প্রধান মেনু খুলুন

তমদ্দুন মজলিস

সাংস্কৃতিক সংগঠন

তমদ্দুন মজলিস ১৯৪৭ সালে আবুল কাসেম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের, (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) একটি ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি তুলে তমদ্দুন মজলিস বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু করে।[১]

তমদ্দুন মজলিস
গঠিত২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭
সদর দপ্তরঅফিস # ১৪১, নিউ সার্কুলার রোড, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ

প্রতিষ্ঠা ও আদর্শগত পটভূমিসম্পাদনা

তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমভারত বিভাগের পরপরই ১৯৪৭ সালের পহেলা সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ঢাকায় তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠা করেন।[২] প্রথমদিকে সংগঠনটি বেশ সক্রিয় ছিল,বাংলা ভাষা আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সংগঠনের সদস্যগণ পূর্ব পাকিস্তান নবজাগরণ সমাজের ধ্যান ধারণা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। দেশবিভাগের পর সংগঠনটি বুঝতে পেরেছিল যে পাকিস্তান সরকার সেই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল না যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। এই কারণে তমদ্দুন মজলিস মুসলিম লীগ থেকে আলাদা হয়ে যায়।

বাংলা ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ততাসম্পাদনা

 
পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা: বাংলায় না উর্দু? -এর প্রচ্ছদ

যদিও তমদ্দুন মজলিসের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের মানুষের ইসলামিক চেতনা শক্তিশালী করা, কিন্তুভাষা আন্দোলনে এই ধর্মভিত্তিক সংগঠনটির সাহসী ভূমিকার জন্য বাংলা ভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি “মোটেও পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি ও কমিউনিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল না।” ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে তমদ্দুন মজলিস একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে যার নাম ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না উর্দু? এই পুস্তিকার লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম (তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক) বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলায় ভাব বিনিময়, অফিস ও আদালতের একমাত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে জোরালো মতামত তুলে ধরেন। তারা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেও জোরালো দাবি জানান। পুস্তিকাটিতে অধ্যাপক আবুল কাসেম কিছুসংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনা তুলে ধরেন যার মূল কথা নিম্নরূপঃ

  1. বাংলা হবেঃ
    1. পূর্ব-পাকিস্তানে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম;
    2. পূর্ব-পাকিস্তানের আদালতের ভাষা; এবং
    3. পূর্ব-পাকিস্তানের দাপ্তরিক ভাষা।
  2. উর্দু এবং বাংলা ভাষা হবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দাপ্তরিক ভাষা।
  3. পূর্ব-পাকিস্তানে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হবে বাংলা ভাষা; যা সব শ্রেণীর মানুষ শিখবে;
    1. উর্দুপূর্ব-পাকিস্তানের দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃ-প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা সেই সমস্ত মানুষকে শেখানো হবে যারা পশ্চিম পাকিস্তানে কাজ করবে। পূর্ব-পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫% থেকে ১০% মানুষ উর্দুশিখলেই যথেষ্ট।মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে উপরের দিকের শ্রেণীতে উর্দুশেখানো যেতে পারে;এবং
    2. ইংরেজি হবে পূর্ব-পাকিস্তানের তৃতীয় অথবা আন্তর্জাতিক ভাষা।
  4. কয়েক বছরের জন্য ইংরেজি ও বাংলা উভয়েই পূর্ব-পাকিস্তানের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার হবে।"[৩]

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদসম্পাদনা

তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালি বিরোধী নীতি এবং বাংলা ভাষা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য এবং সেই সময়কার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান কর্তৃক রচিত পত্রের বিরোধিতার জন্য ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে তমদ্দুন মজলিস প্রথম ‘’রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’’ গঠনে নেতৃত্ব দেয়। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া ‘’রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’’- এর প্রথম প্রধান সমন্বয়ক নির্বাচিত হন, তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাসেম বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য দেশব্যাপী সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি তরুণ প্রজন্ম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্দোলনে যুক্ত করতে সক্ষম হন। এভাবেই প্রথম ‘’রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’’ ১৯৪৭ সালের শেষভাগে এবং ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক শক্তি প্রদান করে।[৪]করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রতিবাদে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘’রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’’-এর আহ্বানে প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই বিক্ষোভ সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যোগদান করেন। এই সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। এই সমাবেশে যোগদান করেন মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রহমান, কল্যাণ দাসগুপ্ত, এ.কে.এম. আহসান এস.আহমেদ এবং ডাকসু-এর তৎকালীন সভাপতি ফরিদ আহমেদ।[৫] বাংলা ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে তমদ্দুন মজলিসের অবস্থান তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করেছিল।[৬]

প্রকাশনা: সাপ্তাহিক সৈনিকসম্পাদনা

বাংলা ভাষা আন্দোলনের একটি মুখপত্র হিসেবে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত তমদ্দুন মজলিস ‘’সাপ্তাহিক সৈনিক’’ নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশ করে।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বসম্পাদনা

এই সংগঠনটির কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হচ্ছেন:

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম : মাতৃভাষাকে ঘিরে যে ফুল বিকষিত, সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা, মার্চ ২৪, ২০০৬।
  2. "History"Tamuddun Majlish। ১১ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০১৫  line feed character in |ওয়েবসাইট= at position 9 (সাহায্য)
  3. উমর, বদরুদ্দীন। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি। মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৭০, পৃঃ ১৪
  4. Manik, Dr. M. Waheeduzzaman. THE MAKING OF THE FORMATIVE PHASES OF THE BENGALI LANGUAGE MOVEMENT IN THE EARLY YEARS OF PAKISTAN. http:// www.globalwebpost.com/bangla/info/articles/manik_dhiren_early_years.htm
  5. উমর, বদরুদ্দিন (১৯৭৯)। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি। ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স। পৃষ্ঠা পৃঃ২০–২১।  line feed character in |শিরোনাম= at position 13 (সাহায্য)
  6. [[বশীর আল হেলাল|আল হেলাল, বশীর]] (২০০৩)। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স। পৃষ্ঠা p133–134। আইএসবিএন 984-401-523-5  line feed character in |লেখক-সংযোগ= at position 5 (সাহায্য)

বহিঃসংযোগসম্পাদনা