বাঙালি ব্রাহ্মণ

বৈদিকযুগে বঙ্গের উত্তরাঞ্চল বৈদিক শাসিত বিদেহ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, এই অঞ্চলের অধিবাসীদের বলা হত "বৈদহ" এবং এই অঞ্চলের ব্রাহ্মণরা বৈদহব্রাহ্মণ/বৈদ্যঃব্রাহ্মণ/বৈদ্যব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচিত ছিল।[১]ভাগবতপুরাণের ২য় পর্বে দুইজন বৈদহ রাজা সমুদ্র সেন এবং চন্দ্র সেন কে পান্ডবপক্ষে যোগদান করতে দেখা যায় এবং বীরসেন নামক ঋষিকে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞে ঋত্বিকেের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের সময়কালে এখানে জৈনধর্মের প্রভাব বাড়ে এরপর বৌদ্ধ প্রভাবান্বিত হয়। এইসময় ব্রাহ্মণগণ ভারতের হিন্দু শাসিত অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। এই সময়ে রচিত সনাতনধর্মগ্রন্থে বঙ্গকে হেয়প্রতিপন্ন হতে দেখা যায়। কর্ণাটকে আশ্রয় নেয়া কিছু বৈদেহব্রাহ্মণগণ তাদের পূর্বপুরুষের রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য পুনরায় বাংলায় অভিযান চালায়, বরেন্দ্রসেন "পৌণ্ড্র" রাজ্য জয়লাভ করেন এবং এ রাজ্য "বরেন্দ্র" নামে পরিচিত হয়। এসময় "বরেন্দ্রব্রাহ্মণ" সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। বরেন্দ্রসেন ছিলেন গোপালের সমসাময়িক এবং সম্রাট নির্বাচনে গোপালের প্রতিদ্বন্দ্বী। সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ রাজাদের জন্য বরেন্দ্রসেন সম্রাট নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেননি। কিন্তু তার পরবর্তী বংশধরেরা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং পালরাজ্যকে প্রতিস্থাপিত করে নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বৈদ্যব্রাহ্মণরা প্রচুরপরিমাণে রাজকার্যে নিযুক্ত হতেন। এর বাইরে যাগ-যজ্ঞ এবং বেদ অনুসারে চিকিৎসাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকতেন। ফলতঃ পৌরাণিক পূজার্চনার জন্য পুরোহিত ব্রাহ্মণের সংকট দেখা দিলে কান্যকুব্জ হতে ব্রাহ্মণ আনা হয় এবং এদেরকে সমগ্র বঙ্গে অভিবাসন করা হয়। যে ব্রাহ্মণ যে গ্রামে বাস করতেন, সেটি থেকে তার গাঞীনাম হয়।গাঞীনামকে পদবী হিসেবে ব্যবহারও দেখা যায়। যেমন: ভট্টশালী, চট্টগাঞী, বন্দ্যোঘটি ইত্যাদি গ্রাম থেকে পদবীর উদ্ভব ঘটে।

মানচিত্রে বৈদিক যুগের ভারতবর্ষ।

বঙ্গের উত্তরাঞ্চল, মিথিলা (বিহার) এবং নেপালের দক্ষিনাঞ্চল নিয়ে বিদেহ রাজ্য গঠিত ছিল। প্রাচীন বিদেহ অঞ্চলের ব্রাহ্মণরা বৈদ্যব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। এরা বৈদিক যজ্ঞ করতেন এবং পেশা হিসেবে চিকিৎসা বৃত্তি গ্রহণ করতেন। হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় প্রাচীনকাল অব্দি বঙ্গ অঞ্চলে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন। বর্তমানে এই সম্প্রদায়ভুক্ত পরিবারবর্গ মূলত অধুনা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম, এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেন[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভারত বিভাজিত হওয়ার পর বহু ব্রাহ্মণ পরিবার ভূতপূর্ব পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) থেকে শরণার্থী হিসেবে নবগঠিত ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে আশ্রয় গ্রহণ করে[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

সাধারণত বঙ্গীয় ব্রাহ্মণগণ সুশিক্ষিত পণ্ডিত হয়ে থাকেন[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এবং কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব বঙ্গীয় ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেছেন[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]কলহন বিরচিত রাজতরঙ্গিণীর শ্লোকানুসারে ব্রাহ্মণগণ মূলত পঞ্চ-গৌড় এবং পঞ্চ-দ্রাবিড়, এই দুই ভাগে বিভক্ত। কলহন কর্তৃক রচিত শ্লোকটি নিম্নে প্রদত্ত হল :

কর্ণাটকাশ্চ তৈলঙ্গা দ্রাবিড়া মহারাষ্ট্রকাঃ, গুর্জরাশ্চেতি পঞ্চৈব দ্রাবিড়া বিন্ধ্যদক্ষিণে॥

সারস্বতাঃ কান্যকুব্জা গৌড়া উৎকলামৈথিলাঃ, পঞ্চগৌড়া ইতি খ্যাতা বিন্ধ্স্যোত্তরবাসিনঃ॥

বাঙালি বৈদিক ব্রাহ্মণদের একটি শাখা বৈদ্যব্রাহ্মণ, যারা আয়ুর্বেদ এবং অথর্ববেদ চর্চা করতেন। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ অনুসারে দ্বিজত্ব প্রাপ্তির পর যাঁরা ঋকবেদীয় উপাঙ্গ আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন করতেন তাঁদের বৈদ্যব্রাহ্মণ বা ত্রিজ নামে অভিহিত করা হয়। [২] [৩]

ব্রাহ্মণদের কিছু পদবীসম্পাদনা

বৈদিক ব্রাহ্মণসম্পাদনা

পৌরাণিক/পুরোহিত ব্রাহ্মণসম্পাদনা

  • চক্রবর্তী/চক্রবর্ত্তী
  • বন্দ্যোপাধ্যায়/ব্যানার্জী/ব্যানার্জি
  • গঙ্গোপাধ্যায়/গাঙ্গুলী
  • চট্টোপাধ্যায়/চ্যাটার্জী/চ্যাটার্জি
  • মুখোপাধ্যায়/মুখার্জী/মুখার্জি
  • মজুমদার(বর্ণনিরপেক্ষ উপাধি)
  • উপাধ্যায়
  • গোস্বামী
  • চৌধুরী
  • গড়গড়ী
  • লাহিড়ী
  • মিশ্র
  • খাঁ
  • মৈত্র
  • মাষচটক
  • মহিন্তা
  • সান্যাল
  • বাগচি
  • রাহা (পারিহাল)
  • রায়/রায়চৌধুরী (বর্ণনিরপেক্ষ উপাধি)
  • বাপুলী
  • ঢোল (সান‍্যাল)
  • রায় নারায়ণ(বর্ণনিরপেক্ষ উপাধি)
  • ভাদুড়ী
  • ঘোষাল
  • পুইতুন্ডি
  • পণ্ডিত/পাণ্ডে
  • কাঞ্জিলাল/কুন্দলাল
  • শাস্ত্রী
  • পিরালি/ঠাকুর(বর্ণনিরপেক্ষ উপাধি)
  • অধিকারী(বর্ণনিরপেক্ষ উপাধি)

তথ্যসূত্রসম্পাদনা