"বাইবার্স‌" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

সম্পাদনা সারাংশ নেই
সুলতান বাইবার্স ভলগা এবং উরাল নদীর মধ্যবর্তী দশথ-ই-কিপচাক/কুমেনিয়া (আজকের কাজাখস্থান) কুমেনিয়ায় ১২২৩ সালের ১৯ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। এই তুর্কোমানের বাল্যকাল অতটা সুখকর ছিল না। তাঁকে খুব অল্প বয়সে ৮০০ দিরহামের বিনিময়ে ক্রীতদাস হিসেবে দামাস্কাসে বিক্রি করে দেয়া হয়। সুলতান কুতুযের মত তাকেও মামলুক হিসেবে ক্রয় করেন আয়ুবিদ সুলতান আল-সালিহের এক সেনা কম্যান্ডার ‘আলাউদ্দিন আইতাকিন বান্দুকদার’। সে থেকেই তিনি ‘বান্দুকদারী’ উপাধিটি পেয়েছেন। এরপর তিনি দীনী শিক্ষা ও রণ-বিদ্যায় পারদর্শী হলে মিশরে সুলতান সালিহের খেদমতে প্রেরিত হন। দীর্ঘকায়, কৃষ্ণবর্ণ, নীল চোখের অধিকারী বাইবারস ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও কর্মচঞ্চল। গমগমে কন্ঠস্বরে ছিল কর্তৃত্বের সুর। এক কথায় নেতৃত্বের সব গুণই তার মধ্যে ছিল।
 
===== সিংহাসনে আরোহণ =====
বাইবার্স এর আশা ছিল আইন জালুতের যুদ্ধে বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে সুলতান কুতুয তাঁকে আলেপ্পোর শাসনভার দেবেন। কিন্তু সুলতান কোন এক কারনে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেননি। ফলে সেই ক্ষোভ ও পূর্ব বিরোধের জেরে এক ষরযন্ত্রের মাধ্যমে সুলতান কুতু্যকে হত্যা করে ২৪ অক্টোবর ১২৬০ খ্রীস্টাব্দে তার স্থলে আল মালিকুজ জাহির উপাধি নিয়ে মিশরের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর অসাধারন রণনৈপূণ্যে মামলুক সালতানাত দূর্ধর্ষ বার্বার,মঙ্গোল,ক্রুসেডার এবং গুপ্তঘাতকদে হাত থেকে নিরাপদ হয়ে পরবর্তী আড়াই শত বছর পর্যন্ত টিকে ছিল।
 
ক্ষমতায় এসেই কায়রোতে আব্বাসীয় খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা সুলতান বাইবার্সের রাজত্বকালের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। ১২৫৮ খৃস্টাব্দে বাগদাদে হালাকু খান কর্তৃক আববাসীয় বংশের শেষ খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহ নিহত হলে মুসলিম জাহান খলিফাশূন্য পয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান বাইবার্স এই খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বিশ্বের বিরাট উপকার সাধন করেন। তিনি সিরিয়া থেকে আব্বাসি বংশের এক ব্যক্তি আবুল কাসেম আহমাদ বিন মহাম্মাদ জাহের বিআমরিল্লাহকে সসম্মানে ডেকে এনে তার কাছে বাইয়াত করেন। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে খেলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
 
===== শিল্প ও সংস্কারে বাইবার্স =====
এরপর সুলতান বাইবার্স পবিত্র স্থানসমূহ সংস্কারের কাজে মনোনিবেশ করেন। প্রথমেই তিনি ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার মসজিদের সংস্কার করেন এবং নব-উদ্যমে সেখানে লেখপড়া ও খুৎবার ব্যবস্থা করেন। অতঃপর সেখানে শাফি মাযহবের একজন প্রধান বিচারকের অধিনে প্রতিটি মাযহাবের প্রতিনিধি হিসাবে চারজন কাযীকে নিযুক্ত করেন যারা পবিত্র কোরআন ও হাদীস অনুসারে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন। এছাড়াও মিশরের বাইরে তিনি বেশি কিছু সংস্কারমূলক কাজ করেন। এর মধ্যে রয়েছে মদিনায় মসজিদে নববীর উন্নয়ন এবং ফিলিস্থিনের আল খালিলে মাসজিদ ইবরাহিমের সংস্কার। ১২৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি জেরুজালেম পরিদর্শন করেন এবং সেখানেও পবিত্র স্থানসমুহের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধন করেন। সাম্রাজ্যের মধ্যে সুন্দর সুন্দর মসজিদ তাঁর স্থাপত্য শিল্পের প্রতি অনুরাগের পরিচয় বহন করে। মসজিদের কলি ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ও জনহিতকর নানা প্রতিষ্ঠানও তৈরী করেছিলেন। তাঁর আমলের স্থাপত্যের মধ্যে তাঁর নামাংকিত মসজিদ এবং বিদ্যালয় (Al-Madrassa al-Zahiriyy) আজও বিদ্যমান। দামাস্কাসে তাঁর সমাধিক্ষেত্রেই আজকের জাহিরিয়া পাঠাগার তৈরী হয়েছে।
 
===== মৈত্রী স্থাপনে বাইবার্সঃ =====
বাইবার্সের শাসনকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মঙ্গোল এবং বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় শাসকের সঙ্গে তার মৈত্রী। সুলতান হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তিনি যাযাবরদের একটি গোষ্ঠির প্রধান অথবা ভলগা উপত্যাকায় কিপচাকের মঙ্গোলদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করেন। কনস্ট্যানটিনোপলের শাসক মাইকেল প্যালিওলোগাসের সঙ্গেও তাঁর সমঝোতা হয়। লাতিন খ্রিস্টানদের কট্টর বিরোধী প্যালিওলোগাস তার শহরে ক্রুসেডারদের হাতে বিধ্বস্ত প্রাচীন মসজিদের পুননির্মাণের নির্দেশ দেন। তারই অনুরোধে এই কাজ তদারকের জন্য সুলতান বাইবার্স একজন মালিকী মতবাদের নেতাকে কনস্ট্যান্টিনোপল পাঠান। নবম লুইয়ের ভ্রাতা ও সিসিলির রাজা আনজাউ-এর চালসের সনহে বাইবার্সের বাণিজ্যিক চুক্তি হয়। বাণিজ্যিক চুক্তি হয় আরাগনের জেমস এবং সেভিলের আলফন্সোর সঙ্গেও।
 
তিনি সিংহলের সহিত দূত বিনিময় করেন এবং দূরপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া তিনি কনস্টান্টিনোপল, সিসিলি, আরাগণ ও অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর বৈদেশিক নীতির ফলে মামলুক সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি পায়। বাইবার্স একজন বিচক্ষণ-ন্যায়পরায়ণ শাসনকর্তা ছিলেন। অনুগত প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন দয়াশীল। কিন্তু অবাধ্য আমীরদের তিনি কঠোর শাস্তি দিতে দ্বিধা করেননি। তিনি তাঁর রাজ্যে মদ,জুয়া প্রভৃতি অনৈসলামিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেন। বাইবার্স একজন ধর্মপ্রাণ সুন্নী মুসলমান ছিলেন। তিনি একটি আদর্শ মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন।
 
===== সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানে অবদানঃ =====
সাম্রাজ্যে নানা প্রকার জনহিতকর কাজের পাশাপাশি তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের একজন অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক আবু-আল-হাসান আলী ইবনে-আল-নাফিস এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক যিনি ফুসফুসে রক্ত চলাচল সম্পর্কে স্পস্ট ধারণার কথা জানিয়েছেন। অথচ এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হয় স্পেনের সারভেটাসকে যার তত্ত্ব রচিত আলী-ইবনে নাফিসের ২৫০ ছর পরে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম জীবনী রচয়িতাদের অন্যতম ইবনে-খাল্লিকান (খ্রিঃ ১২১১-৮২) তাঁর সময়েই রচনা করেন ‘ওফাইয়াত-উল-আ- ইয়ান ওয়া আনবা-উজ-জামান’ শিরোনামের একটি জীবনীমূলক অভিধান গ্রন্থ যাকে নিকলসন সর্বোৎকৃষ্ট জীবনীগ্রন্ত বলেছেন।
তাঁর জীবনী ‘সিরাত আল-জাহির বাইবার্স’ (Life of al-Zahir Baibars) হল একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় আরবীয় সাহিত্য যেখানে রচিত আছে তাঁর যুদ্ধ জয় অর্জনের কথা। কাজাখস্থান, মিশর সিরিয়াতে তিনি বীরের মর্যাদা পান।
 
===== সাহিত্যেকর্মে সুলতান বাইবার্সঃ =====
* Robert E. Howard রচিত "The Sowers of the Thunder” এর মূলনায়ক বাইবার্স
* রাশিয়া-কাজাখ লেখক Moris Simashko (Moris Davidovich Shamas) রচিত উপন্যাস "Yemshan" তে তিনিই প্রধান চরিত্র
৩০,৫৩৭টি

সম্পাদনা