"বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

==আন্দোলনের সূত্রপাত==
এই ঘটনা এক প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পূর্ব বঙ্গের মুসলিমদের এই ধারণা হয় যে নতুন প্রদেশের ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ বেড়ে যাবে। যদিও পশ্চিম বঙ্গের জনগণ এই বিভক্তি মেনে নিতে পারল না এবং প্রচুর পরিমাণে জাতীয়তাবাদী লেখা এই সময় প্রকাশিত হয়। ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রস্তাবকদের জন্য এক মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা লেখেন, যা অনেক পরে, ১৯৭২ সালে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়।এই আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে বৃহৎ বঙ্গের অধিবাসী বাঙালি হিন্দু মুসলমানের চেতনার জগতে আলোড়ন সৃষ্টির জন্যই কবিগুরম্ন রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য দেশাত্মবোধক সঙ্গীত রচনা, সুরারোপ ও চারণ কবিদের যত মিছিলে মিছিলে সেসব সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর তারিখ থেকে ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ওই আইন কার্যকর হওয়ার কথা। সুতরাং ওই তারিখে রাজধানী কলকাতায় হরতাল আহ্বান করা হয়। সেদিন কোন বাড়িতে রান্নাবান্না হবে না। বাঙালি জনসাধারণ অরন্ধন পালন করে উপোষ থাকবে। ঔপনিবেশিক শাসকের ঘোষণায় মানচিত্র বদলালেও বাঙালির ঐক্য বজায় রাখার জন্য দেশজুড়ে হবে রাখিবন্ধন উৎসব।<ref>http://www.thedailysangbad.com/print_news.php?news_id=5092&pub_no=57</ref>
 
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা এবং তা কার্যকর করার পর বাংলায় সশস্ত্র আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। ১৯০৬ সালে কংগ্রেসের পূর্ণ অধিবেশনে 'স্বরাজ' শব্দ গৃহীত হয়। স্বরাজ বলতে কংগ্রেসের নরমপন্থীরা বুঝলো ঔপনিবেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন, চরমপন্থীরা বুঝলো স্বাধীনতা। এর থেকে উৎপত্তি হলো বিদেশী পণ্য বর্জন প্রসঙ্গ। চরমপন্থীরা চাইলো সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সর্বাঙ্গীণ বয়কট। নরমপন্থীরা কয়েকটি সীমিত পণ্যের ব্যাপারে তার প্রয়োগ চাইলো। স্বদেশীদের ব্যাপারে নরমপন্থীদের বয়ান ছিল, 'এমন কি স্বার্থত্যাগের দরকার হলেও। আর চরমপন্থীদের বয়ান ছিল 'যে কোন ত্যাগে স্বদেশী'।
 
ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার দেখিয়েছেন, স্বদেশী আন্দোলন তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছিল সে সময়। প্রথমধারাকে বলা যায় গঠনমূলক স্বদেশী। 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এ ধরনের গঠনমূলক কাজের কথা বিশদ করেছিলেন। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, আত্মশক্তির উদ্বোধন। বঙ্গভঙ্গের ঘোষণায় বিদেশী বর্জনের ডাক ওঠে। শুরু হয় স্বদেশী আন্দোলনের। রবীন্দ্রনাথ এই বর্জন বা বয়কটকে মনে করেছেন নঞর্থক। বলেছেন, 'বয়কট দুর্বলের প্রয়াস নহে, ইহা দুর্বলের কলহ।' এই বয়কট স্বদেশীয়ানায় পরিণত করতে ঢাকার রজনীকান্ত সেনের 'মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই' গেয়ে এই ধারার স্বদেশীরা বর্জনে গেলেও, বিলেতি ব্যবসায়ীদের গায়ে তা প্রবল বা দীর্ঘস্থায়ী আঘাত হানতে পারেনি।
 
দ্বিতীয়ধারা বয়কটকে প্রাধান্য দিয়েছিল। তাদের স্বেচ্ছাসেবী দল মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় বাড়ি বাড়ি ফেরি করতো। আদর্শবাদের কমতি না থাকলেও বিলাতী ব্যবসায়ীদের গায়ে তা প্রবল বা দীর্ঘস্থায়ী আঘাত হানতে পারেনি। তবে এই ধারা বয়কটকে একটি সাময়িক এবং রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখেনি। তাদের ধারণা ছিল, এতে বঙ্গভঙ্গও প্রত্যাহৃত হবে। তারা মনে করতেন এই বয়কট স্বরাজ লাভের জন্য প্রয়োজনীয় আত্মীক প্রস্তুতি। তারা একে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ হিসেবে দেখেছেন। এই বয়কট অবশ্য প্রত্যাশিত সাফল্য লাভ করেনি।
 
তৃতীয়ধারায় ছিল চরমপন্থীরা। এরা ছিল দলে ভারী। তাদের কাছে স্বদেশী আন্দোলন এবং বয়কট গৌণ হয়ে যায়। মুখ্য হয়ে ওঠে স্বরাজ। এ নিয়ে কংগ্রেসে তুমুল বিতর্কও হয়। এরই মধ্যে স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে জনমত সংগঠনের জন্য জেলায় জেলায় সমিতি গড়ে ওঠে। গৃহীত নীতি কার্যকর করার জন্য তৈরি করা হয় জাতীয় স্বেচ্ছাসেবীদল। বরিশালে 'স্বদেশ বান্ধব', ময়মনসিংহে 'সুহৃদ' ও 'সাধনা', ফরিদপুরে 'ব্রতী' আর সবচেয়ে বিখ্যাত ঢাকার 'অনুশীলন' সমিতি। জেলা সমিতির অধীনে অনেক শাখাও স্থাপিত হয়। অনুশীলন সমিতির পূর্ববঙ্গ ও আসামে পাঁচশ শাখা এবং সদস্য সংখ্যা গোড়াতে ছিল তিন হাজারের মতো। কলকাতায় গড়ে ওঠে 'যুগান্তর' নামে আরেক সংগঠন। এই দলের নেতা অরবিন্দ ঘোষ। সহোদর বারীন ঘোষ তার সহযোগী। এরা অস্ত্র হিসেবে বোমা ব্যবহার চালু করেন।
 
এই অরবিন্দ ঘোষ নরমপন্থীদের হাত থেকে কংগ্রেসের কর্তৃত্ব কেড়ে নিতে ছিলেন তৎপর। ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠীর মতে, 'প্রকাশ্যে কংগ্রেসের মাধ্যমে এবং গোপনে বিপ্লবীদের মাধ্যমে অরবিন্দ যুগপৎ আক্রমণ করতে চেয়েছিলেন। তার অনুসারীরা পুরোপুরি সন্ত্রাসবাদে ঝুঁকে পড়ে।' ১৯০৭ সালে সুরাটে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে লাঠালাঠি, চেয়ার ভাঙ্গাভাঙ্গি, মাথা ফাটানোর ঘটনা ঘটে। বৃটিশ সাংবাদিক নেভিনসন এই ঘটনার নিখুঁত বর্ণনা রেখে গেছেন। অরবিন্দ ঘোষ পরবর্তীতে লিখেছেন, 'আমি তিলকের (কংগ্রেস নেতা বালগঙ্গাধর তিলক) সঙ্গে পরামর্শ না করেই হুকুম দিয়েছিলাম কংগ্রেস অধিবেশন ভেঙ্গে দিতে।'
 
এই সকল রাজনৈতিক প্রতিবাদের ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে বঙ্গ আবার একত্রিত হয়। ভাষাতাত্ত্বিক এক নতুন বিভক্তির মাধ্যমে হিন্দি, ওড়িয়া এবং অসমি অঞ্চলগুলো বঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা হয়। এরই সাথে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে নয়া দিল্লীতে স্থানান্তর করা হয়।
 
==তথ্যসূত্র==
<references/>
২,০২৮টি

সম্পাদনা