নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত

নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (জন্ম: ৩ মে ১৮৮৩ - মৃত্যূ: ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪) একজন আইনজীবী, অধ্যাপক এবং প্রগতিশীল সাহিত্যিক।

নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত
জন্ম(১৮৮৩-০৫-০৩)৩ মে ১৮৮৩
মৃত্যু১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪(1964-09-17) (বয়স ৮১)
জাতীয়তাবাংলাদেশী
মাতৃশিক্ষায়তনকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
পেশাঅধ্যাপক, আইনজীবী, সাহিত্যিক
পরিচিতির কারণঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান,
জগন্নাথ হলের প্রথম প্রভোস্ট

জন্ম ও শৈশবসম্পাদনা

নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত বাংলাদেশের বগুড়া জেলায় তার মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল টাঙ্গাইলের বাঁশীতে। তার পিতার নাম মহেশচন্দ্র। মহেশচন্দ্র ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।

শিক্ষা এবং কর্মজীবনসম্পাদনা

১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে নরেশচন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে এম এ পাস করেন। তারপর তিনি নিও-জার্মান অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ফিলোজফির উপরে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি কলেজে গবেষণা করেন। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ওকালতি পাস করে তিনি হাইকোর্টে যোগ দেন। এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে অধ্যাপনা আরম্ভ করেন । তিনি প্রাচীন ভারতের ব্যবহার এবং সমাজনীতি নিয়ে গবেষণা করে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ডিএল উপাধি পান। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা আইন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল নিযু্ক্ত হন। ১৯২০ থেকে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ছিলেন। আইন উপদেষ্টা হিসাবে তিনি খ্যাতিলাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতায় আইন ব্যবসা শুরু করেন । তিনি এই সময়ে ডিন অফ দ্য ফ্যাকাল্টি অফ ল হন । ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠাকুর আইন অধ্যাপক হন । ইউনেস্কোর আমন্ত্রণে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে যোগ দেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় আইন কমিশনের সদস্য হন । কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন সময়ে রিপন কলেজ এবং সিটি কলেজের সাথেও যুক্ত ছিলেন। আইন সংক্রান্ত কিছু গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন । যার মধ্যে ইভোলিউশন অফ ল বিখ্যাত।[১]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মসম্পাদনা

তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম প্রধান ও জগন্নাথ হলের প্রথম প্রোভস্ট।[২] ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগদানের পূর্বে তিনি ঢাকা কলেজের সহঅধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে তিনি নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন ও পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দাবি করেন। তার উৎসাহে জগন্নাথ হলের বার্ষিক পত্রিকা "বাসন্তিকা" প্রকাশিত হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরে এলে তিনি বাসন্তিকার জন্য তার বিখ্যাত গান "এই কথাটি মনে রেখ" লিখেছিলেন।

সাহিত্যকর্মসম্পাদনা

সফল আইনজীবীর পাশাপাশি তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক ছিলেন । তিনি বহু প্রবন্ধ, গল্প, নাটক ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যে জীবনধর্মী উপন্যাস রচনার পথিকৃৎ । তাকে নিয়ে এক সময় বাংলা সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা এবং নীতি ও দুর্নীতির বিতর্ক হয়েছিল। তিনি ছিলেন সুষ্ঠ যৌন আবেগমূলক রোচক সাহিত্যের গুরু। তার উপন্যাসে যৌন এবং অপরাধ তত্ত্ববিশ্লেষণ প্রাধান্য পেয়েছিল। তিনি নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে তথাকথিত বিশুদ্ধ সতীত্বের থেকে বেশি মর্যাদা দিয়েছিলেন। তার দীর্ঘ ওকালতি জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে মানবমনের নানা কুটিল গতিপ্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করেছিল। তার একাধিক উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছিল। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৬০টি । ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন Abbey of Bliss নামে।[১]

তার প্রথম উপন্যাস শুভায় (১৯২০) নায়িকার স্বামীর গৃহ ত্যাগ এবং স্বাধীন জীবনযাপনের ইচ্ছার সাহসের পরিচয় পাওয়া যায়। পাপের ছাপ-এ (১৯২২) দুঃসাহসিকতার পরিচয় আরো স্পষ্ট। যৌনভাবাশ্রিত ক্রিমিনাল মনোবৃত্তির চিত্রণ বাংলা উপন্যাসে এই প্রথম। মেঘনাদ-এ দেখা যায় নায়িকার চরিত্রে জন্মগত অপরাধীর স্বাভাবিক পাপপ্রবণতার চিত্র। লুপ্তশিখায় পতিতা নারীর জীবনের ক্লেদাক্ত গ্লানিময় দিকটিকে আদর্শবাদের আবরণে গোপন করে রাখবার কোন চেষ্টা করা হয় নি। সর্বহারায় পাওয়া যায় বেপরোয়া নাস্তিকের ছবি। বিপর্যয়ে দেখানো হয়েছে বৈপরীত্যের চিত্র । মনোরমার কঠোর বৈধব্য ব্রত পালন, আত্মনিগ্রহের ভিতর দিয়ে যৌবন চঞ্চলতার অনুভব ও এই নবজাত আকাঙ্খার বিবাহে পরিতৃপ্তি সাধন। আর অনীতার ভোগ এবং ঐশ্বর্যপূর্ণ জীবনের কঠোর বৈরাগ্য ও কোমল বৈষ্ণব প্রেমতত্ত্ব উপলব্ধির মধ্যে পরিসমাপ্তি - এই দুটি চিত্র পরিবর্তন সম্ভাবনার দুই বিপরীত সীমা স্পর্শ করেছে।

কিন্তু এই চরিত্রগুলিতে প্রাণ সঞ্চারের অক্ষমতা, ঘটনা সমাবেশের আকস্মিকতা এবং তাদের অবিশ্বাস্য দ্রুত নাটকীয় পরিবর্তন, ভাব গভীরতার অভাব প্রভৃতির জন্য তার উপন্যাসগুলিতে নূতনত্বের প্রতিশ্রুতি যতটা আছে পূর্ণতা ততটা নেই। আধুনিক বাংলা উপন্যাসে তার গুরুত্ব সম্পর্কে ড: শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন: "বর্তমানে তিনি কেবল কতকগুলি নূতন ঈঙ্গিত ও পথ নির্দেশের কৃতিত্ব দাবী করিতে পারিবেন। তথাপি এই নূতন ধারা প্রবর্তনের দ্বারা তিনি যে উপন্যাসের সীমা প্রসারিত করিয়াছেন তাহা সর্বোতোভাবে স্বীকার্য।"

রাজনৈতিক জীবনসম্পাদনা

প্রথম জীবনে তিনি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিনি কংগ্রেস কর্মী হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯২৫-২৬ খ্রিষ্টাব্দে নবগঠিত ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজ্যান্টস্ পার্টির প্রেসিডেন্ট হন। পরে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে লেবার পার্টি অফ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২১ জুন ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত শোকসভায় নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সঙ্ঘের যে সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছিল তিনি তারও সভাপতি হয়েছিলেন । বাংলা সাহিত্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রগতিশীল চিন্তা বিস্তারের ক্ষেত্রে এই সঙ্ঘের বিশেষ অবদান ছিল।

রচিত গ্রন্থসম্পাদনা

  • শুভা (১৯২০)
  • পাপের ছাপ (১৯২২)
  • অগ্নি সংস্কার (১৯১৯)
  • অভয়ের বিয়ে
  • রূপের অভিশাপ (গল্পগ্রন্থ)
  • ঠানদিনি (গল্পগ্রন্থ)
  • আনন্দ মন্দির (১৯২৩ নাটক)

সম্মাননাসম্পাদনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনের কনফারেন্স কক্ষটির নাম নরেশচন্দ্রের সম্মানে ‘অধ্যাপক ড. নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত কনফারেন্স কক্ষ’ নামকরণ করা হয়।[৩][৪]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৪৪-৩৪৫, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  2. "হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রনাথ"কালি ও কলম। নভেম্বর ২২, ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুলাই ২০১৭ 
  3. "জগন্নাথ হলের বিভিন্ন ভবনের নতুন নাম"দৈনিক সমকাল। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ২৯ জুলাই ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুলাই ২০১৭ 
  4. "ঢাবি জগন্নাথ হলে ভবন ও ল্যাবের নতুন নাম"যায়যায়দিন। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জুলাই ২০১৭