বৌদ্ধ তন্ত্র হল ভারতীয় ও তিব্বতি ধর্মগ্রন্থের এক বৈচিত্র্যপূর্ণ গুচ্ছ, যাতে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের স্বতন্ত্র মতবাদ ও ধর্মাচারগুলির কথা উল্লিখিত হয়েছে।

মহাবৈরোচন তন্ত্রে শুভকরসিংহের উপদেশনায় ব্যবহৃত গর্ভধাতু মণ্ডল। কেন্দ্রে বৈরোচনের অবস্থান।

বিবরণসম্পাদনা

বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধর্মগ্রন্থগুলির আবির্ভাব ঘটতে শুরু করেছিল গুপ্তযুগে[১] যদিও তান্ত্রিক ধ্যানধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত উপাদানগুলি অন্ততপক্ষে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী থেকেই নানা গ্রন্থে উল্লিখিত হতে থাকে।[২] অষ্টম শতাব্দীর মধ্যেই উত্তর ভারতে তন্ত্র একটি প্রধান ধর্মীয় ধারায় পরিণত হয়। একাধিক তন্ত্রগ্রন্থ রচিত হয় এবং অসংখ্য তান্ত্রিক পণ্ডিত সেই সকল গ্রন্থের টীকা রচনা করতে শুরু করেন।

জ্ঞাত বৌদ্ধতন্ত্রগুলির মধ্যে যেগুলির রচনাকাল নির্ণয় করা যায়, সেগুলির মধ্যে প্রাচীনতমটি হল সম্ভবত মহাবৈরোচন তন্ত্র। আনুমানিক ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে চীনা তীর্থযাত্রী উ-হিং (無行) কর্তৃক এটি উল্লিখিত ও সংগৃহীত হয়েছিল।[৩]

বৌদ্ধ তন্ত্রের কোনও কোনও উপাদান যোগ উপনিষদ্‌ গ্রন্থাবলির বিষয়বস্তুর অনুরূপ। হিন্দু শৈবপঞ্চরাত্র পরম্পরা, স্থানীয় দেব-দেবী কাল্টসমূহ, যক্ষ বা নাগ পূজা এবং সেই সঙ্গে ইতিপূর্বে বিদ্যমান মহাযান বৌদ্ধ ধ্যানধারণা ও প্রথাগুলি বৌদ্ধ তান্ত্রিক পরম্পরাটিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল।[৪][৫]

অনেক আদি বৌদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থ (যেগুলিকে পরবর্তীকালে "ক্রিয়াতন্ত্র" নামে অভিহিত করা হয়) হল প্রধানত জাগতিক উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত জাদুমন্ত্র ও বাক্যবন্ধের সংকলন। এগুলিকে বলা হত মন্ত্রকল্পক (মন্ত্র সহায়িকা)। এই সকল গ্রন্থে এই গ্রন্থগুলিকে তন্ত্র বলে উল্লেখও করা হয়নি।[৬] অষ্টম শতাব্দী থেকে রচিত পরবর্তীকালীন তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে (যেগুলিকে নানারূপে যোগতন্ত্র, মহাযোগযোগিনী তন্ত্র নামে অভিহিত করা হয়) দেবতা (দেবতাযোগ) বা পবিত্র শব্দের (মন্ত্র) সঙ্গে যোগস্থাপন, সূক্ষ্ম দেহ ধারণের কৌশল ও দ্রুত বুদ্ধত্ব অর্জনের অন্যান্য গোপন পদ্ধতির কথা উল্লিখিত হয়েছে।[৭] কয়েকটি তন্ত্রে সুরা গলাধঃকরণ এবং যৌন আচার-অনুষ্ঠান সহ অন্যান্য নিষিদ্ধ ক্রিয়াকাণ্ডেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।[৮] বৌদ্ধ তন্ত্রশাস্ত্রে প্রাপ্ত কয়েকটি স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু ও ধ্যানধারণার অন্যতম হল দেহের পুনর্মূল্যায়ন এবং মহাসুখ অর্জনের জন্য দেহের ব্যবহার, নারী ও নারী দেবতার ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন এবং নেতিবাচক মানসিক অবস্থার একটি পুনর্মূল্যায়ন। বৌদ্ধতন্ত্রে নেতিবাচক মানসিক অবস্থাকেও মুক্তিলাভের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। হেবজ্রতন্ত্রে আছে, "জগৎ আসক্তির দ্বারা আবদ্ধ এবং আসক্তির দ্বারাই তা মুক্ত হয়।"[৯]

বৌদ্ধ তন্ত্র দ্রুত ভারতের বাইরে তিব্বতনেপালের মতো নিকটবর্তী দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল অষ্টম শতাব্দীতেই। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়াতেওতাং রাজবংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধ তন্ত্র চীনে উপনীত হয়। সেখানে তা পরিচিত ছিল তাংমি নামে। কুকাই (৭৭৪-৮৩৫) এই তন্ত্রকে নিয়ে যান জাপানে। সেখানে তার নাম হয় শিনগোন[১০] নেপাল, মঙ্গোলিয়াতিব্বতে তন্ত্রই প্রধান বৌদ্ধ পরম্পরা হয়ে ওঠে এবং তন্ত্রের ভিত্তিতেই এই অঞ্চলে জন্ম হয় বজ্রযানের

১৫০০ থেকে ২০০০টি ভারতীয় বৌদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থের অস্তিত্ব মূল সংস্কৃত ভাষায় এখনও রয়েছে। এছাড়া ২০০০-এরও বেশি তন্ত্র পাওয়া যায় অনুবাদে (প্রধানত তিব্বতি ও চীনা অনুবাদে)।[১১] তিব্বতি প্রামাণ্য বৌদ্ধশাস্ত্রে কানজুর সংকলনে ৪৫০টি ও তেনগ্যুর সংকলনে ২৪০০টি তন্ত্রগ্রন্থ রয়েছে।[১২]

তিব্বতি বর্গবিন্যাসসম্পাদনা

দুই ঐতিহাসিক কালপর্যায়ে তন্ত্রগ্রন্থগুলি তিব্বতে আনীত হয়েছিল: অষ্টম ও একাদশ শতাব্দীতে।[১৩] প্রাচীন অনুবাদ পরম্পরা (ন্যিংমা) ও পরবর্তীকালীন নব্য অনুবাদ পরম্পরাগুলি তন্ত্রগ্রন্থগুলিকে ভিন্ন ভিন্ন বর্গের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রাচীন অনুবাদ পরম্পরাসম্পাদনা

ন্যিংমা তন্ত্র সংকলনটি ন্যিংমা গ্যুবুম নামে পরিচিত। এটিতে তন্ত্রের ছয়টি বর্গ দেখা যায়:

নব্য অনুবাদ পরম্পরাসম্পাদনা

সরমা বা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের নব্য অনুবাদ পরম্পরাগুলি (গেলুগ, সাক্যকাগ্যু) তন্ত্রগুলিকে চারটি বর্গে ভাগ করে:

বৌদ্ধ তন্ত্র গ্রন্থাবলির তালিকাসম্পাদনা

 
গুহ্যসমাজ (বাঁদিকে), রক্তযমরী (ডানদিকে), একটি ধারণীর (রক্ষাকারী বা শক্তিদায়ী মন্ত্রমালা) পৃষ্ঠা থেকে

অনেক তন্ত্রগ্রন্থের শিরোনামেই "তন্ত্র" শব্দটির পরিবর্তে ধারণী, কল্প, রাজ্ঞী, স্তোত্র, দোহা ও সূত্র প্রভৃতি অভিধা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রধান প্রধান তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে ব্যাখ্যাতন্ত্র (ব্যাখ্যামূলক তন্ত্র), টীকা ও সাধনা সাহিত্যের মতো অপ্রধান সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।[১৪] প্রধান বৌদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে:

তন্ত্র রচয়িতাসম্পাদনা

সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে বৌদ্ধ তন্ত্র অধিকতর পরিমাণে অনুশীলিত হতে শুরু করলে, মূলধারার বৌদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির পণ্ডিতবর্গ সেই ধারাকে গ্রহণ করেন এবং বজ্রযানের আদর্শ অনুসারে সাধনা ও টীকা রচনা শুরু করেন। বিনয়তোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন যে, প্রধান তন্ত্র রচয়িতাদের দু'টি প্রধান কালানুক্রমিক তালিকা রয়েছে। প্রথমটি তারানাথের রচনায় পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয়টি পাওয়া যায় চক্রসম্বর তন্ত্রের কাজি দাওয়াসামদুপ-রচিত ভূমিকাটিতে।[১৫]

তারানাথের তালিকা:

  1. পদ্মবজ্র (আনুমানিক ৬৯৩ খ্রিস্টাব্দ), গুহ্যসিদ্ধি গ্রন্থের রচয়িতা
  2. অনঙ্গবজ্র (আনুমানিক ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ), প্রজ্ঞোপায়বিনিশ্চয়সিদ্ধি গ্রন্থের রচয়িতা
  3. ইন্দ্রভূতি (আনুমানিক ৭১৭ খ্রিস্টাব্দ), জ্ঞানসিদ্ধি গ্রন্থের রচয়িতা
  4. ভগবতী লক্ষ্মী (আনুমানিক ৭২৯ খ্রিস্টাব্দ), অদ্বয়সিদ্ধি গ্রন্থের রচয়িত্রী
  5. লীলাবজ্র (আনুমানিক ৭৪১ খ্রিস্টাব্দ)
  6. দারিকাপা (আনুমানিক ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দ)
  7. সহজযোগিনী (আনুমানিক ৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ)
  8. দোম্বি হেরুক (আনুমানিক ৭৭৭ খ্রিস্টাব্দ)

কাজি দাওয়াসামদুপের তালিকা:

  1. সরহ (নামান্তরে রাহুলভদ্র, আনুমানিক ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ)
  2. নাগার্জুন (পঞ্চকর্ম গ্রন্থের রচয়িতা, আনুমানিক ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ। ইনি মধ্যমক দার্শনিক নাগার্জুন নন)
  3. শবরীপা (আনুমানিক ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দ)
  4. লুইপা (আনুমানিক ৬৬৯ খ্রিস্টাব্দ)
  5. বজ্রঘণ্টা (আনুমানিক ৬৮১ খ্রিস্টাব্দ)
  6. কচ্ছপা (আনুমানিক ৬৯৩ খ্রিস্টাব্দ)
  7. জালন্ধরীপা (আনুমানিক ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ)
  8. কৃষ্ণাচার্য (আনুমানিক ৭১৭ খ্রিস্টাব্দ)
  9. গুহ্য (আনুমানিক ৭২৯ খ্রিস্টাব্দ)
  10. বিজয়পা (আনুমানিক ৭৪১ খ্রিস্টাব্দ)
  11. তিলোপা
  12. নারোপা

অন্যান্য ভারতীয় তান্ত্রিক লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Wayman, Alex; The Buddhist Tantras light on Indo-Tibetan esotericism, Routledge, (2008), page 23.
  2. Williams, Tribe and Wynne; Buddhist Thought: A Complete Introduction to the Indian Tradition, chapter 7
  3. Stephen Hodge, The Mahā-vairocana-abhisaṃbodhi Tantra, with Buddhaguhya’s Commentary (London: RoutledgeCurzon, 2003), 14–15.
  4. Henrik H. Sørensen, Richard K. Payne Edited by Charles D. Orzech General Editor Esoteric Buddhism and the Tantras in East Asia Handbook of Oriental Studies, page 20.
  5. Grey, David B.; Tantra and the Tantric Traditions of Hinduism and Buddhism
  6. Wallis, Christopher; THE TANTRIC AGE: A Comparison Of Shaiva And Buddhist Tantra, February, 2016
  7. “A Crisis of Doxography: How Tibetans Organized Tantra During the 8th-12th Centuries,” Journal of the International Association of Buddhist Studies 28.1 (2005): 115–181.
  8. Williams, Tribe and Wynne; Buddhist Thought: A Complete Introduction to the Indian Tradition, chapter 7
  9. Williams, Tribe and Wynne; Buddhist Thought: A Complete Introduction to the Indian Tradition, chapter 7
  10. Grey, David B.; Tantra and the Tantric Traditions of Hinduism and Buddhism
  11. Isaacson, Harunaga (1998). Tantric Buddhism in India (from c. 800 to c. 1200). In: Buddhismus in Geschichte und Gegenwart. Band II. Hamburg. pp.23–49. (Internal publication of Hamburg University.) pg 3 PDF
  12. Williams, Tribe and Wynne; Buddhist Thought: A Complete Introduction to the Indian Tradition, chapter 7
  13. Grey, David B.; Tantra and the Tantric Traditions of Hinduism and Buddhism
  14. Wayman, Alex; The Buddhist Tantras light on Indo-Tibetan esotericism, Routledge, (2008), page 14.
  15. Bhattacharyya, Benoytosh; An Introduction to Buddhist Esoterism, Motilal Banarsidass Publ., 1980, India, p.
  16. Gray, David B; Compassionate Violence?: On the Ethical Implications of Tantric Buddhist Ritual; Journal of Buddhist Ethics, ISSN 1076-9005, Volume 14, 2007
  17. Tribe, Anthony; Tantric Buddhist Practice in India: Vilāsavajra’s commentary on the Mañjuśrīnāmasamgīti
  18. Gray, David B; Compassionate Violence?: On the Ethical Implications of Tantric Buddhist Ritual; Journal of Buddhist Ethics, ISSN 1076-9005, Volume 14, 2007

বহিঃসংযোগসম্পাদনা