প্রধান মেনু খুলুন

মাতঙ্গিনী হাজরা

ভারতীয় বিপ্লবী, স্বাধীনতা আন্দোলনের শহিদ

মাতঙ্গিনী হাজরা (১৭ নভেম্বর ১৮৬৯–২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২) ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এক মহান বিপ্লবী নেত্রী। ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তদনীন্তন মেদিনীপুর জেলার তমলুক থানার সামনে ব্রিটিশ ভারতীয় পুলিশের গুলিতে তিনি শহিদ হয়েছিলেন। তিনি "গান্ধীবুড়ি" নামে পরিচিত ছিলেন।[১]

মাতঙ্গিনী হাজরা
Matangini Hazra.jpg
মাতঙ্গিনী হাজরা
জন্ম১৭ নভেম্বর ১৮৬৯
মৃত্যু২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২
জাতিসত্তাবাঙালি
আন্দোলনব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন
কলকাতার ময়দান অঞ্চলে মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি

প্রাথমিক জীবন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণসম্পাদনা

মাতঙ্গিনী হাজরার প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। শুধু এটুকুই জানা যায় যে, ১৮৬৯ সালে তমলুকের অদূরে হোগলা নামে একটি ছোটো গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল। দারিদ্র্যের কারণে বাল্যকালে প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন মাতঙ্গিনী।[২] অতি অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তিনি মাত্র আঠারো বছর বয়সেই নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হয়েছিলেন।[১]

মেদিনীপুর জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল নারীদের এই আন্দোলনে যোগদান।[৩] ১৯০৫ সালে প্রত্যক্ষভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মাতঙ্গিনী হাজরা। মতাদর্শগতভাবে তিনি ছিলেন একজন গান্ধীবাদী[২] ১৯৩২ সালে মাতঙ্গিনী আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন। সেই সময়ে তিনি লবণ আইন অমান্য করে গ্রেফতারবরণ করেছিলেন। অল্পকাল পরেই অবশ্য তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর মকুবের দাবিতে প্রতিবাদ চালিয়ে গেলে আবার তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। এই সময় তিনি বহরমপুরের কারাগারে ছয় মাস বন্দী ছিলেন।[১] তিনি হিজলি বন্দি নিবাসেও বন্দি ছিলেন কিছুদিন।[৪] মুক্তিলাভের পর তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্যপদ লাভ করেন এবং নিজের হাতে চরকা কেটে খাদি কাপড় বানাতেও শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে মাতঙ্গিনী শ্রীরামপুরে মহকুমা কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের সময় আহত হন।[১]

ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশগ্রহণসম্পাদনা

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কংগ্রেস সদস্যেরা মেদিনীপুর জেলার সকল থানা ও অন্যান্য সরকারি কার্যালয় দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।[১] এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল জেলা থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে এখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। প্রধানত মহিলা স্বেচ্ছাসেবক সহ ছয় হাজার সমর্থক তমলুক থানা দখলের উদ্দেশ্যে একটি মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ৭৩ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা।[২][৩] শহরের উপকণ্ঠে মিছিল পৌঁছলে রাজপুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।[২] কিন্তু সেই আদেশ অমান্য করে মাতঙ্গিনী অগ্রসর হলে তাকে গুলি করা হয়।[২] কিন্তু তা সত্ত্বেও মাতঙ্গিনী এগিয়ে চলেন এবং পুলিশের কাছে আবেদন করেন জনতার উপর গুলি না চালাতে।[১]

তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের মুখপত্র বিপ্লবী পত্রিকার বর্ণনা অনুযায়ী, ফৌজদারি আদালত ভবনের উত্তর দিক থেকে মাতঙ্গিনী একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পুলিশ গুলি চালালে তিনি অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকদের পিছনে রেখে নিজেই এগিয়ে যান। পুলিশ তিনবার তাকে গুলি করে। গুলি লাগে তার কপালে ও দুই হাতে। তবুও তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন।

এরপরেও বারংবার তার উপর গুলিবর্ষণ করা হয়। কংগ্রেসের পতাকাটি মুঠোর মধ্যে শক্ত করে উঁচিয়ে ধরে বন্দেমাতরম ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[১][২]

উত্তরাধিকারসম্পাদনা

তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার স্বদেশের জন্য মাতঙ্গিনী হাজরার মৃত্যুবরণের দৃষ্টান্তটিকে সামনে রেখে মানুষকে বিপ্লবের পথে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল। উল্লেখ্য, এই সমান্তরাল সরকারটি ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সফলভাবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। পরে গান্ধীজির অনুরোধে এই সরকার ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।[৩]

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে অসংখ্য স্কুল, পাড়া ও রাস্তার নাম মাতঙ্গিনী হাজরার নামে উৎসর্গ করা হয়। স্বাধীন ভারতে কলকাতা শহরে প্রথম যে নারীমূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল, সেটি ছিল মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি। ১৯৭৭ সালে কলকাতার ময়দানে এই মূর্তিটি স্থাপিত হয়।[৫]

তমলুকে ঠিক যে জায়গাটিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেই জায়গাটিতেও তার একটি মূর্তি আছে।[৬] ২০০২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের ডাকবিভাগ মাতঙ্গিনী হাজরার ছবি দেওয়া পাঁচ টাকার পোস্টাল স্ট্যাম্প চালু করে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Amin, Sonia (২০০৬-০৮-২৯)। "Hazra, Matangini"। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৯-২৯ 
  2. Maity, Sachindra (১৯৭৫)। Freedom Movement in Midnapore। Calcutta: Firma, K.L.। পৃষ্ঠা 112–113। 
  3. Chakrabarty, Bidyut (১৯৯৭)। Local Politics and Indian Nationalism: Midnapur (1919-1944)। New Delhi: Manohar। 
  4. পতি, ভাস্করব্রত (২২ ডিসেম্বর ২০১৬)। "দেশের প্রথম মহিলা জেল এখন আই আই টি'র গুদামঘর!"গণশক্তি ডট কম। কলকাতা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-১২-২২ 
  5. catchcal.com (২০০৬)। "At first in Kolkata"। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৯-২৯ 
  6. Haldia Development Authority (২০০৬)। "Haldia Development Authority"। ২০০৬-১০-৩১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৬-০৯-২৯