ফজলউদদ্বীন মুহাম্মাদ গাজী(ফজল গাজী)(১৫৩০-১৬১০) ভাওয়াল রাজ্যের প্রধান এবং গাজী বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। তিনি ঈসা খাঁর একজন অনুসারী ছিলেন। তিনি শেরশাহ এবং সম্রাট আকবরের সমসাময়িক। তার পিতা দৌলত গাজী ছিলেন সুদূর পাঠানিস্তান এর নিবাসি। বীরত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন।[১]

জনশ্রুতি আছে এই গাজী বংশের নামানুসারেই গাজীপুরের নামকরণ করা হয়।[২][৩] ভাওয়াল পরগণা বিস্তৃত ছিল ময়মনসিংহ, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ,নরসিংদীনারায়নগঞ্জজেলার ৬০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে।

গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জের দুই কিলোমিটার উত্তরে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে এ পরিবার প্রথম বসতি স্থাপন করে। এ বংশের আদি পুরুষ পাহলোয়ান শাহ মুহাম্মাদ জুলফিকারুদ্দিন গাজী পাঠানিস্তান থেকে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে ভাওয়াল এলাকায় আসেন এবং পনের শতকের গোড়ার দিকে এখানে বসতি স্থাপন করেন।তার পূর্বপুরুষেরা ইয়েমেনবাগদাদ থেকে আগত। জুলফিকার শাহ গাজীর পুত্র দৌলত ছিলেন একজন দরবেশ প্রকৃতির লোক। তিনি দিল্লির সুলতানের নিকট থেকে এক সনদের মাধ্যমে ভাওয়াল পরগনার জায়গির লাভ করেন। ফজল গাজী ছিলেন দৌলত গাজীর ছেলে।তিনি ১২ বছর বয়সে জমিদারী লাভ করেন। তার ছোট ভাই শের আলী গাজী ভাওয়ালের উত্তর (সিংহজানী) এলাকায় নিযুক্ত ছিলেন। শেরপুর জেলার নামকরণ তার নাম থেকে হয়।

ফজল গাজী ছিলেন খুবই প্রতাবশালী এবং গাজী বংশের জমিদারদের মধ্যে সর্বাধিক সুবিদিত। তাঁর একটি স্থায়ী স্থল বাহিনী এবং বিপুল সংখ্যক রণতরী সম্বলিত শক্তিশালী নৌবহর ছিল। ফজল গাজী দিল্লির সম্রাট শেরশাহের (১৫৪০-১৫৪৫) সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে (৯৪৫ হি.) শেরশাহের নিকট বহুমূল্য উপঢৌকন পাঠান। সেই উপঢৌকনের অন্তর্ভুক্ত একটি কামান এখন ঢাকা জাদুঘরে রক্ষিত আছে। সোনারগাঁয়ের দেওয়ানবাগে মাটির তলা থেকে উদ্ধারকৃত সাতটি কামানের অন্যতম এটি। কামানটির গায়ে শেরশাহের নামের সঙ্গে খোদিত আছে : ‘আয্ ফজল গাজী’ (ফজল গাজী থেকে প্রাপ্ত)। ভাটির শাসক ঈসা খান মসনদ-ই-আলার সঙ্গে ফজল গাজীর প্রগাঢ় মিত্রতা ছিল। বাংলায় আগত আফগানদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেও শোনা যায়। সম্রাট আকবরের বাহিনীর বাংলায় প্রথম অভিযানকালে (১৫৭৪) ফজল গাজী ভাওয়ালের জমিদার ছিলেন। তিনি মুগল বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন কিনা তা জানা যায় নি, তবে তাঁর পুত্র বাহাদুর গাজী ভাটির শাসক মুসা খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে স্বীয় নৌবহর নিয়ে মুগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

তাঁর রাজ্য চন্দ্রদ্বীপ (সোনা গাজী), বিক্রমপুর (আনওয়ার গাজী) ও ভাওয়াল (বাহাদুর গাজী) এ তিনটি পরগনায় বিস্তৃত ছিল। তাঁর জমিদারিতে অনেক অধীনস্থ তালুকদার ছিলেন যারা তাঁর কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতেন। ফজল গাজী দীর্ঘকাল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন বলে ধারনা করা হয়।

তার ৪ পুত্র ২ কন্যা ছিল। পুত্রঃ

  • বাহারুদ্দিন বাহাদুর গাজী - ভাওয়ালের দায়িত্বধীন, মুসা খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে স্বীয় নৌবহর নিয়ে মুগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। কিন্তু পরে তিনি আর রাজ্যে ফিরেননি।
  • সানওয়ারুদ্দিন গাজী(সোনা গাজী) - চন্দ্রদ্বীপর দায়িত্বে ছিলেন।খুবই শক্তিশালী, পরহেজগার ছিলেন।পরগণা হারানোর পর,

মুলাদীর সফিপুরএ নির্বাসিত হন পিতাসহিত।

  • আনওয়ারুদ্দিন গাজী(অমরেন্দ্র কুমার চৌধুরী) - ভাওয়াল এর দায়িত্বে, কিন্তু ধর্ম পাল্টিয়ে বিদ্রোহ করে রাজত্ব কায়েম করে।
  • রহমতুল্লাহ গাজী - যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হন এরপর রাজপুতানায় পালিয়ে যান।

ঈসা খাঁ-র সাথে তার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, মোঘল সেনাপতি মানসিংহের সাথে যুদ্ধ বাঁধার আশঙ্কা দেখা দিলে ফজল গাজী ভাওয়ালের বর্জাপুর (বর্তমান বক্তারপুর) একটা নৌ পোতাশ্রয় এবং দুর্গ গড়ে তুলেন, মোঘল সাম্রাজ্যের সাথে লড়াইয়ের ব্যাপারে তারা প্রায়ই এক সাথে শলা-পরামর্শ করতেন এবং তারা বীরত্বের সাথে জোট বেঁধে লড়াই করতেন।[৪] শেষ জীবনে মুঘল দের কাছে হেরে তিনি ও তার ছেলে সানওয়ারুদ্দিন গাজী(সোনা গাজী) বাকেরগঞ্জ এর মুলাদীতে বসবাস করেন।১৬১৫ সালে তিনি মুলাদীর সফিপুর গ্রামে মৃত্যবরন করেন। তার এক বংশধর নীল গাজী ১৮৫৭ তে বিদ্রোহের সাথে মিলে ইংরেজদের সাথে লড়াই করে শহীদ হন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "ফজল গাজী"। বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৫ 
  2. "স্বাধীনচেতা বিপ্লবী বীর ঈশা খাঁ ও তাঁর সহযোদ্ধা ফজল গাজী"বিজ্ঞাপন চ্যানেল। ১০ মে ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৫ 
  3. ইসলাম, এম নজরুল (১৭ ডিসেম্বর ২০১৪)। "গাজীপুর : ইতিহাসের পাতা থেকে"দৈনিক ভোরের কাগজ। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৫ 
  4. রফিকুল, মোহাম্মদ (২১ জুন ২০১৪)। "সখ্যতায়-শত্রুতায় মোঘল আর গাজী"বহুমাত্রিক। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]