পিনোসাইটোসিস

অন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়া

কোষীয় জীববিজ্ঞানে, পিনোসাইটোসিস (ইংরেজি: pinocytosis; যা প্রবাহী এন্ডোসাইটোসিস (fluid endocytosis) এবং আয়তনিক-দশা পিনোসাইটোসিস (bulk-phase pinocytosis) নামেও পরিচিত) বলতে এক ধরনের এন্ডোসাইটোসিস বোঝায় যেখানে বহিঃকোষীয় প্রবাহীতে ভাসমান ক্ষুদ্র কণাসমূহকে কোষ ঝিল্লির কোষবদ্ধকরণ (ইংরেজি: invagination, প্রতিবর্ণী. ইনভ্যাজিনেশন) এর মাধ্যমে কোষের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা হয়। এর ফলে কোষের অভ্যন্তরে একটি ক্ষুদ্র গহ্বরে এই ক্ষুদ্র কণাগুলো ভাসমান অবস্থায় থাকে। এই পিনোসাইটিক গহ্বরগুলো এরপর আদি এন্ডোসোমের সাথে একীভূত হয়ে কণাগুলোকে আর্দ্রবিশ্লেষিত করে (ভেঙে ফেলে)।

পিনোসাইটোসিস

অনুসৃত পন্থার ওপর নির্ভর করে পিনোসাইটোসিসকে আরও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা যায়: ম্যাক্রোপিনোসাইটোসিস, ক্ল্যাথরিন-ঘটিত (clathrin) এন্ডোসাইটোসিস, ক্যাভিওলান-ঘটিত (claveolin) এন্ডোসাইটোসিস, অথবা ক্ল্যাথরিন- এবং ক্ল্যাভিওলান-স্বাধীন এন্ডোসাইটোসিস। এদের মধ্যে তফাৎ হচ্ছে গহ্বর গঠনের ক্রিয়াকৌশল এবং গঠিত গহ্বরের আকারে।

আণবিক ক্রিয়াকৌশল এবং অভ্যন্তরীণ অণুসমূহের ওপর ভিত্তি করে পিনোসাইটোসিসকে আরও কয়েকটি শ্রেণিতে উপবিভক্ত করা হয়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে, পিনোসাইটোসিসকে গঠনমূলক প্রক্রিয়া বলে বিবেচনা করা হয়; অন্যান্য ক্ষেত্রে তা সংবেদক-ঘটিত (receptor-mediated) ও অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে সংঘটিত হয়।

পিনোসাইটোসিসসম্পাদনা

মানবদেহে এই প্রক্রিয়া মূলত চর্বি কণা শোষণের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়। অন্তঃকোষীয় (বা এন্ডোসাইটোসিস) প্রক্রিয়ায়, উদ্দিষ্ট বহিঃকোষীয় পদার্থের চারপাশে কোষ ঝিল্লি প্রথমে প্রসারিত ও তারপর ভাঁজ হয়ে থলের মত আকার ধারণ করে, একটি অভ্যন্তরীণ থলিকা (vesicle) গঠনের পর যার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। কোষবদ্ধ পিনোসাইটোসিস থলিকাসমূহের আকার কোষভক্ষণ (ইংরেজি: phagocytosis, প্রতিবর্ণী. ফ্যাগোসাইটোসিস) প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট থলিকাগুলোর চেয়ে ক্ষুদ্রতর হয়ে থাকে। এই থলিকাগুলো পরে লাইসোসোম এর সাথে একীভূত হয়ে এর অন্তর্বর্তী উপাদানসমূহ হজম হয়ে যায়। পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কোষীয় শক্তির দরকার পড়ে, যা এটিপি হিসেবে পাওয়া যায়।

পিনোসাইটোসিস এবং এটিপি

প্রধানত বহিঃকোষীয় প্রবাহী (extra-cellular fluids, ECF) মুক্তকরণ এবং প্রতিরোধ-ক্ষমতা তত্ত্বাবধানের উদ্দেশ্যে পিনোসাইটোসিস ব্যবহৃত হয়।[১] কোষভক্ষণের সাথে বিসাদৃশ্যপূর্ণভাবে, বিকল্প পদার্থসমূহ যেমন- লিপিড (চর্বি) থেকে এ প্রক্রিয়ায় থেকে খুব অল্প পরিমাণে এটিপি উৎপন্ন হয়। সংবেদক-ঘটিত অন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়া'র (receptor-mediated endocytosis) মত পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়া পরিবাহিত পদার্থের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নয়। এক্ষেত্রে কোষ, উপস্থিত সকল দ্রব সহই প্রবাহীকে পরিবেষ্টিত করে ফেলে। পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়া কোষভক্ষণ (বা ফ্যাগোসাইটোসিস) প্রক্রিয়া হিসেবেও কাজ করে; এখানে তফাৎ শুধু এই যে, কোষভক্ষণ প্রক্রিয়া কী ধরনের পদার্থ পরিবহন করবে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট। কোষভক্ষণে সকল কণা পরিবেষ্টিত হয়ে যায়, যা পরে বিভিন্ন উৎসেচক, যেমন- ক্যাথেপ্‌সিন, সহযোগে বিশ্লিষ্ট হয়ে কোষ কর্তৃক শোষিত হয়। অন্যদিকে, পিনোসাইটোসিস ঘটে যখন কোষ ইতোমধ্যে দ্রবীভূত বা বিশ্লিষ্ট খাদ্যকে পরিবেষ্টন করে থলিকা গঠন করে।

পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়া অ-নির্দিষ্ট (non-specific) এবং অ-শোষণমূলক (non-absorptive)। অণু-সুনির্দিষ্ট অন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়াকে বলা হয় সংবেদক-ঘটিত অন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়া (receptor-mediated endocytosis)।

পারিভাষিক ব্যুৎপত্তি এবং উচ্চারণসম্পাদনা

পিনোসাইটোসিস এর ইংরেজি পরিভাষা pinocytosis (/ˌpɪnəsˈtsɪs, ˌp-, -n-, -sə-/) শব্দটি গঠিত হয়েছে       এর সমন্বয়ে, যেগুলো গ্রিক হতে আগত নব্য লাতিন ভাষার শব্দাংশ।  অর্থ পান করা (to drink) এবং   অর্থ কোষীয় প্রক্রিয়া (cellular process)। ১৯৩১ সালে ওয়াল্টার এইচ. লুইস কর্তৃক শব্দটি প্রস্তাবিত হয়।[২]

অ-নির্দিষ্ট, অধিশোষণমূলক পিনোসাইটোসিসসম্পাদনা

অ-নির্দিষ্ট, অধিশোষণমূলক পিনোসাইটোসিস হচ্ছে এক ধরনের অন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়া (এন্ডোসাইটোসিস), যেখানে কোন কোষ-পৃষ্ঠ হতে ক্ষুদ্র থলিকা বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে কোষ কর্তৃক ক্ষুদ্রাকার কণাসমূহ গৃহীত হয়।[৩] ঋণাত্মক কোষ-পৃষ্ঠের সাথে ক্যাটায়নিক আমিষ আবদ্ধ হয় এবং ক্ল্যাথরিন-ঘটিত ব্যবস্থা'র মাধ্যমে তা সংগৃহিত হয়; এজন্য এটি সংবেদক-ঘটিত অন্তঃকোষীয় প্রক্রিয়া এবং অ-নির্দিষ্ট, অ-অধিশোষণমূলক পিনোসাইটোসিস এর অন্তর্বর্তী পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। ক্ল্যাথরিন-প্রলেপযুক্ত গহ্বর (clathrin-coated pits) কোষের প্রায় ২ শতাংশ পৃষ্ঠতল দখল করে রাখে এবং মাত্র মিনিটখানেক স্থায়ী হয়; প্রতি মিনিটে প্রায় ২,৫০০ সংখ্যক হারে কোষের পৃষ্ঠতল ত্যাগ করে। প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই ক্ল্যাথরিন প্রলেপ-গুলো হারিয়ে যায়, এবং তারপর এর আবরণ রি-সাইক্লিং প্রক্রিয়ায় কোষ-পৃষ্ঠে প্রত্যাবর্তন করে।

ম্যাক্রোপিনোসাইটোসিসসম্পাদনা

ম্যাক্রোপিনোসাইটোসিস হচ্ছে একটি ক্ল্যাথরিন-স্বাধীন অন্তঃকোষীয় ক্রিয়াকৌশল যা কার্যত সকল প্রাণিদেহে সংঘটিত হতে পারে। অধিকাংশ কোষের ক্ষেত্রেই এটি অবিরামভাবে সংঘটিত হয় না, বরং সুনির্দিষ্ট বাহক (যেমন- বৃদ্ধি নিয়ামক, ইন্‌টেগ্রিন এর লিগ্যান্ড, কোষ অবশেষ, এবং কিছু কিছু ভাইরাস) দ্বারা সক্রিয় কোষ-পৃষ্ঠের সংবেদক এর প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ স্বল্প সময়ের জন্য আবিষ্ট হয়। এই লিগ্যান্ডগুলো একটি জটিল সংকেত পথ কার্যকর করে, যার ফলে অ্যাক্‌টিন (এক ধরনের আমিষ) এর গতিপ্রকৃতি এবং কোষ-পৃষ্ঠের স্ফীতিতে পরিবর্তন আসে, যা কুঁচি (ruffles) নামে পরিচিত। এই কুঁচিগুলো বিনষ্ট হয়ে যখন আবার ঝিল্লিতে ফিরে যায়, তখন বৃহদাকার প্রবাহী-পূর্ণ অন্তঃকোষীয় থলিকা গঠিত হয়, যাদের ম্যাক্রোপিনোসোম বলা হয়; যা অস্থায়ীভাবে কোষের প্রবাহী গ্রহণ ক্ষমতাকে দশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। ম্যাক্রোপিনোসাইটোসিস সম্পূর্ণভাবে একটি অবক্ষয়মূলক প্রক্রিয়া: ম্যাক্রোপিনোসোম প্রথমে অম্লায়ন ও তারপর বিলম্বিত এন্ডোসোম অথবা এন্ডোলাইসোসোমের সাথে গলে যায়; রি-সাইক্লিং এর মাধ্যমে তাদের বাহককে আর কোষ ঝিল্লিতে ফেরত পাঠায় না।[৪]

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Abbas, Abul, et al. "Basic Immunology: Functions and Disorders of the Immune System." 5th ed. Elsevier, 2016. p.69
  2. Rieger, R.; Michaelis, A.; Green, M.M. 1991. Glossary of Genetics. Classical and Molecular (Fifth edition). Springer-Verlag, Berlin, [১].
  3. Alberts, Johnson, Lewis, Raff, Roberts, Walter: "Molecular Biology of the Cell", Fourth Edition, Copyright 2002 P.748
  4. Alberts, Bruce (২০১৫)। Molecular biology of the cell (Sixth সংস্করণ)। New York, NY। পৃষ্ঠা 732। আইএসবিএন 978-0-8153-4432-2ওসিএলসি 887605755 

গ্রন্থপঞ্জিসম্পাদনা

  • Campbell, Reece, Mitchell; "Biology", ৬ষ্ঠ সংস্করণ, গ্রন্থস্বত্ব ২০০২, পৃ. ১৫১
  • Marshall, Ben; Incredible Biological Advancements of the 20th Century, ৬ষ্ঠ সংস্করণ, গ্রন্থস্বত্ব ২০০১, পৃ. ৮৯৯
  • Alrt, Pablo; Global Society Harvard study, গ্রন্থস্বত্ব ২০০৩, পৃ. ১৮৯
  • Brooker, Robert; "Biology", ২য় সংস্করণ, গ্রন্থস্বত্ব ২০১১, পৃ. ১১৬
  • Cherrr, Malik; The Only Edition, গ্রন্থস্বত্ব ২০১২, পৃ. ২৫৬
  • Abbas, Abul, et al. "Basic Immunology: Functions and Disorders of the Immune System.", ৫ম সংস্করণ, এল্‌সেভিয়ার, ১০১৬, পৃ. ৬৯