবং এ শ্রেণীতে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শাখা খোলা হয়। ২০১০ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বপ্রথম এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় ছাত্ররা অংশ গ্রহণ করে। বর্তমান ৩য় শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পরিচালিত বিদ্যালয়টি তার অতীত ঐতিহ্য বজায় রেখে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছে। স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা ড. নুরজাহান বেগম।

ভবনসম্পাদনা

বিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ ০.৯৭২৫ একর। এর মধ্যে কিছু জমি শহরের রাস্তা সম্প্রসারণের সময় সরকারি আদেশে ছেড়ে দিতে হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার প্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে বেশ কয়েকটি নতুন বহুতল ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আরো দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "180th founding anniversary of The Rajshahi Collegiate School"The Daily Star। UNB। ১৮ জানুয়ারি ২০০৯। 
  2. "দেশের প্রথম ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ইতিহাস"। ১১ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬