নূর মোহাম্মদ (শিক্ষানুরাগী)

নূর মোহাম্মদ (১৯১৯-১৯৮২), একজন প্রখ্যাত শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও লেখক। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে জাতি গঠনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে ঢাকাতে তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২ মে ২০১৯ তারিখে নামে দুইটি স্কুল এবং পরবর্তীতে পিরোজপুর জেলায় নিজ গ্রামে পশারি বুনিয়া হাই স্কুল ও পশারি বুনিয়া মাদ্রাসা নামে দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল স্বরূপ, প্রতিষ্ঠার মাত্র ৯ (নয়) বছর সময়ের মধ্যে ১৯৬৪ সালে তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়টি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ স্কুল নির্বাচিত হয়।

এই চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বর্তমান তেজগাঁও কলেজ, কুর্মিটোলা বিএএফ শাহীন কলেজ ও নাটোরের নাজিম উদ্দিন হাই স্কুলের সূচনালগ্ন ও সংকটকালীন সময়ে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার প্রসার ও অবদানের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক তিনি “তমঘায়ে খেদমত” উপাধিতে ভূষিত হন। এছাড়াও ১৯৬৪ সালে তিনি সমগ্র পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদক অর্জন করেন। জাতীয় শিক্ষা কমিশনে বিভাগীয় কমিশনার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

 
জনাব নূর মোহাম্মদ, প্রতিষ্ঠাতা, তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলায় ভান্ডারীয়া উপজেলার পশারি বুনিয়া গ্রামে। ১৯১৯ সালে এই গ্রামেই এক শিক্ষাব্রত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন এই মহান মানুষটি। তাঁর পিতা পণ্ডিত আবদুল গফুর ও মাতা নূর জাহান বেগম। তখনকার সময়ে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে তাঁর পিতার যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিলো। তাঁর মা নূর জাহান বেগমও ছিলেন একজন শিক্ষিতা নারী। তিনি কলকাতা শিক্ষা বোর্ড থেকে স্কলারশিপ পেয়ে প্রাইমারি সেকশন থেকে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

ছেলেবেলা থেকেই জনাব নূর মোহাম্মদ একজন ভদ্র-নম্র, সহজসরল এবং লেখাপড়ায় মনোযোগী ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। কিন্তু ছোটবেলাতেই তাঁর মা পরলোকগমন করলে, ঘরে আর মন টেকাতে পারেননি তিনি। নিজের মতো করে থাকতে কিছুদিনের মধ্যেই গৃহত্যাগ করেন কিশোর নূর মোহাম্মদ । তারপর লজিং থেকে ও ছাত্রদের প্রাইভেট পড়িয়ে মেট্রিকুলেশন ও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি। ১৯৩৫ সাথে তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র মোহন কলেজের বিএ কোর্সে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৩৮ সালে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি বিএবিটি ও এলএলবি পাশ করেন।

১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত রাজেন্দ্র মোহন কলেজে অধ্যায়নের সময় তিনি ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এক সময় মরহুম তমিজউদ্দিন খান এই সঙ্ঘের সভাপতি ও মরহুম ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া) সহ-সভাপতি ছিলেন। এই সূত্রে মরহুম ইউসুফ আলী চৌধুরীর খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেন জনাব নূর মোহাম্মদ। ছাত্র জীবনে কিছু সময় তিনি মরহুম ইউসুফ আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত সেক্রেটারি হিসেবেও কাজ করেছিলেন। পরবর্তীকালে মরহুম তমিজউদ্দিন খান যখন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিমন্ত্রী হন, তখন ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত কিছুদিন তিনি তাঁরও প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

জনাব নূর মোহাম্মদের প্রকৃত কর্ম জীবন শুরু হয় ১৯৪২ সালে, ফরিদপুর জেলা বোর্ডের সেক্রেটারি পদে যোগদানের মাধ্যমে । ১৯৪৮ সালে তিনি “দৈনিক কৃষক” পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন।

১৯৪৮ সালে নাটোরের নাজিম উদ্দিন হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর শিক্ষকতা জীবন। এরপর ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকায় তেজগাঁও পলিটেকনিক হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়।

অক্লান্ত প্রচেষ্টায় একসময় ফার্মগেটে পিআইএ এর খালি জায়গায় একটি স্কুল করার বিশেষ অনুমতি পান তিনি। এই স্থানেই তিনি একটি নতুন স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেন এবং এখানেই তিনি ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকেন। এই স্কুল থেকেই তিনি তাঁর কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

 
যুবক বয়সে জনাব নূর মোহাম্মদ, প্রতিষ্ঠাতা, তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

এ ছাড়াও সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান মরহুম এম কে বাশার সাহেবের অনুরোধে ঢাকার কুর্মিটোলায় নতুন প্রতিষ্ঠিত বিএএফ শাহীন স্কুলে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি অনারারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকাসম্পাদনা

এই মহান মানুষটির জীবনে শিক্ষাই ছিল একমাত্র ব্রত। তাঁর প্রায় পুরোটা কর্মজীবনই তিনি শিক্ষার প্রসারে উৎসর্গ করেছেন। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সূচনালগ্ন ও সংকটাকালীন সময়ে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন।

১৯৪৮ সালে যখন তিনি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ও চরম ছাত্র সংকটে ভুগতে থাকা নাটোরের নাজিম উদ্দিন হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, ঠিক একই সময় তমিজউদ্দিন খান পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং তাঁকে জাতীয় সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে চাকরির প্রস্তাব দেন। কিন্তু জনাব নূর মোহাম্মদের ধমনীতে ছিলো পণ্ডিতের রক্ত এবং ইতিমধ্যেই শিক্ষকতাকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। তাই বিনয়ের সাথে এই লোভনীয় সরকারি চাকরিটির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে, সংকটে জর্জরিত স্কুলটির উন্নয়নকেই তিনি তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। যোগদানের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই, তিনি তাঁর প্রজ্ঞা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ও চরম ছাত্র সংকটে ভুগতে থাকা এই বিদ্যালয়টিকে উক্ত অঞ্চলের একটি সেরা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন।

১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকায় অবস্থিত তেজগাঁও পলিটেকনিক হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু যোগদানের পর তিনি দেখতে পান যে স্কুলের অবস্থা তথৈবচ - মাত্র গুটিকয়েক ছাত্র, ফান্ড নেই বললেই চলে। তাঁর যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন সরকার কোনরকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই, ভাওয়াল রাজার দান করা ২২ বিঘা জমি সহ স্কুলটিকে হুকুম দখল করে নেয় ও সেখানে টেকনিক্যাল হাই স্কুল নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে, যা বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩০ মে ২০২০ তারিখে নামে পরিচিত। এমতাবস্থায় তৎকালীন স্কুল কমিটি স্কুলটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করে।

স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাঁর উপার্জনের সংস্থানটিও বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি উচ্চ মহলে তাঁর ভাল যোগাযোগ থাকায়, বিশেষ করে তৎকালীন স্পীকার তমিজউদ্দিন খানের সহায়তায় সহজেই তিনি একটি ভাল চাকরি জোগাড় করতে পারতেন। কিন্তু, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভাসমান ও নিরুপায় ৭/৮ জন ছাত্র ও গুটিকয়েক শিক্ষককে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা তাঁর ভাবনাতেও আসেনি। তাঁর চিরকালীন শিক্ষক হৃদয় তাকে অন্য কিছু বলল। নতুন একটি স্কুলের জায়গার জন্য তিনি বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দিতে থাকলেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং ডা. টি আহমেদ, জনাব দোহা ও তৎকালীন স্পীকার তমিজউদ্দিন খানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অবশেষে ফার্মগেটে এলাকায় পিআইএ এর খালি জায়গায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ অনুমতি পেলেন তিনি। কিন্তু স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও স্মৃতি হিসেবে তিনি এই নতুন স্কুলটিরও নামকরণ করেন তেজগাঁও পলিটেকনিক হাই স্কুল। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন স্কুলটির নিত্য সঙ্গী হয়ে রইলো। মাত্র কিছুদিন পরেই গভর্নর আজম খান মাত্র ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে পিআইএ এর জায়গা খালি করে দেয়ার নির্দেশ জারি করেন। আবারও একবার তিনি ছুটলেন স্কুল বাঁচানোর লক্ষ্যে এবং এবারও তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এলেন মরহুম তমিজউদ্দিন খান। অনেক চেষ্টার পর স্কুলের সার্বিক অবস্থা  তিনি গভর্নরকে বোঝাতে সক্ষম হলেন। নোটিশ প্রত্যাহার হলো এবং স্কুলটি  বেঁচে গেলো। ১৯৫৫ সালে তেজগাঁও পলিটেকনিক হাই স্কুলের যে দুটি বালক ও বালিকা শাখা যাত্রা শুরু করেছিল, ১৯৮১ সালে জাতীয়করণের পর, পরবর্তীতে স্কুল দুইটির নতুন নামকরণ হয় তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এই দুইটি স্কুল প্রতিষ্ঠা ছাড়াও পিরোজপুরে নিজ গ্রামে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ও খরচে তিনি পশারি বুনিয়া হাই স্কুল ও পশারি বুনিয়া মাদ্রাসা নামে একটি স্কুল ও একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমান তেজগাঁও কলেজের সূচনালগ্নেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শুরুর দিকে কলেজের দুঃসময়ে, যখন কলেজটি ক্যাম্পাস সংকটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো, তখন নূর মোহাম্মদ সাহেব কলেজ রক্ষার্থে এগিয়ে আসেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত তেজগাঁও পলিটেকনিক হাই স্কুলে কলেজটির জন্য জায়গা করে দেন। তারপর বেশ কিছু সময় এই স্কুল ক্যাম্পাসেই ঢাকা নাইট কলেজ নামে কলেজটির কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং এটি ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়।  

বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান মরহুম এম কে বাশার ১৯৭২ সালে ঢাকার কুর্মিটোলায় বিমান বাহিনীর জন্য বিএফএফ হাই স্কুল নামে একটি নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুরোধে জনাব নূর মোহাম্মদ ১৯৭৩ এর জুন থেকে ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত স্কুলটির অনারারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে স্কুলটিতে উচ্চ মাধ্যধিক কোর্স চালু হয় এবং বর্তমানে এটি বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা নামে সুপরিচিত।

সাংবাদিকতাসম্পাদনা

১৯৪৮ সালে “দৈনিক কৃষক” পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তেজগাঁও পলিটেকনিক হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি “দৈনিক মিল্লাত” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।    

সম্মাননাসম্পাদনা

১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন (উভয় পাকিস্তান একত্রে) এবং স্বর্ণ পদক দ্বারা সন্মানিত হন। একই বছর তিনি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদক অর্জন করেন। পরবর্তীকালে শিক্ষার প্রসার ও অবদানের জন্য তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক “তমঘায়ে খেদমত” উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৬৯-১৯৭০ সালে শিক্ষা বিভাগ ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড তাকে “কৃতি প্রধান শিক্ষক” সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়াও একসময় তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিশনে বিভাগীয় কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তি নূর মোহাম্মদসম্পাদনা

ব্যক্তিগত জীবনে জনাব নূর মোহাম্মদ ছিলেন একজন অত্যন্ত সৎ, সজ্জন, বিনয়ী, মিষ্টভাষী, ধর্মভীরু ও প্রচার বিমুখ ব্যক্তি। তাঁর জীপনযাপন প্রণালী ছিলো অত্যন্ত সাধাসিধা ধরনের। প্রায়ই তিনি একটা কথা বলতেন, “কী কী জিনিস না হলেও আমি চলতে পারি।“ ব্যক্তি জীবনে এই বাক্যটিই ছিলো তাঁর জীবন দর্শন। তাঁর পোশাক ছিল খুবই সাদামাটা – লম্বা শার্ট, পাজামা ও পায়ে বাটার জুতা। সারা জীবন তিনি আম কাঠ নির্মিত সাধারণ চকিতে ঘুমিয়েছেন বলে জানা যায়।

তাঁর নিকটজন ও প্রাক্তন সহকর্মীদের থেকে তাঁর সততা সম্পর্কেও নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় ব্যক্তি জীবনে তিনি কতটা নিষ্ঠাবান ও সৎ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। এগুলোর মধ্যে দুটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। নিজ বাড়িতে তিনি গরু পালতেন জনাব নূর মোহাম্মদ। সেই গরু স্কুলের মাঠে ঘাস খেতো বলে ঘাসের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ তিনি নিয়মিত স্কুল ফাণ্ডে জমা করতেন। একবার স্কুলের দারোয়ান হোসেন মিয়া তাঁর অজান্তে স্কুলের গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে নিয়ে তাঁর স্ত্রীর হাতে দেন। তাঁর স্ত্রী এই কাঁচা আম দিয়ে আচার বানান। এই তথ্য জানতে পেরে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হন এবং আমের মূল্যের সমপরিমান টাকা তৎক্ষণাৎ স্কুল ফাণ্ডে জমা করে দেন।

তাঁর প্রচার বিমুখ চরিত্র সর্বজনবিদিত। নিজ উদ্যোগে ও পরিশ্রমে তিনি তিনটি স্কুল ও একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অন্য অনেক সমাজসেবকরা যেমন করেন, তিনি তাদের অনুসরণ করেননি এবং তাদের মতো করে কোন প্রতিষ্ঠানের নামকরণই তিনি তাঁর নিজের বা পূর্ব-পুরুষের নামে করেননি। বরং উক্ত এলাকার নাম অনুসারেই তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর নামকরণ করেছিলেন।

গ্রন্থসমূহসম্পাদনা

  • ইংরেজি বাংলা অভিধান (বইটি ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত)
  • ইংরেজি ব্যাকারন সংক্রান্ত “A Way to English Grammar” গ্রন্থটি সহ আরও দুটি ব্যাকরন গ্রন্থ।  
  • পবিত্র আল কোরানের বাংলা অনুবাদ (১ম পারা)  
  • ইসলাম ও আখলাক (ইসলামিক জীবন আচরণ বিষয়ক গ্রন্থ)
  • তোহফায়ে ইসলাম ও মোনাজাতে কবুল (ধর্মীয় অনুবাদ গ্রন্থ)  
  • গীতিচয়ন (কবিতা গ্রন্থ)
  • এইতো পৃথিবী (সামাজিক উপন্যাস)

মৃত্যুসম্পাদনা

১৯৮২ সালের ২৯শে আগস্ট রাত ১:৩০ মিনিটে মহান এই শিক্ষাব্রতীর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো মাত্র ৬৩ বছর। তারই প্রতিষ্ঠিত তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জামে মসজিদের উত্তর পাশে একখণ্ড জমিতে তাঁকে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।    

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

https://www.tejgaoncollege.edu.bd/

http://www.tghs.edu.bd/