"সত্যজিৎ রায়" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

সম্পাদনা সারাংশ নেই
অপুর সংসার নির্মাণের পরে সত্যজিৎ ''দেবী'' ছবির কাজে হাত দেন। [[হিন্দুধর্ম|হিন্দু]] সমাজের বিভিন্ন মজ্জাগত কুসংস্কার ছিল ছবিটির বিষয়। ছবিটিতে [[শর্মিলা ঠাকুর]] দয়াময়ী নামের এক তরুণ বধুর চরিত্রে অভিনয় করেন, যাকে তার শ্বশুর কালী বলে পূজা করতেন। শর্মিলা পরে এই ছবিতে তাঁর অভিনয় নিয়ে মন্তব্য করেন যে দেবীতে তিনি নিজের থেকে কিছু করেননি, বরং এক জিনিয়াস তাঁকে দিয়ে সেটা করিয়ে নিয়েছিলেন। সত্যজিৎ আশঙ্কা করেছিলেন যে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড হয়ত ছবিটি প্রদর্শনে বাধা দেবে, বা হয়ত তাঁকে ছবিটি পুনরায় সম্পাদনা করতে বলবে, কিন্তু সেরকম কিছু ঘটে নি। [[১৯৬১]] সালে প্রধানমন্ত্রী [[জওহরলাল নেহেরু|জওহরলাল নেহেরুর]] প্ররোচনায় সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে কবিগুরুর ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথের ভিডিও ফুটেজের অভাবে সত্যজিৎকে মূলত স্থিরচিত্র দিয়েই ছবিটি বানানোর চ্যালেঞ্জ হাতে নিতে হয়, এবং তিনি পরে মন্তব্য করেন যে ছবিটি বানাতে তাঁর সাধারণের চেয়ে তিন গুণ বেশি সময় লেগেছিল।<ref>{{Harvnb|Robinson|2003|p=277}}</ref> একই বছরে [[সুভাষ মুখোপাধ্যায়]] ও অন্যান্যের সাথে মিলে সত্যজিৎ ''[[সন্দেশ (পত্রিকা)|সন্দেশ]]'' নামের শিশুদের পত্রিকাটি - যেটি তাঁর পিতামহ একসময় প্রকাশ করতেন - পুনরায় প্রকাশ করা শুরু করেন। সত্যজিৎ এ জন্য বহুদিন ধরে অর্থসঞ্চয় করেছিলেন। <ref>{{Harvnb|Seton|1971|p=189}}</ref> পত্রিকাটি ছিল একাধারে শিক্ষামূলক ও বিনোদনধর্মী, এবং “সন্দেশ” নামটিতে (শব্দটির দুটি অর্থ হয়: “খবর” ও “মিষ্টি”) এই দ্বিত্বতার প্রতিফলন ঘটেছে। সত্যজিৎ পত্রিকাটির ভেতরের ছবি আঁকতেন ও শিশুদের জন্য গল্প ও প্রবন্ধ লিখতেন। পরবর্তী বছরগুলোতে লেখালেখি করা তাঁর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়।
 
১৯৬২ সালে সত্যজিৎ [[কাঞ্চনজঙ্ঘা]] ছবিটি পরিচালনা করেন। এটি ছিল তাঁর বানানো প্রথম মৌলিক চিত্রনাট্যনির্ভর রঙিন চলচ্চিত্র। দার্জিলিং নামের এক পাহাড়ী রিজোর্টে একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের কাটানো এক বিকেলের কাহিনী নিয়ে এই জটিল ও সঙ্গীতনির্ভর ছবিটি বানানো হয়, যে বিকেলে পরিবারের সদস্যরা হঠাৎ করেই পরিবারের দণ্ডমুণ্ড কর্তা ইন্দ্রনাথ রায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ছবিটি প্রথমে একটি বিরাট ম্যানশনে চিত্রায়িত করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু পরে সত্যজিৎ সেই বিখ্যাত রিসোর্টেই দৃশ্যগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে তিনি চিত্রনাট্যটির উত্তেজনা আলো-আঁধারের খেলা ও কুয়াশাকে ব্যবহার করে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। সত্যজিৎ পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন যে তাঁর চিত্রনাট্যে যেকোন ধরনের আলোকসম্পাতেই দৃশ্যগ্রহণ সম্ভব ছিল, অথচ একই সময়ে দার্জিলিং-এ অবস্থানকারী একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণকারী দল সূর্যালোকের অভাবে একটি শটও সম্পন্ন করতে পারেনি। <ref>{{Harvnb|Robinson|2003|p=142}}</ref> ছবিটিতে ইন্দ্রনাথ রায়ের চরিত্রে রূপদানের জন্য সত্যজিৎ [[ছবি বিশ্বাস]]-কে নির্বাচন করেন। এটিই ছিল ছবি বিশ্বাসের করা শেষ ছবি; এর কিছুদিন পরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। এর ফলে সত্যজিৎ পরবর্তীকালে কিছু চরিত্র অঙ্কনে বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়, কেননা তাঁর মনে হয়েছিল একমাত্র ছবি বিশ্বাসই সেসব চরিত্র রূপদান করার যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন ।ছিলেন।
 
এসময় সত্যজিৎ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে বিচারক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন, যদিও তিনি অনুযোগ করতেন যে কলকাতার বাইরে তাঁর নিজেকে সৃষ্টিশীল মনে হত না। [[১৯৬৩]] সালে [[মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব|মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে]] তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন, [[ফেদেরিকো ফেলিন্নি|ফেদেরিকো ফেলিন্নির]] ''[[8½]]'' ছবিটি সেরা পুরস্কার জেতে। ষাটের দশকে জাপান সফরের সময় তাঁর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় চলচ্চিত্র পরিচালক [[আকিরা কুরোসাওয়া|আকিরা কুরোসাওয়ার]] সাথে সাক্ষাৎ করেন। দেশে অবস্থানকালে কলকাতার ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে দার্জিলিং বা [[পুরি]]-তে চলে যেতেন ও সেখানে নির্জনে চিত্রনাট্য লিখতেন।
| author= Neumann P
| publisher=Internet Movie Database Inc | url=http://www.imdb.com/name/nm0006249/bio | title=Biography for Satyajit Ray| accessdate=2006-04-29
}}</ref> পরে ৭০ ও ৮০-র দশকে কলাম্বিয়া বহুবার প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। [[১৯৮২]] সালে যখন ''[[ই.টি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল]] '' মুক্তি পায়, তখন অনেকেই ছবিটির সাথে সত্যজিতের লেখা চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পান। সত্যজিৎ [[১৯৮০]] সালে ''[[সাইট অ্যান্ড সাউন্ড]]'' ম্যগাজিনে লেখা একটি ফিচারে প্রকল্পটির ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেন ও পরে সত্যজিতের জীবনী লেখক [[অ্যান্ড্রু রবিনসন]] এ ঘটনার ওপর আরও বিস্তারিত লেখেন ([[১৯৮৯]] সালে প্রকাশিত ''দি ইনার আই''-এ)। সত্যজিৎ বিশ্বাস করতেন যে তাঁর লেখা ''দি এলিয়েন''-এর চিত্রনাট্যটির মাইমোগ্রাফ কপি সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে না পড়লে স্পিলবার্গের ছবিটি বানানো হয়ত সম্ভব হত না। <ref name=UCSCcurrents>
{{cite news
| author=Newman J
=== শেষ পর্যায় (১৯৮৩–১৯৯২) ===
 
[[১৯৮৩]] সালে ''[[ঘরে বাইরে]]'' ছবির কাজ করার সময় সত্যজিতের [[হার্ট অ্যাটাক]] ঘটে এবং এ ঘটনার ফলে জীবনের অবশিষ্ট নয় বছরে তাঁর কাজের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। স্বাস্থ্যের অবনতির ফলে ছেলে সন্দ্বীপ রায়ের সহায়তায় সত্যজিৎ [[১৯৮৪]] সালে '' ঘরে বাইরে '' নির্মাণ সমাপ্ত করেন। এরপর থেকে তাঁর ছেলেই তাঁর হয়ে ক্যামেরার কাজ করতেন। অন্ধ জাতীয়তাবাদের ওপর লেখা রবীন্দ্রনাথের এই উপণ্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপদানের ইচ্ছা সত্যজিতের অনেকদিন ধরেই ছিল এবং তিনি ৪০-এর দশকে ছবিটির একটি চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন। <ref>{{Harvnb|Robinson|2003|pp=66-67}}</ref> যদিও ছবিটিতে সত্যজিতের অসুস্থতাজনিত ভুলের ছাপ দেখা যায়, তা সত্ত্বেও ছবিটি কিছু সমালোচকের প্রশংসা কুড়ায় এবং এই ছবিতেই সত্যজিৎ প্রথমবারের মত একটি চুম্বনদৃশ্য যোগ করেন। [[১৯৮৭]] সালে সত্যজিৎ তাঁর বাবা সুকুমার রায়ের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
 
শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে সত্যজিৎ তাঁর শেষ তিনটি ছবি অভ্যন্তরীণ মঞ্চে নির্মাণ করেন। এগুলি তাঁর আগের ছবিগুলির চেয়ে আলাদা ও অনেক বেশী সংলাপনির্ভর। [[১৯৮৯]] সালে নির্মিত ''[[গণশত্রু]]'' ছবিটিতে তাঁর পরিচালনা তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং এটিকে দীর্ঘদিনের অসুস্থতাশেষে ফিরে আসার পর সত্যজিতের চলচ্চিত্র নির্মাণের পুনর্প্রচেষ্টা হিসেবেই গণ্য করা হয়। <ref>{{Harvnb|Dasgupta|1996|p=134}}</ref> [[১৯৯০]] সালে নির্মিত ''[[শাখা প্রশাখা]]'' সে তুলনায় উন্নততর ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়। <ref>{{Harvnb|Robinson|2003|p=353}}</ref> এ ছবিতে এক আজীবন সততার সাথে কাটানো বৃদ্ধ ব্যক্তি জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁর তিন ছেলের দুর্নীতির কথা জানতে পারেন; ছবির শেষ দৃশ্যে তিনি তাঁর মানসিকভাবে অসুস্থ কিন্তু দুর্নীতিমুক্ত চতুর্থ সন্তানের সান্নিধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পান। সত্যজিতের শেষ ছবি ''[[আগন্তুক]]'' ছিল হালকা আবহের। এ ছবিতে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া মামার পরিচয় দিয়ে একজন আগন্তুক এক পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর এই সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার (যেখানে পরিবারের ছোট ছেলেটি আগন্তুকটিকে আগ্রহভরে স্বাগত জানায়, কিন্তু পরিবারের বড়রা তাঁকে অনীহা ও সন্দেহের চোখে দেখেন) ভেতর দিয়ে সত্যজিৎ দর্শকের কাছে মানুষের পরিচয়, স্বভাব-প্রকৃতি ও সভ্যতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জাল বোনেন।
</ref> সত্যজিতের চলচ্চিত্রের প্রতি নির্দেশ খুঁজে পাওয়া যায়।
 
মার্কিন অ্যানিমেটেড টেলিভিশন সিরিজ [[দ্য সিম্পসন্‌স]]-এর [[আপু নাহাসাপিমাপেটিলন]] চরিত্রটির নাম রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্বাচন করা হয়। [[মাধবী মুখোপাধ্যায়|মাধবী মুখোপাধ্যায়ের]] সাথে সত্যজিতের ছবি [[ডোমিনিকা]]-র স্ট্যাম্পে স্থান পায় - কোন ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের জন্য এ জাতীয় ঘটনা এটাই প্রথম ।প্রথম। বহু সাহিত্যকর্মে সত্যজিৎ কিংবা তাঁর কাজকে নির্দেশ করা হয়েছে। [[সালমান রুশদি|সালমান রুশদির]] লেখা ''হারুন অ্যান্ড দ্য সি অফ স্টোরিজ''-এ দুইটি মাছের নাম ছিল ''গুপী'' ও ''বাঘা'' (সত্যজিতের “গুপী গাইন” ও “বাঘা বাইন” চরিত্র দুটির নামে)। বহু প্রতিষ্ঠান সত্যজিতকে সম্মানসূচক [[ডক্টরেট]] ডিগ্রী প্রদান করে। এদের মধ্যে [[অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়]] মাত্র দ্বিতীয় চলচ্চিত্রকার হিসেবে ([[চার্লি চ্যাপলিন|চ্যাপলিনের]] পর) তাঁকে এই ডিগ্রী প্রদান করে। [[১৯৮৭]] সালে [[ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি]] তাঁকে [[লেজিওঁ দনর]] পুরস্কার প্রদান করেন। তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছু দিন আগে [[ভারত সরকার]] তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক পদক [[ভারতরত্ন]] প্রদান করেন। [[১৯৯৩]] সালে [[ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্টা ক্রুজ]] সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড স্টাডি কালেকশন প্রতিষ্ঠা করে। [[১৯৯৫]] সালে ভারত সরকার চলচ্চিত্র বিষয়ে গবেষণার জন্য [[সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট]] প্রতিষ্ঠা করেন।
 
[[২০০৭]] সালে [[ব্রিটিশ ব্রডক্যাস্টিং কর্পোরেশন]] (বিবিসি) ঘোষণা দেয় যে, [[ফেলুদা]] সিরিজের দুটি গল্প নিয়ে রেডিও অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হবে।<ref>{{cite web
২,৪০২টি

সম্পাদনা