জন্মাষ্টমী বা কৃষ্ণজন্মাষ্টমী (সংস্কৃত: कृष्ण जन्माष्टमी) একটি হিন্দু উৎসব। এটি বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়।[১] এর অপর নাম কৃষ্ণাষ্টমী, গোকুলাষ্টমী, অষ্টমী রোহিণী, শ্রীকৃষ্ণজয়ন্তী ইত্যাদি।[২]

কৃষ্ণজন্মাষ্টমী
Baby Krishna Sleeping Beauty.jpg
জন্মাষ্টমীতে পূজিত কৃষ্ণের বালগোপাল মূর্তি
অন্য নামজন্মাষ্টমী
পালনকারীহিন্দু
ধরনধর্মীয়
উদযাপন২-৮ দিন
পালনউপবাস, পূজা-প্রার্থনা
তারিখভাদ্র কৃষ্ণ পক্ষ অষ্টমী
সম্পর্কিতকৃষ্ণ

হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। উৎসবটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, প্রতি বছর মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য-সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো এক সময়ে পড়ে।[৩] কৃষ্ণের জীবনের নাটকীয় উপস্থাপন রাসলীলা মথুরা, বৃন্দাবন, মণিপুর ইত্যাদি স্থানে এই উৎসবের সাথে করা হয়।[৪] রাস লীলায় কৃষ্ণের ছোট বয়সের কর্ম-কাণ্ড দেখানো হয়, অন্যদিকে, দহি হাণ্ডি প্রথায় কৃষ্ণের দুষ্ট স্বভাব প্রতিফলিত করা হয় যেখানে কয়েকজন শিশু মিলে উচ্চস্থানে বেঁধে রাখা মাখনের হাড়ি ভাঙতে চেষ্টা করে। এই পরম্পরাকে তামিলনাডুতে উরিয়াদি নামে পালন করা হয়। কৃষ্ণের জন্ম হাওয়ায় নন্দের সকলকে উপহার বিতরণের কাহিনী উদ্‌যাপন করতে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর পর বহু স্থানে নন্দোৎসব পালন করা হয়।[৫]

কিংবদন্তীসম্পাদনা

 
কৃষ্ণকে নদী পার করিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য

কৃষ্ণ দেবকী এবং বাসুদেবের অষ্টম সন্তান ছিলেেন। পুরানো পুঁথির বর্ণনা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের গণনা অনুসারে কৃষ্ণের জন্মর তারিখ হল [৬] খ্রীষ্টপূর্ব ৩২২৮ সালের ১৮ জুলাই এবং তাঁর মৃত্যুর দিন খ্রীষ্টপূর্ব ৩১০২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।[৭][৮] কৃষ্ণ মথুরার যাদববংশের বৃষ্ণি গোত্রের মানুষ ছিলেন।[৯]

শ্রীকৃষ্ণের সংক্ষিপ্ত জীবনীসম্পাদনা

শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন দেবকি ও বাসুদেব এর সন্তান এবং হিন্দু ধর্মাম্বলীরা তাঁর জন্মদিন জন্মাষ্টমী হিসেবে পালন করে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় চারিদিকে অরাজকতা, নিপীরন, অত্যাচার চরম পর্যায়ে ছিল। সেই সময় মানুষের স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। সর্বত্র ছিল অশুভ শক্তির বিস্তার।

শ্রীকৃষ্ণের মামা কংস ছিলেন তাঁর জীবনের শত্রু। মথুরাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সাথে সাথে সেই রাতে তাঁর বাবা বাসুদেব তাঁকে যমুনা নদী পার করে গোকুলে পালক মাতা পিতা যশোদা ও নন্দ র কাছে রেখে আসেন।

জন্মাষ্টমী কিভাবে পালন করা হয়সম্পাদনা

হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশেষত বৈষ্ণবদের কাছে জন্মাষ্টমী একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসব নানা ভাবে উদযাপন করা হয়। যেমন - ভগবত পুরাণ অনুযায়ী নৃত্য, নাটক যাকে বলা হয় রাসলীলা বা কৃষ্ণ লীলা, মধ্যরাত্রি তে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের মুহূর্তে ধর্মীয় গীত গাওয়া, উপবাস, দহি হান্ডি প্রভৃতি।

রাসলীলা তে মূলত শ্রীকৃষ্ণের ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা দেখানো হয়। অন্যদিকে দহি হান্ডি প্রথায় অনেক উঁচুতে মাখনের হাড়ি রাখা হয় এবং অনেক ছেলে মিলে মানুষের পিরামিড তৈরি করে সেই হাড়ি ভাঙ্গার চেষ্টা করে। তামিলনাড়ুতে এ প্রথা উড়িয়াদি নামে পরিচিত।

এই দিন মানুষ কৃষ্ণের প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করার জন্য অভুক্ত থাকে, ধর্মীয় গান গায় এবং উপবাস পালন করে। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তিথিতে মধ্যরাতে তার ছোট ছোট মূর্তি কে স্নান করিয়ে কাপড় দিয়ে মোছা হয় এবং দোলনায় সাজানো হয়। তারপর উপাসক মন্ডলী নিজেদের মধ্যে খাদ্য ও মিষ্টান্ন বিনিময় করে উপবাস ভঙ্গ করে। গৃহস্ত মহিলারা বাড়ির বিভিন্ন দরজার বাইরে, রান্নাঘরে শ্রী কৃষ্ণের পদচিহ্ন এঁকে দেন যা শ্রীকৃষ্ণের যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সারা বিশ্বে জন্মাষ্টমী পালনসম্পাদনা

ভারতঃসম্পাদনা

জন্মাষ্টমী ভারতের বড় বড় শহর যেমন মুম্বই, লাতুর, নাগপুর এবং পুনে প্রভৃতি শহরে পালিত হয়। দই হাঁড়ি কৃষ্ণ জন্মাষ্টমীর পরের দিন পালিত হয়। এখানে, লোকেরা "দহি হান্দি" (বাংলায় দই হাঁড়ি) ভাঙে যা এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। এই সময় কিছু স্থানীয়ও  সম্প্রদায় দই বা অন্য দুধভিত্তিক মিষ্টি দ্বারা ভরা মাটির পাত্র এমন উঁচু স্থানে ঝুলিয়ে দেয় যে উচ্চতায় মানুষের পৌঁছানো কঠিন। তারপর একদল মানুষ একজনের কাধে চেপে অন্য জন সেই উচ্চতায় পৌঁছায় এবং ঐ দইের হাঁড়ি ভেঙ্গে উৎসব শেষ করে।

কিংবদন্তি শিশু কৃষ্ণের থেকে এই জনপ্রিয় আঞ্চলিক নামটি উৎসবের রুপ পায়। এটি অনুসারে, তিনি দই এবং মাখন এর মতো দুধজাত পণ্যগুলি অনুসন্ধান এবং চুরি করতেন এবং তাই লোকেরা এই শিশুদের নাগালের বাইরে তাদের সরবরাহগুলি লুকিয়ে রাখত। তবে কৃষ্ণও তাঁর সমস্ত ধরণের সৃজনশীল ধারণাগুলি চেষ্টা করতেন দুধজাত পণ্যগুলি চুরি করার জন্য, যেমন এই উচ্চ ঝুলন্ত হাঁড়িগুলি ভেঙে দেওয়ার জন্য তাঁর বন্ধুদের সাথে মানব পিরামিড তৈরি করা। এই গল্পটি হল নির্দোষ শিশুদের আনন্দময় ভালবাসার প্রতীক, সেই ভালবাসা এবং জীবনের খেলা ঈশ্বরের প্রকাশ।

অন্যদিকে ভারতের উত্তরের রাজ্যসহ পচ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা রাজ্যে এইদিন ঘুড়ি উড়ানো হয়। আবার দক্ষিন অংশে বিশেষকরে আন্ধ্রাপ্রদেশ, তামিলনাড়ু রাজ্যে ছোট ছোট বাচ্চাদের কৃষ্ণ সাজানো হয়।[১০][১১]

নেপাল:সম্পাদনা

নেপালের প্রায় ৮০% জনগোষ্ঠী নিজেকে হিন্দু হিসাবে চিহ্নিত করে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী উদযাপন করে। তারা মধ্যরাত অবধি উপোষ রেখে জন্মাষ্টমী পালন করে। ভক্তরা ভগবদ গীতা আবৃত্তি করেন এবং ভজনকীর্তন নামে ধর্মীয় গান গেয়ে থাকেন। এইদিন কৃষ্ণমন্দিরগুলি সুন্দরভাবে সজ্জিত করা হয়। দোকান, পোস্টার এবং ঘরগুলি কৃষ্ণের মূলভাব বহন করে।

ফিজিঃসম্পাদনা

ফিজিতে কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী হিন্দু ধর্ম পালন করে এবং প্রথম ভারতীয় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক সেখানে নেমে যাওয়ার পর থেকে এইদিন ফিজিতে ছুটি হিসাবে পালিত হয়। ফিজিতে জন্মাষ্টমী “কৃষ্ণ অষ্টমী” নামে পরিচিত। ফিজির বেশিরভাগ হিন্দুদের উত্তর পূর্ব, বিহার এবং তামিলনাড়ু থেকে উদ্ভূত পূর্বপুরুষ রয়েছে, এটি তাদের জন্য এটি একটি বিশেষ উৎসব হিসাবে পরিণত হয়েছে।

ফিজির জন্মাষ্টমী উদযাপনগুলি অনন্য দিক হল এটি আট দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই আট দিনের মধ্যে, হিন্দুরা রাতে তাদের ভক্ত গোষ্ঠীগুলির সাথে বাড়িতে এবং মন্দিরে জড়ো হয় এবং ভাগবত পুরাণ পাঠ করে, কৃষ্ণের জন্য ভক্তিমূলক গান গায় এবং প্রসাদ বিতরণ করে।

বাংলাদেশ:সম্পাদনা

জন্মাষ্টমী বাংলাদেশে জাতীয় ছুটির দিন। জন্মাষ্টমীতে ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে একটি শোভাযাত্রা শুরু হয় এবং পুরান ঢাকার রাস্তাগুলি দিয়ে শেষ হয়।

এছাড়াও গায়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, জ্যামাইকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং আরও অনেক দেশে ক্যারিবীয় হিন্দুরা এই উৎসবটি ব্যাপকভাবে পালন করে। এই দেশগুলিতে প্রচুর হিন্দুদের জন্ম তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পচ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা রাজ্য থেকে আগত অভিবাসীদের থেকে।

আরও দেখুনসম্পাদনা

পাদটীকাসম্পাদনা

  1. "শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী এর ইতিহাস এবং সারা বিশ্বে উদযাপন » Gban'S & You"Gban'S & You (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২০-০৮-১১। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১২ 
  2. "Sri Krishna Janamashtami celebrated in the city"The Hindu। আগস্ট ২৪, ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৮-১২ 
  3. Ashtami Rohini 2011 in Kerala – Sri Krishna Jayanti and Janmashtami
  4. "In Pictures: People Celebrating Janmashtami in India"। সংগ্রহের তারিখ ১০ আগস্ট ২০১২ 
  5. Packert, Cynthia. The Art of Loving Krishna: Ornamentation and Devotion. Indiana University Press, 2010. Print.
  6. Knott, Kim (২০০০)। Hinduism: A Very Short Introduction। Oxford University Press, USA। পৃষ্ঠা 160। আইএসবিএন 0-19-285387-2 
  7. "Information on Lord Krishna Birth and Death Time"। সংগ্রহের তারিখ ২৯ মার্চ ২০১৫ 
  8. Krishna
  9. Pargiter, F.E. (1972) [1922]. Ancient Indian Historical Tradition, Delhi: Motilal Banarsidass, pp.105–107.
  10. "Krishna Janmashtami | History & Celebrations in the world » Gban'S & You"Gban'S & You (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২০-০৮-১০। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১২ 
  11. "শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী এর ইতিহাস এবং সারা বিশ্বে উদযাপন » Gban'S & You"Gban'S & You (ইংরেজি ভাষায়)। ২০২০-০৮-১১। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১২ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা