প্রধান মেনু খুলুন

পূর্ব নাগরী বর্ণমালা বা প্রাচ্য নাগরী বাংলা, সিলটিঅসমীয় ভাষাসহ বেশ কিছু ভাষায় ক্ষুদ্র বৈচিত্র সহকারে ব্যবহৃত হয়। এর ব্যবহার মূলত বাংলা ও অসমীয় ভাষাতেই অধিক। এছাড়াও এই বর্ণমালা ঐতিহাসিক ভাবে বিভিন্ন ভাষা যেমন, বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী, মৈতৈ মনিপুরীককবরক ভাষায় ব্যবহৃত হয়েছে। আরো কিছু ভাষা যেমন, খাসি, বোদো, কারবি, মিসিং ইত্যাদিতে পূর্বযুগে এই বর্ণমালায় লেখা হতো। [১]

পূর্বী নাগরী
ধরন
আবুগিডা
ভাষাসমূহসিলোটি
অসমীয়া
বাংলা
বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী
মেইতেই
এবং অন্যান্য
সময় কাল
সি ১১০০-বর্তমান
উদ্ভবের পদ্ধতি
প্রোটো সিনেইটিক বর্ণমালা [a]
  • ফিনিশীয় বর্ণমালা [a]
    • এরামিক বর্ণমালা [a]
      • ব্রাহ্মী
        • গুপ্ত
          • সিদ্ধম
            • পূর্বী নাগরী
সহোদ পদ্ধতি
বাংলা, সিলটি ও অসমীয়া
দিকবামদিক থেকে ডানদিকে
আইএসও ১৫৯২৪Beng, 325
ইউনিকোড উপনাম
বাঙালি
U+0980–U+09FF
[a] সেমেটিক অঞ্চলের ব্রাহ্মী লিপি সার্বজনীন ভাবে স্বীকৃত নয়।

বিবরণসম্পাদনা

পূর্ব নাগরী বর্ণমালা খুব কম ব্লকি এবং বর্তমানে এর বর্ণগুলো আরো বেশি সর্পিলাকাকৃতির। এই বর্ণমালার উদ্ভব হয়েছে সিদ্ধম বর্ণমালা থেকে। ১৭৭৮ সালে যখন চার্লস উইকিন্স প্রথম পূর্ব নাগরী বর্ণমালার অক্ষরস্থাপক ছিলেন, তখন এর আধুনিক রূপ বিধিবদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন ভাষায় কোন বর্ণ কিভাবে উচ্চারণ করা হয়ে থাকে তার ওপর ভিত্তি করে বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় পূর্ব নাগরীর বর্ণমালার একই বর্ণের ভিন্ন রূপ দেখা যায়।

পূর্ব নাগরী বর্ণমালা আগে কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষার সাথে যুক্ত ছিলো না। তবে মধ্যযুগে ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বর্ণমালা হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেছিলো। এই বর্ণমালা দিয়ে সংস্কৃত ভাষাও লেখা হতো। হিন্দু ধর্মের মহাকাব্য, যেমনঃ মহাভারতরামায়ণ, পূর্ব নাগরী বর্ণমালার পুরাতন সংস্করণে লেখা হয়েছিলো। মধ্যযুগের পরবর্তী সময়ে সংস্কৃত লেখার একমাত্র ভাষা হয়ে উঠে পালি। অবশেষে পালি ভাষার স্বদেশীয় পরিভাষা বাংলা, অসমীয়া ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ভাষায় বিবর্ধিত হয়ে গেলো। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে শঙ্করদেব ভক্তি মূলক কবিতা রচনার ভাষা হিসেবে অসমীয়া ও ব্রজভালি লিখতে উক্ত বর্ণমালা ব্যবহার করেন। তার পূর্বে মাধব কান্দালি এই বর্ণমালা ব্যবহার করে চতুর্দশ শতকে অসমীয় ভাষায় রামায়ণ লিখেন। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সাহিত্যের সমৃদ্ধময় সংকলন উক্ত বর্ণমালায় লেখা হয়েছে, যা বর্তমানে কদাচিৎ সংস্কৃত লিখতে ব্যবহৃত হয়।

ব্যাঞ্জনবর্ণ প্রকাশ করতে বিভিন্ন, কখনো সম্পূর্ন আলাদা বর্ণ ব্যবহার করা হয়। তাই এই বর্ণমালা পড়া শিখতে বর্ণের বক্রতা, বর্ণ সমন্বয়, ৫০০ পর্যন্ত সংখ্যা লেখা ইত্যাদি কারণে অনেক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাংলা ভাষার জন্য একে প্রমিতকরণের চেষ্টা অনেক উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে করা হচ্ছে, যেমনঃ ঢাকার বাংলা একাডেমীভারতের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমী, কোলকাতা। তবে এটি আজ পর্যন্ত পুরোপুরি অভিন্ন হয়নি। এখনো অনেক ব্যক্তি সেকেলে বর্ণ আকৃতি ব্যবহার করছে। ফলে একই ধ্বনীর জন্য একাধিক বর্ণ প্রচলন থেকেই যাচ্ছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভিন্নতার মধ্যে উক্ত বর্ণমালার ভিন্নতা শুধুমাত্র বাংলা ও অসমীয়া ভাষার ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ পদ্ধতিতে রয়েছে।

ধারণা করা হয়, পূর্ব নাগরী বর্ণমালার প্রমিতকরণ প্রক্রিয়া কম্পিউটারে লিখন উপযোগীতার দ্বারা প্রভাবিত হবে। ২০০১ সালের দিক থেকে এই কাজ শুরু হয়েছে। ইউনিকোড ফন্টের উন্নতির কাজও তখন থেকে চলছে। মনে করা হয় যে, এটি আধুনিক ও সনাতন, এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে।

 
এখানে অসমীয়া ভাষায় লেখা আছে, "শ্রীশ্রীমত্‌শিৱসিংহমহাৰাজা"" (Sri Sri Môt Xiwô Xinghô Môharaza) এখানে ব্যবহৃত বিন্দু যুক্ত র (wô) আধুনিক "ৱ" ("wô/vô") এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে।

বর্ণমালাসম্পাদনা

পূর্ব নাগরী বর্ণমালার বর্ণকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথাঃ স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ।

স্বরবর্ণসম্পাদনা

বর্তমানে পূর্ব নাগরী বর্ণমালায় ১১টি স্বরবর্ণ রয়েছে। এই ১১টি বর্ণের সাহায্যে বাংলা ভাষার ৭টি স্বরধ্বনী ও অসমীয়া ভাষার ৮টি স্বরধ্বনী লেখা হয়, এর সাথে কিছু দীর্ঘ স্বরধ্বনীও রয়েছে। এই সমস্ত স্বরবর্ণ বাংলা ও অসমীয়া উভয় ভাষাতেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিছু স্বরবর্ণের উচ্চারণ শব্দভেদে আলাদা হয়ে থাকে। কিছু স্বরবর্ণের উচ্চারণ আধুনিক বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় উহ্য রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপঃ  স্বরধ্বনী [i] ও [u] উচ্চারণের জন্য এই বর্ণমালায় দুইটি করে স্বরবর্ণ আছে। পূর্ব নাগরী বর্ণমালা যখন সংস্কৃত ভাষা লিখতে ব্যবহার করা হতো তখন থেকেই এই ভাষায় একটি হ্রস্ব ই (short [i] ) এবং একটি দীর্ঘ ঈ (long [iː]) ধ্বনী ছিলো, ঐতিহ্যগত কারণেই যা এখনো ব্যবহার করা হয়, যাদের লিখনরূপ আলাদা হলেও উচ্চারণ সময় আলাদা করা হয় না। হ্রস্ব উ এবং দীর্ঘ ঊ স্বরবর্ণের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম মেনে চলা হয়। দুইটি পরিবর্তিত  স্বরবর্ণ অ' এবং অ্যা কে পূর্ব নাগরী বর্ণমালার অন্তর্ভূক্ত মনে করা হয় না। তবুও এই দুই বর্ণ বাংলা  ও অসমীয়া ভাষায় প্রচুর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিশেষত যখন অভীষ্ট উচ্চারণ অস্পষ্ট হয়।

Vowel Table
Vowels Vowel Diacritic

symbol

অসমীয়া ভাষা সিলোটি বাংলা ভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা মৈতৈ ভাষা [১]
- ô - ô ô ô/a
অ' ' o - - - -
a ꠀ/a/আ

য়া

a a a:
ি i ꠁ/i/ই

য়ি

i i i
i - i i -
u ꠃ/u/উ

য়ু

u u u
u - u u -
ri - ri ri -
rii - rii - -
li - li - -
lii - lii - -
ê ꠄ/e/এ

য়ে

e/ê e e
এ' ে' e - - - -
ôi - ôi ôi ei
û ꠅ/o/ও

য়ো

u/o u o/ô
ôu - ôu ôu ou

ব্যাঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ স্পষ্ট করার জন্য অনেক সময় ব্যাঞ্জনবর্ণের সাথে স্বরবর্ণ যুক্ত করা হয়, যেমনঃ ক=ক্+অ। স্বরবর্ণের অনুপস্থিতে কোন ব্যাঞ্জনবর্ণ লিখতে বর্ণের নীচে হসন্ত চিহ্ন (্) দেওয়া হয়।

ব্যঞ্জনবর্ণসম্পাদনা

পূর্ব নাগরী বর্ণমালায় ব্যাঞ্জনবর্ণের প্রতীকের নাম বর্ণটির মূল উচ্চারণের সাথে স্বরবর্ণ ‘অ’ ô যুক্ত করে করা হয়। এই স্বরবর্ণটি লেখার সময় উহ্য থাকে। অধিকাংশ বর্ণের নাম অনন্য। অর্থাৎ ‘ঘ’ বর্ণের নাম ঘ ghô নিজেই, gh নয়। আধুনিক বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় কিছু কিছু বর্ণের নাম তার উচ্চারণ থেকে ভিন্ন হয়েছে, যেমনঃ /n/ ধ্বনীর উচ্চারণকে ন, ণ এবং ঞ দ্বারা প্রকাশ করা হয়, যাদের শব্দের বানান অনুযায়ী লেখা হয়ে থাকে। এই বর্ণত্রয়কে শুধু nô বলা হয় না। তাদের যথাক্রমে ‘দন্ত্য ন’, ‘মধ্যূর্ণ ণ’ ও ইয়ো বলা হয়। একই ভাবে বাংলায় /ʃ/ ধ্বনি ও অসমীয়ায় /x/ ধ্বনিকে তালব্য শ (shô/xhô), মধ্যূর্ণ ষ (shô/xhô) ও দন্ত্য স বলা হয়।

Consonant Table
Consonant অসমীয়া ভাষা সিলটি বাংলা ভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা মৈতৈ ভাষা
ꠇ/K/ক

ko

khô ꠇ/Kx/খ

kxo

khô khô khô
ꠉ/G/গ

go

ghô ꠊ/Gh/ঘ

gho

ghô ghô ghô
ngô ꠋ/Nz/ঙ

anz

ngô ngô ngô
ꠌ/C/চ

co

chô/sô chô chô
ssô ꠍ/S/ছ

so

chhô/ssô chhô -
ꠎ/J/জ

jo

zhô ꠏ/Jh/ঝ

jho

jhô jhô jhô
- -
ꠐ/T/ট

to

ţô ţô -
thô ꠑ/Th/ঠ

tho

ţhô ţhô -
ꠒ/Dv/ড

dvo

đô đô -
ড় ŗô ꠠ/Rq/ড়

rqo

ŗô ŗô -
dhô ꠓ/Dvh/ঢ

dvho

đhô đhô -
ঢ় ŗhô - ŗhô ŗhô -
- -
ꠔ/Tv/ত

tvo

thô ꠕ/Tvh/থ

tvho

thô thô thô
ꠖ/D/দ

do

dhô ꠗ/Dh/ধ

dho

dhô dhô dhô
ꠘ/N/ন

no

ꠙ/P/প

po

ꠚ/Pf/ফ

pfo

ꠛ/B/ব

bo

bhô ꠜ/Bh/ভ

bho

bhô bhô bhô
ꠝ/M/ম

mo

- -
য় -
- ꠞ/R/র

ro

- - - -
ꠟ/L/ল

lo

- -
xhô - shô shô -
xhô - shô shô -
ꠡ/Sx/স

Sxo

ꠢ/H/হ

ho

সংখ্যাসম্পাদনা

Digits
আরবি সংখ্যা পদ্ধতি 0 1 2 3 4 5 6 7 8 9
বাংলা সংখ্যা পদ্ধতি
সিলটি নাম
ꠡꠥꠘ꠆ꠘ ꠄꠈ ꠖꠥꠁ ꠔꠤꠘ ꠍꠣꠁꠞ ꠚꠣꠍ ꠍꠄ ꠡꠣꠔ/ꠢꠣꠔ ꠀꠐ ꠘꠄ
Sxunno Ekx Dui Tvin Sair Pfas Soe Sxatv/Hatv Aat Noe
সুন্নো এখ দুই তিন ছাইর ফাছ ছএ সাত/হাত আট নএ
অসমীয়া নাম xhuinyô ek dui tini sari pas sôy xat ath
শূন্য এক দুই তিনি চাৰি পাচ ছয় সাত আঠ
বাংলা নাম shunyô æk dui tin char pãch chhôy sat nôy
শূন্য এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয়
মৈতৈ নাম ama ani ahum mari manga taruk taret nipa:l ma:pal tara:
অমা অনি অহুম মরি মঙা তরুক তরেৎ নিপাল মাপল তরা

ইউনিকোডে পূর্ব নাগরীসম্পাদনা

পূর্ব নাগরী বর্ণমালার ইউনিকোড ব্লক হলো U+0980–U+09FF:

বাংলা[১][২]
অফিসিয়াল ইউনিকোড কনসোর্টিয়াম কোড চার্ট (PDF)
  0 1 2 3 4 5 6 7 8 9 A B C D E F
U+098x
U+099x
U+09Ax
U+09Bx ি
U+09Cx
U+09Dx
U+09Ex
U+09Fx
টীকা
১.^ ইউনিকোড সংস্করণ ১১.০ অনুসারে
২.^ ধূসর এলাকা অনির্ধারিত জায়গা ইঙ্গিত করে।

বহিঃ সংযোগসম্পাদনা

নোটসম্পাদনা

  1. Prabhakara, M S Scripting a solution ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১০ জুলাই ২০০৭ তারিখে, The Hindu, 19 May 2005.

তথ্যসূত্রসম্পাদনা