দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়

নব্য বাংলার নেতা, সমাজ সংস্কারক

রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় (২ অক্টোবর ১৮১৪ - ১৫ জুলাই ১৮৭৮) সংযুক্ত প্রদেশের শঙ্করপুরের তালুকের তালুকদার এবং ১৯ শতকের ভারতে ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা ছিলেন। তিনি একজন বক্তা, বেশ কয়েকটি সাময়িকীর সম্পাদক এবং একজন সমাজ সংস্কারক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। বেথুন স্কুলের জন্য জমি দান করে এবং ডেভিড হেয়ারকে তার সামাজিক কাজে সহায়তা করেন দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি নামে পরিচিত দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়[১] বর্তমানে তার বংশধররা ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর আমেরিকায় রয়েছে।

দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জ্জী
Dakshinaranjan Mukherjee.jpg
জন্ম২ অক্টোবর ১৮১৪
মৃত্যু১৫ জুলাই ১৮৭৮
পেশাসমাজ সংস্কারক
দাম্পত্য সঙ্গীজ্ঞানদাসুন্দরী দেবী বসন্ত কুমারী

জীবনের প্রথমার্ধসম্পাদনা

দক্ষিণরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতায়। পিতা জগন্মোহন মুখোপাধ্যায় (পূর্বনাম পরমানন্দ) এবং মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী। তার পৈতৃক নিবাস ছিল অধুনা উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ভাটপাড়ায়। পিতা পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির ঘর-জামাই ছিলেন। দক্ষিণারঞ্জন হেয়ার স্কুল এবং হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। হিন্দু কলেজের ছাত্র থাকাকালীন, তিনি ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের মূল ব্যক্তি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডেরোজিও দ্বারা প্রভাবিত হন। তার বন্ধু কৃষ্ণ মোহন বন্দ্যোপাধ্যায় যখন খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য তার বাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন, মুখার্জি তাকে সুরক্ষা এবং সমর্থন দিয়েছিলেন।[১]

কলকাতায় ক্রিয়াকলাপসম্পাদনা

ছাত্র থাকাবস্থায় দক্ষিণরঞ্জন মুখার্জি ১৮৩১ সালে জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকা প্রকাশিত করেন।[২] পরের বছর এটি দ্বি-ভাষিক পত্রিকায় পরিণত হয়। তিনি সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদপত্র দমনের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্যোগী এবং বেঙ্গল স্পেক্টেটরে নিয়মিত অবদান রেখেছিলেন। তিনি আইনজীবী হিসাবে অনুশীলন করেন এবং কলকাতা পুরসভার সংগ্রাহক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় ছিলেন।[৩] পরে তিনি মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারেও কাজ করেন[১]

একবার তিনি ডেভিড হেয়ারকে ৬০,০০০ টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। পরিশোধে অক্ষম হওয়ায় কারণে ডেভিড হেয়ার দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জিকে তার পরিবর্তে কিছু জমি দিয়েছিলেন। দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি, পালাক্রমে, ১৮৪৯ সালে জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনকে এই জমিটি মেয়েদের জন্য কলকাতার প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেন।[১][৪]

বিবাহসম্পাদনা

১৮৩২ সালে বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পরে, দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি কিছু আইনি বিবাদের জেরে ওই পরিবারের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তিনি তেজচন্দ্রের মহারাজার যুবতী বিধবা ৮ম স্ত্রী বসন্ত কুমারীর সাথে দেখা করেন। পরে দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি তাকে রেজিস্ট্রেশন করে বিবাহ করেন। এই ঘটনা কলকাতায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি এবং বসন্ত কুমারী পালিয়ে গিয়ে বিবাহ করার পরে মেয়েটির বাবা প্রাণচাঁদ কাপুরের হাতে ধরা পড়ে।[৫]

তবে বসন্ত কুমারী আবার দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জির সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার জন্য তার বাবার হেফাজত থেকে পালাতে সক্ষম হন। ১৮৫১ সালে লখনউতে একত্রে চলে এসেছিলেন। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় এবং বয়সে বড় তার স্ত্রীকে নিয়ে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লখনউতে ছিলেন।

লখনউ-এর জীবনকালসম্পাদনা

১৮৫১ সালে সপরিবারে লখনউ আসার পর তিনি এক বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ সরকারকে নানাভাবে সাহায্য করে পুরস্কার স্বরূপ ১৮৫৯ সালে শংকরপুরের বিদ্রোহী তালুকদারের বাজেয়াপ্ত তালুক লাভ করেন। লখনউ তথা অযোধ্যার সহকারী অবৈতনিক কমিশনার নিযুক্ত হন। অযোধ্যার তদানীন্তন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের বিখ্যাত প্রমোদ-উদ্যান কৈশরবাগের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে সুবিখ্যাত ক্যানিং কলেজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এই কলেজে সংস্কৃত ও আইনের অধ্যাপকের প্রয়োজন হওয়ায় পুরাতন বন্ধু রাজকুমার সর্বাধিকারীকে আহ্বান করেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে "লখনৌ টাইমস্", 'সমাচার হিন্দুস্থানী'ও 'ভারত পত্রিকা' নামে সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। তিনি জমিদারদের শিক্ষায়তন ওয়ার্ড ইনস্টিটিউটের বেসরকারি পরিদর্শক ছিলেন। অযোধ্যা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সমিতি (১৮৬১) এবং লখনউ ক্যানিং কলেজ (পরবর্তীকালে লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়) স্থাপন ছিল তার অন্যতম কীর্তি। তিনি লখনউ-এ রাজনৈতিক আন্দোলনেরও নেতা ছিলেন। সরকার মনোনীত ও জননির্বাচিত সমান সংখ্যক সভ্য নিয়ে প্রাদেশিক সরকার গঠনের জন্য আন্দোলন করেন। এইসব কারণে সম্ভবতঃ তখনকার রাজপুরুষদের মধ্যে তার প্রতিপত্তি বিনষ্ট হয়। ১৮৭১ সালে লর্ড মেয়ো কর্তৃক রাজা উপাধিতে ভূষিত হন। [৬]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Sengupta, Subodh Chandra and Bose, Anjali (editors), (1976/1998), Sansad Bangali Charitabhidhan (Biographical dictionary)(বাংলা), Vol I, p 202, .
  2. Jnananneswan sought to instruct the Hindus in the science of government and jurisprudence. Ref: Sengupta, Nitish. P 283.
  3. Dastider, Shipra (২০১২)। "Mukherji, Raja Dakshinaranjan"Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh 
  4. Acharya, Poromesh, Education in Old Calcutta, in Calcutta, the Living City, Vol I, edited by Sukanta Chaudhuri, pp 85-94, Oxford University Press, .
  5. See Gautam Bhadra, Jal Rajar Galpa: Bardhamaner Pratap Chand, [Calcutta: Ananda Publishers, 2002] [in Bengali]
  6. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬, পৃষ্ঠা ২৮০,২৮১, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬

বহিঃসংযোগসম্পাদনা