বীরেশচন্দ্র গুহ

বাঙালি প্রাণ-রসায়ণবিদ

বীরেশচন্দ্র গুহ (৮ জুন ১৯০৪–মৃত্যু- ২০ মার্চ ১৯৬২) হলেন প্রখ্যাত প্রাণ-রসায়ণবিদ ও অন্যতম বিশিষ্ট অধ্যাপক। ভারতে প্রাণ-রসায়ণের জনক হিসাবে পরিচিতি তাঁর।[১]

বীরেশচন্দ্র গুহ
156×198
বীরেশচন্দ্র গুহ
জন্ম৮ জুন ১৯০৪
ময়মনসিংহ, অবিভক্ত বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ বাংলাদেশ)
মৃত্যু২০ মার্চ ১৯৬২ (বয়স ৫৮)
লক্ষৌ, উত্তর প্রদেশ, ভারত
মাতৃশিক্ষায়তনপ্রেসিডেন্সি কলেজ বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়
পেশাপ্রখ্যাত প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক
আদি নিবাসবরিশাল, অবিভক্ত বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ বাংলাদেশ)
দাম্পত্য সঙ্গীড. ফুলরেণু গুহ
পিতা-মাতারাসবিহারী গুহ (পিতা)

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

সম্পাদনা

বীরেশচন্দ্র গুহর জন্ম পিতার কর্মস্থল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমানের বাংলাদেশের) ময়মনসিংহে। পিতার নাম রাসবিহারী গুহ। অবশ্য আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বরিশালের বানারিপাড়ায়। মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত ছিলেন তার মাতুল।[২] বীরেশ চন্দ্র গুহ কলকাতার শ্রীকৃষ্ণ পাঠশালা থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা ও সিটি কলেজ থেকে আই.এসসি.পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু বি.এসসি. পড়ার সময়ই অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধের ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কলেজ হতে বিতাড়িত হন। পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে থেকে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে রসায়নে অনার্স-সহ প্রথম স্থান অধিকার করে বি. এসসি. পাশ করেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে এম.এসসি তেও প্রথম হন। ছাত্রাবস্থায় ঘোষ ট্রাভেলিং বৃত্তি লাভ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হন। এম.এসসি পাঠের সময় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত রসায়ন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সংস্পর্শে আসেন। আচার্যের বিজ্ঞানের প্রতি অবদান, নিঃস্বার্থ আদর্শবাদ ও স্বদেশেপ্রেম পরবর্তীতে তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো। পড়াশোনা শেষে, এক বছর বেঙ্গল কেমিক্যালস এণ্ড ফার্মাসিউটিক্যালসে কাজ করার পর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে 'টাটা স্কলারশিপ' পেয়ে বিলেত যান। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. এবং ডি.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ষণ্ডের যকৃতের মধ্যে ভিটামিন বি-২ র অস্তিত্ব অনুসন্ধান। এরপর কেমব্রিজের বিখ্যাত প্রাণ-রসায়নবিদ এফ. সি. হপ্ কিন্সের অধীনেও গবেষণা করেন। রাশিয়ার দূতের সঙ্গে প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদের যে যোগাযোগ ঘটত এবং স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ প্রবাসী ভারতীয়দের সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করতেন।

কর্মজীবন

সম্পাদনা

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফেরার পর কিছুদিন আবার বেঙ্গল কেমিক্যালস এণ্ড ফার্মাসিউটিক্যালসে কাজ করেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন বিভাগে প্রধান অধ্যাপকের পদ পান। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে খাদ্যদপ্তরের প্রধান টেকনিক্যাল উপদেষ্টাপদে নিযুক্ত করেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের সভ্য হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং আমরণ অধ্যাপনা ও গবেষণার কাজে লিপ্ত থাকেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে গমবীজ থেকে ভিটামিন নিষ্কাশন, অ্যাস্করিক অ্যাসিড অথবা ভিটামিন- 'সি' বিষয়ে গবেষণা করেন। উদ্ভিদ কোষ থেকে 'অ্যাস্করবীজেন' বিশ্লেষণে তিনি ও তার সহযোগীরা মৌলিক কৃতিত্ব দেখান। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময়ে ঘাস-পাতা থেকে প্রোটিন বিশ্লেষণের গবেষণা শুরু করেন এবং মানুষের খাদ্যে এই উদ্ভিজ্জ প্রোটিন মিশ্রণের নানা পদ্ধতি দেখান। মূলতঃ বীরেশচন্দ্র গুহর প্রয়াসে ভারতে প্রাণ-রসায়ন বিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তি বিদ্যার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। সেকারণে তাঁকে ভারতের আধুনিক প্রাণ-রসায়ন বিজ্ঞানের জনক নামে আখ্যা দেওয়া হয় ।

১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ৪১ বৎসর বয়সে বিখ্যাত সমাজসেবিকা ড. ফুলরেণু গুহকে বিবাহ করেন। এঁরা দুজনেরই সমাজ সেবা সাহিত্য সংস্কৃতি সঙ্গীত চিত্রকলার প্রতি অসীম আগ্রহ ছিল। তিনি কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়ার হতে সংস্কৃত, বাংলা বা ইংরাজীতে কবিতা আবৃত্তি করে বন্ধুদের প্রায়ই মুগ্ধ করতেন।[২]

মৃত্যু

সম্পাদনা

বীরেশচন্দ্র গুহ ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ২০ শে মার্চ অকস্মাৎ ৫৮ বৎসর বয়সে লক্ষৌতে পরলোক গমন করেন। ড.ফুলরেণু গুহ স্বামীর ইচ্ছানুসারে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে স্বোপার্জিত অর্থ ও তাঁদের বালিগঞ্জস্থিত বৃহৎ অট্টালিকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাণ-রসায়ন বিষয়ে গবেষণার জন্য দান করেন। বর্তমানে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের "The Guha Centre for Genetic Engineering and Biotechnology "(GCGEB)

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. (Çite url| https://www.caluniv.ac.in/academic/department/Biotechnology.html ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৯ মার্চ ২০২০ তারিখে)
  2. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬, পৃষ্ঠা ৪৯৯, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬