ড.পঞ্চানন মিত্র (২৫ মে ১৮৯২ – ২৫ জুলাই ১৯৩৬) ছিলেন প্রখ্যাত অধ্যাপক  ও নৃতত্ত্ববিদ। [২] প্রথম ভারতীয় হিসাবে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় পডাশোনা করেন এবং নৃতত্ত্ব বিষয়ে দেশে-বিদেশে বহু গবেষণা করেছেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ছিলেন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘’প্রিহিস্টোরিক ইন্ডিয়া’’, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত  ‘’হিস্ট্রি অফ অ্যামেরিকান অ্যানথ্রোপলজি’’ এবং ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ইন্দো-পলিনেশিয়ান মেমোরিজ গ্রন্থের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁকে “রয়াল অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ইন্সটিটিউট অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড”-এর ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। নৃবিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতি বৎসর “পঞ্চানন মিত্র মেমোরিয়াল বক্তৃতা”-র আয়োজন করে থাকে [৩][৪]

পঞ্চানন মিত্র
জন্ম(১৮৯২-০৫-২৫)২৫ মে ১৮৯২[১]
মৃত্যু২৫ জুলাই ১৯৩৬(1936-07-25) (বয়স ৪৪)[১]
পরিচিতির কারণনৃতত্ত্ববিজ্ঞানী
দাম্পত্য সঙ্গীনির্মলা মিত্র

জন্ম, ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবার

সম্পাদনা

পঞ্চানন মিত্র ব্রিটিশ ভারতে কলকাতার পূর্বশহরতলীর শুঁড়ায় (বর্তমানে বেলিয়ঘাটা) ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে মে এক অভিজাত কায়স্থ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা উদয়েন্দ্রলাল মিত্র। উর্দু ও বৈষ্ণব কবি জন্মেজয় মিত্র ছিলেন তাঁর পিতামহ। সেকালের মিত্র পরিবার ছিল বাংলার আদি ও সম্ভ্রান্ত  পরিবারগুলির অন্যতম। বাংলার নবাবের কাছ থেকে তাঁরা যথেষ্ট সম্মান ও সমাদর লাভ করতেন। পরিবারের পূর্বপুরুষ রাজা পীতাম্বর মিত্র পলাশীযুদ্ধে বিপর্যয়ের পর অওধে আসেন এবং সেখানে বসবাস করতে থাকেন। দিল্লির সম্রাট শাহ-আলমের সেনাপতিরূপে রাজা উপাধিসহ বহু সম্মান লাভ করেন। কিন্তু পরে গোলাম কাদেরের বিদ্রোহে দিল্লি সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে অবসর গ্রহণ করে কলকাতায় ফেরেন এবং শুঁড়ার বাগান অঞ্চলে প্রাসাদ নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। মিত্র পরিবারের বহু সদস্যই সাহিত্যিক মহলে পরিচিত ছিলেন। পীতাম্বর ও তাঁর পৌত্র জন্মেজয় ব্রজবুলি কবিতা রচনা করতেন। তাঁর পিতা জন্মেজয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। জন্মেজয়ের তৃতীয় সন্তান স্যার  রাজেন্দ্রলাল মিত্র কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সভাপতি ও বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে জুলাই পঞ্চানন মিত্র প্রয়াত হন [২]

শিক্ষাজীবন

সম্পাদনা

পঞ্চানন নারিকেলডাঙা হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আই.এ, রিপন কলেজ বর্তমানের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইংরাজীতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বি.এ পাশ করে 'অবিনাশচন্দ্র স্বর্ণপদক' লাভ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে এম.এ পাশ করেন।[৪]

কর্মজীবন

সম্পাদনা

১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বঙ্গবাসী কলেজের ইংরাজীর অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ভারতের প্রাগৈতিহাসিক শিল্প ও কারিগরি বিষয়ে গবেষণাপত্রের জন্য 'প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি' লাভ করেন। মহেঞ্জাদাড়ো ও অন্যান্য প্রাচীন স্থান ভ্রমণ করেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্ব বিভাগ খোলা হলে তিনি তাতে যোগ দিয়ে ক্রমে তার প্রধান হন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে বিশপ মিউজিয়াম ফেলোশিপ লাভ করে ভারতের সাথে পলিনেশিয়ান সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনার জন্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হাভেনে যান। হনলুলু জাদুঘরের ডিরেক্টরের আহ্বানে পলিনেশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। [৫] ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের জন্য ভরতি হন। আমেরিকার নৃতাত্ত্বিক ক্লার্ক উইসলার তত্ত্বাবধানে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল হিস্টোরিক্যাল ইনভেস্টিগেশন ইনটু দ্য মেথড  অ্যান্ড রিসার্চ কনসেপ্টশান ইন অ্যামেরিকান অ্যানথ্রোপলজি। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসাবে এই কাজ করেন এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। [১] ইয়েলে, তিনি ক্লার্ক উইসলারের তত্ত্বাবধানে কাজ করেছিলেন। [২] পঞ্চানন মিত্র ভারতে ও ভারতের বাইরে বহু দেশে নৃতাত্ত্বিক বিষয়ের অভিযান ও সর্বেক্ষণে নেতৃত্ব দেন। তাঁর বহু বিশিষ্ট শিক্ষার্থী ছিল। তাদের অন্যতম ছিলেন নির্মলকুমার বসু যিনি মহাত্মা গান্ধীর ব্যক্তিগত সচিব হিসাবে দেশভাগের পূর্বে নোয়াখালী দাঙ্গায় তাঁর সহযাত্রী ছিলেন।

পুরস্কার এবং সদস্যপদ

সম্পাদনা

তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বহু পদক ও ফেলোশিপ লাভ করেন এবং বেশ কয়েকটি পেশাদার সংস্থার সদস্য ছিলেন। তিনি গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের রয়াল অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ লাভ করেন। তিনি ভারতীয় জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অবৈতনিক সহকারী কিউরেটর নিযুক্ত হন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি কলকাতার অনারারি ম্যাজিসেট্রট ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বানে সেই পদ ত্যাগ করেন। পরে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলার হন। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস সংস্থার নৃতত্ত্ব বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি হন এবং ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে লখনউ-এ অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান পপুলেশন কংগ্রেসের নৃতাত্ত্বিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। [৬] তাছাড়া তিনি 'আমেরিকান  মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি'-র সহযোগী সদস্য ছিলেন। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি নৃবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য প্রতি বৎসর পঞ্চানন মিত্র স্মৃতি বক্তৃতা-র আয়োজন করে থাকে। [২]

উত্তরাধিকার

সম্পাদনা

২০০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর রচিত গ্রন্থ ম্যানুয়াল অফ প্রিহিস্টোরিক ইন্ডিয়া তে যদিও নৃতত্ত্বের বাইরের কিছু বিষয় অন্তর্গত হয়েছে, তবুও উত্তরাধিকার হিসাবে এটি  ভারতে নৃতত্ত্বের প্রবর্তন ও বিকাশ সম্পর্কিত বিষয়ে প্রামাণ্যগ্রন্থ হিসাবে শিক্ষাজগতে সমাদৃত হয়েছে। বর্তমানে ভারতের চল্লিশটির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠন পাঠনে এই বইটি ব্যবহৃত হয়। [২]

রচনাবলী

সম্পাদনা

আরও দেখুন

সম্পাদনা

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. Bulletin of Yale University Series 37, No. 1 1 January 1941. p. 295 PDF ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ মার্চ ২০১৬ তারিখে
  2. Bose, Kaushik (2006) Panchanan Mitra. Current Science 91(11), Indian Academy of Sciences. PDF
  3. "Obituary: Dr. Panchanan Mitra"। 138, 750-750 (31 October 1936)। ডিওআই:10.1038/138750a0   এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  4. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬ পৃষ্ঠা ৩৮৩, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  5. "Bishop Museum Fellowships" 
  6. Obituary of Panchanan Mitra in Current Science Vol. 5, Aug. 1936 PDF