"রশীদ হায়দার" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

সম্পাদনা সারাংশ নেই
''' রশীদ হায়দার''' একজন [[বাংলাদেশ|বাংলাদেশী]] লেখক, ঔপন্যাসিক এবং গবেষক যিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কাজ করেছেন।
==প্রাথমিক জীবন==
 
রশীদ হায়দারের বাবা মোহাম্মদ হাকিমউদ্দীন শেখ ছিলেন উত্তর বঙ্গের প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার। তাঁর ছিল তিন মা ৷ বড় মা নিহার বেগমের ছিল ১ সন্তান, মেজো মা অর্থাৎ তাঁর নিজের মা রহিমা খাতুনের ঘরে ৮ ছেলেমেয়ে ছিল এবং ছোট মা মাজেদা খাতুনের ছিল ৫ ছেলেমেয়ে৷ সংসারটিতে সচ্ছলতা থাকলেও শান্তি ছিল না।কারণে অকারণে বাবার কাছে মায়েদের মার-ধোর খাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা ছিল । মামাতো ভাই মোগলের কল্যাণে বিড়ি টানায় ক্লাস থ্রি থেকে হয়ে উঠেছিলেন পারদর্শী৷ গানের গলা মন্দ ছিল না রশীদ হায়দারের ৷ কিন্তু গান শেখার জন্য অনুমতি পাননি বাবার কাছ থেকে৷ নাটক, গানবাজনা নিয়ে ব্যস্ত ছোট চাচা আর মাছ ও পাখি শিকারী মেজো চাচা ছিলেন শৈশব- কৈশোরে তাঁর প্রিয় চরিত্র৷ ছেলেবেলায় স্কুলে পড়ার সময় রশীদ হায়দারের মনে প্রবল ধর্মভাব জাগে৷তাই তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, রমজানের সময় সবগুলি রোজা রাখার চেষ্টা করতেন ও তারাবীতে যেতেন৷ তাঁর প্রবল ধর্মভাব দেখে তাঁর ছোট মা ফুঁকনা মৌলবী নামে তাঁকে খেপাতেন ৷<ref name="Rashid haider1"/>
==কৈশোর==
 
বাজার করার সময় পাকা চোরের মত পয়সা মেরে দিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন [[পাবনা]]র বানী বা রূপকথা সিনেমা হলে ৷ তিনি প্রতি টাকায় এক আনা অন্তত মেরে দিতেন৷ এক আনাতে দুটো জিলাপী, চারটে দিলখোশ বিস্কুট আর একমুঠো নোকোন দানা পাওয়া যেতো ৷বাজারের টাকা চুরির একটাকা আর মায়ের কাছ থেকে দুই টাকা নিয়ে তিনি অন্নদা গোবিন্দ লাইব্রেরীর সদস্য হন যার সহকারী লাইব্রেরিয়ান ছিলেন বিমল কুমার ভৌমিক তাদের স্কুলের বাংলা শিক্ষক। লাইব্রেরীতে পড়তেন বিখ্যাত শিশুতোষ পত্রিকা সন্দেশ আর শুকতারা৷ ক্লাস সেভেনের থাকতে পড়েন [[বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়|বিভূতিভুষণের]] পথের পাঁচালী উপন্যাস যা তাঁর মনোজগতে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।রশীদ হায়দারের মা রহিমা খাতুন লেখাপড়া করেছিলেন ক্লাস থ্রি পর্যন্ত৷ কিন্ত বই পড়ার আগ্রহে তাই বানান করে পড়ে ফেলেছিলেন [[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| রবীন্দ্রনাথ]] এবং [[শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়| শরত্‍চন্দ্রের]] অনেক উপন্যাস৷ ছেলেবেলায় রশীদ হায়দারকে মৌলবী বানাবার স্বপ্ন ছিল তাঁর বাবার ৷তবে ছোট রশীদ হায়দারের নিজের স্বপ্ন ছিল সিনেমা হলের গেটকিপার হওয়া৷ একটু বড় হবার পর তাঁর সাধ ছিল ট্রেনের চেকার হবেন নানান জায়গায় ভ্রমণ করার জন্য৷ রশীদ হায়দারের জীবনে বড় ভাই [[জিয়া হায়দার| জিয়া হায়দারের]] প্রভাব ছিল খুব বেশি৷ সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে পদার্পণের ক্ষেত্রে বড় ভাই-ই ছিলেন তাঁর প্রধান পথিকৃত্‍৷<ref name="Rashid haider"/>
ক্লাস সিক্সে থাকতে [[জিয়া হায়দার]] তাঁর নামে একটি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন কায়েদে আযম জিন্নাহর ওপর যা ছাপা হয়েছিল দৈনিক ইত্তেহাদ-এর ছোটদের পাতায়৷ এরপর অবশ্য রশীদ হায়দারের নিজেরই লেখা হযরত মোহাম্মদ নামে একটি লেখা ছোটদের পাতায় প্রকাশিত হয়৷ পাকিস্তান দিবসে দৈনিক আজাদ|দৈনিক আজাদে বড়দের পাতায় তাঁর লেখা একটি গল্প প্রকাশিত হয়৷
 
==শিক্ষা জীবন==
রশীদ হায়দারের লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় গ্রামের আরিফপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৷ [[পাবনা]] শহরে পড়ালেখা করেন গোস্বামী মাধ্যমিক স্কুলে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ৷ ১৯৫২ সালে ক্লাস ফাইভে উঠে ভর্তি হন গোপালচন্দ্র ইন্সটিটিউশনে৷ তবে গণিতে কাঁচা হবার কারণে রশীদ হায়দার প্রথমবার মাধ্যমিক ফেল করেন৷রশীদ হায়দার গোপালচন্দ্র ইন্সটিটিউশন থেকে ১৯৫৯ সালে দ্বিতীয় বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷ তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে [[ঢাকা]]র পলিটেকনিক বা [[পাবনা]]র এডওয়ার্ড কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াবেন।মেজো দুলাভাই আবুল মনছুরের সহযোগিতায় তিনি বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার হাত থেকে মুক্তি পান। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন ১৯৬১ সালে [[পাবনা]] এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ৷ [[ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]] থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।<ref name="Rashid haider">[http://omss-poem.blogspot.com/2009/10/rashid-hayder-biography-1941.html
]</ref>
 
==নাটক প্রীতি==
 
১৯৭৪ সালে দিল্লীতে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় তিনবছরের জন্য লেখাপড়া করার বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন রশীদ হায়দার৷ তিনমাস ক্লাস করার পর [[বাংলা একাডেমী]]র চাকুরী রক্ষার জন্য তিনি ফিরে আসেন ৷ ১৯৬৪ সালে [[মুনীর চৌধুরী]]র পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেছেন ভ্রান্তিবিলাস নামক একটি নাটকে কিংকর চরিত্রে ৷ বিশ্ববিদ্যালয জীবনের পরেও দশবারো বছর তিনি নাট্য জগতের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন৷ এসময় অগ্রজ জিয়া হায়দার [[আমেরিকা]] থেকে মাষ্টার্স অব ফাইন আর্টস ডিগ্রী নিয়ে ফিরে এসে গড়ে তুলেছিলেন [[নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়]] নামে একটি নাট্য দল যেখানে রশীদ হায়দারও যুক্ত ছিলেন ৷ দৈনিক বাংলায় কেরাসিন তেল সংকট নিয়ে তাঁর লেখা তেল নাটকটি পড়ে ভালো লেগেছিল [[আলী জাকের|আলী যাকেরের]]৷তাই [[আলী জাকের]] তৈল সংকট নামের নাটক মঞ্চস্থ করেন ।<ref name="Rashid haider"/>
==কর্মজীবন==
 
১৯৬১ সালে রশীদ হায়দার [[চিত্রালী]] পত্রিকাতে পার্টটাইম কাজ শুরু করেন তাঁর বড় ভাই জিয়া হায়দারের সৌজন্যে। জিয়া হায়দার স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়ে [[নারায়ণগঞ্জ]] তোলারাম কলেজে চাকুরী করতে চলে যাবার আগে তাঁর ছোট ভাই রশীদ হায়দারকে তাঁর স্থলে চাকুরীতে নিয়োগ দেন ৷[[সৈয়দ শামসুল হক| সৈয়দ শামসুল হকের]] ভাষায়, “রশীদ যেদিন প্রথম চিত্রালীতে ঢোকে সেদিন ওর পরনে ছিল কটকটে নীল রঙের ফুলহাতা দুই পাশে পকেটঅলা জামা, ঢোলা পায়জামা, মোজা ছাড়া অক্সফোর্ড জুতো আর মাথায় চপচপে সর্ষের তেল৷” ১৯৬৪ সালে চিত্রালীর পাশাপাশি [[পাকিস্তান]] রাইটার্স গিল্ড এর মুখপত্র পরিক্রম এর সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন তিনি৷ স্নাতক পরীক্ষার কিছুদিন আগে রশীদ হায়দার চিত্রালীর কাজ ছেড়ে দিয়ে রিসার্চ অ্যাসিসটেন্ট হিসাবে ন্যাশনাল বুক সেন্টার অফ [[পাকিস্তান|পাকিস্তানে]] যোগ দেন ৷ এরপর ১৯৭০ সালে তিনি [[বাংলাদেশ]] কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ত্রৈমাসিক পত্রিকা কৃষি ঋণ এর সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন যাতে যোগ দিতে তাকে যেতে হয়েছিল করাচীতে৷ ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই তিনি বদলি হয়ে [[ঢাকা]]য় চলে আসেন৷<ref name="Rashid haider"/>
১৯৭২ সালের আগষ্ট মাসে তত্‍কালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ সম্পাদক পোষ্ট বিলুপ্ত করে ম্যানেজারের প্রশিক্ষণ নেবার জন্য তিনি রশীদ হায়দারকে পাঠালেন [[সোনালী ব্যাংক|সোনালী ব্যাংকে]]৷ সৌভাগ্যক্রমে ১৯৭২ সালের অক্টোবরের গোড়ায় তিনি চাকুরী পেয়ে যান [[বাংলা একাডেমী]]তে৷ বাংলা একাডেমীতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তাঁর সেরা কীর্তি স্মৃতি ১৯৭১। সুদীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার পর ১৯৯৯ সালের মে মাসে [[বাংলা একাডেমী]]র পরিচালক হিসাবে অবসর নেন তিনি৷১৯৭২ সালে সংবাদ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন তাঁর জীবনের প্রথম উপন্যাস গন্তব্যের৷ অর্ধেক ছাপা হবার পর কোন এক কারণে লেখার মেজাজাটি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি৷ কিন্তু ১৪ বছর পরে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আকারে ও অসম বৃক্ষ নতুন নামে এটি বের হয় ৷বর্তমানে তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৬০ এর অধিক।<ref name="Rashid haider1">[http://gunijan.org.bd/GjProfDetails_action.php?GjProfId=137 রশীদ হায়দার :উপমা দাশগুপ্ত] </ref>
রশীদ হায়দার বর্তমানে নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।
 
 
 
==ব্যাক্তিগত জীবন==
 
রশীদ হায়দার মাত্র ক্লাস এইটের ছাত্র থাকা কালে তাঁর এক বন্ধুর ছোট বোনকে বড় আকারের ফজলি আম দিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিলেন৷ তবে তিনি উচ্ছন্নে যাননি৷ ছেলেবেলার প্রেমকে তিনি দেখেছেন জীবনের অনিবার্য অংশ ও শিল্প হিসাবে ৷ রশীদ হায়দারের স্ত্রী আনিসা আখতার ওরফে ঝর্ণা [[পাবনা]] এডওয়ার্ড কলেজে তাঁরই সহপাঠী ছিলেন, কিন্তু রশীদ হায়দার তাঁকে ভালোভাবে চিনতেন না৷ আনিসা আখতার উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতকে ভালো ফল করেননি বলে পড়াশুনায় রশীদ হায়দারের চেয়ে দুই বছর পিছিয়ে পড়েন৷ এরপর আনিসা আখতার যখন [[ঢাকা]]য় স্নাতকোত্তর পড়তে আসেন তখন তাঁর সাথে নতুন করে পরিচয় হয়৷ এরপর প্রেম এবং শেষপর্যন্ত বিয়ে৷১৯৬৮ সালের ৫ জানুয়ারীতে তাদের বিয়ে হয় ৷ আনিসা আখতার ও রশীদ হায়দার দম্পতির দুই মেয়ে হেমন্তী হায়দার (হেমা) ও শাওন্তী হায়দার ( ক্ষমা) এবং তাদের দুজনই বিবাহিত৷ রশীদ হায়দারের কাছে ভ্রমণ তাঁর খুব প্রিয় বিষয়৷ [[ইউরোপ]] ,[[ এশিয়া]] ও [[আমেরিকা]]র বহুদেশ তিনি ভ্রমণ করেছেন।<ref name="Rashid haider1"/>
==সন্মাননা==
 
রশীদ হায়দার ১৯৮৪ সালে[[বাংলা একাডেমী]] পুরস্কার লাভ করেন ৷ এছাড়াও তিনি অর্জন করেছেন [[অগ্রণী ব্যাংক]] সাহিত্য পুরস্কার, নেধূ শাহ পুরস্কার, [[পাবনা]] জেলা সমিতি স্বর্ণ পদক, [[রাজশাহী]] সাহিত্য পুরস্কার, হুমায়ুন কাদির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার৷<ref name="Rashid haider"/>
 
==তথ্যসূত্র==
৭৪২টি

সম্পাদনা