প্রধান মেনু খুলুন

জগন্ময় মিত্র (জন্ম: ১৯১৮ – মৃত্যু: ২০০৩) ছিলেন বাংলা কাব্য সঙ্গীতের শিল্পী। বাংলা আধুনিক ও নজরুল গীতির পাশাপাশি, ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পা সহ সঙ্গীতের প্রায় সব প্রচলিত ধারায় তার ছিল স্বচ্ছন্দ পদচারনা। অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানের শিল্পী ছিলেন তিনি, তবে ১৯৪৮ সালে রেকর্ড করা “চিঠি – তুমি আজ কত দূরে” গানটি তাকে অমরত্ব এনে দেয়। লক্ষ কোটি শ্রোতা, রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে গানটিকে যেন নিজেরই প্রেমপত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেন। ফলে বাংলা আধুনিক / কাব্য সঙ্গীতের ইতিহাসে এটিই সর্বাধিক শ্রুত ও বিক্রীত একক সঙ্গীত হিসেবে অদ্যাবধি পরিগনিত (এইচ এম ভি’র হিসাবে, ৭৮ আরপিএম রেকর্ড থেকে ক্যাসেট যুগ পর্যন্ত গানটির ২৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে)।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

জগন্ময় মিত্র
জন্ম6 September, ১৯১৮
মৃত্যু4 September, ২০০৩
জাতিসত্তাবাঙালি
নাগরিকত্ব ভারত
পরিচিতির কারণশিল্পী
পুরস্কারPadma Shri

জন্ম ও শিক্ষাজীবনসম্পাদনা

কলকাতার এক সঙ্গীতমনস্ক পরিবারে ১৯১৮ সালে জগন্ময় মিত্রের জন্ম। পরিবারটির জন্য সময়টি ছিল শোকের, কারণ তার মাত্র মাসাধিক কাল আগেই জগন্ময়ের বাবা, যতীন্দ্র নাথ মিত্র, মাত্র ২৫ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। পিতৃহারা, ভাই বোন হীন জগন্ময়, এক শোকাবহ পরিবেশে জীবনযাত্রা শুরু করেন। প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাড়ীতেই, তারপর এন্ট্রান্স পাস করেন ১৯৩৪ সালে। তবে এর মাঝেই শুরু হয় তাঁর সঙ্গীত সাধনা। জগন্ময় মিত্রের পিতামহ বিধুভূষণ মিত্র এবং কাকা পঞ্চানন মিত্র সংগীতের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। কাকা চমত্কার হারমোনিয়াম বাজাতেন, ওস্তাদের কাছে রাগ-রাগিনীর তালিম নিতেন। সেই সময় জগন্ময় মিত্র পাশে বসে তা শুনতেন। ১০ বা ১১ বছর বয়সে তিনি প্রথম কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পা ইত্যাদির তালিম নেন। ১৯৩৮ সালে বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুংরি, রাগ প্রধান বাউল ও কীর্তনের প্রতিটি বিভাগে প্রথম হন। তবে কাব্য সঙ্গীতে তিনি তৃতীয় হয়েছিলেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

সংগীত জীবনসম্পাদনা

১৯৩৮ সালেই জগন্ময় মিত্র এইচএমভিতে গান রেকর্ড করার সুযোগ পান ও সেই সাথে শুরু হয় তাঁর জয়যাত্রা। প্রণব রায়ের কথায় কমল দাসগুপ্তের সুরে ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’ এবং ‘তোমার মতন কত না নয়ন’ গান দুটি তাকে প্রথম খ্যাতি এনে দেয়। এইচএমভিতে-ই ‘যদি বাসনা মনে দিবে দহন জ্বালা’ গানটি জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে শুনে কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়ে খুব তারিফ করেছিলেন। সে থেকেই কাজী দা’র সাথে জগন্ময় মিত্রের আজীবনের হৃদ্যতা শুরু।

অনেক নজরুল গীতি রেকর্ড করার পাশাপাশি, ১৯৪১ এ কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীতও গান জগন্ময় মিত্র।

১৯৪২-এর পুজোর রেকর্ড ‘চিঠি’ গেয়েই গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র। তার সাড়া জাগানো পুজোর আরেকটি রেকর্ড ১৯৪৮-এ প্রকাশিত ‘সাতটি বছর আগে পরে’। রেকর্ড করেন দুটি অসামান্য কাব্য গীতি – ‘সাতটি বছর আগে’ ও ‘সাতটি বছর পরে’। গান দুটি, পরবর্তীকালে গীত ‘চিঠি – তুমি আজ কত দূরে’ গানটির সাথে গড়ে তোলে এক অবিস্মরণীয় মরমী ট্রিলজি। [১]

এরপর ১৯৪০, ১৯৫০ এর দশক জুড়ে ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল’, ‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’, ‘ভুলি নাই ভুলি নাই’, ‘মেনেছি গো হার’, ‘আমি স্বপন দেখেছি’, ‘স্বপন সুরভী মাখা’, ‘গভীর নিশিথে ঘুম’, ‘প্রেমের তাজমহল’, ‘হৃদয় যেন কাহারে চেয়েছিল’, ‘তোমারে তো আজও ভুলি নাই’, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, ‘শাওনও রাতে যদি’ এমন অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গান গেয়ে জগন্ময় মিত্র শ্রোতাদের মনমুকুরে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেন।

সংগীত নির্দেশনাসম্পাদনা

১৯৮৮ সালে কিশোর কুমারের মৃত্যুর পরে ওঁর গাওয়া একটা গান রিলিজ করেছিল জ্যোতি চলচ্চিত্রে । সঙ্গীত নির্দেশক ছিলেন পুণ্যব্রত সেন এবং জগন্ময় মিত্র, জনপ্রিয় ভাবে যাঁদের জুটির নাম ছিল স্বপন-জগমোহন।[২]

মৃত্যুসম্পাদনা

২০০৩ সালে ৮৫ বছর বয়সে জগন্ময় মিত্র কোলকাতায় পরলোকগমন করেন। আর শ্রোতাদের জন্যে রেখে যান মর্মবেদনা ও গাঢ় রোমান্টিকতার এমন এক চিরায়ত ভুবন, যেখানে চিরকালের প্রিয়তম, চিরকালের প্রিয়তমার আশায় চিরকাল তপস্যা করে।

উল্লেখযোগ্য গানসম্পাদনা

  • চিঠি – তুমি আজ কত দূরে (১৯৪৮) – প্রনব রায় / সুবল দাশগুপ্ত
  • সাতটি বছর আগে (১৯৪২) – প্রনব রায় / সুবল দাশগুপ্ত
  • সাতটি বছর পরে (১৯৪২) - প্রনব রায় / সুবল দাশগুপ্ত
  • জানি জানি গো (১৯৪২) – সুবোধ পুরকায়স্থ / কমল দাশগুপ্ত
  • প্রেমের না হবে ক্ষয় (১৯৪১) – শৈলেন রায় / হিমাংশু দত্ত
  • ভুলি নাই ভুলি নাই (১৯৪৪) – মোহিনী চৌধুরী / কমল দাশগুপ্ত
  • তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন (১৯৪৪) - প্রনব রায় / সুবল দাশগুপ্ত
  • আমি স্বপন দেখেছি (১৯৫০) – চারু মুখোপাধ্যায় / জগন্ময় মিত্র
  • ভালবাসা মোরে ভিখারি করেছে (১৯৪৬) – মোহিনী চৌধুরী / কমল দাশগুপ্ত
  • মেনেছি গো হার মেনেছি (১৯৪৩) - সুবোধ পুরকায়স্থ / কমল দাশগুপ্ত
  • প্রিয় যদি নাহি আসে (১৯৪৩) – হরেন ঘটক / গোপেন মল্লিক
  • গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায় (১৯৫১) – কাজী নজরুল ইসলাম / কমল দাশগুপ্ত
  • বাঁশরি কি বাজিবে না (১৯৫৫) - চারু মুখোপাধ্যায় / জগন্ময় মিত্র
  • স্বপন সুরভী মাখা (১৯৫০) - শৈলেন রায় / জগন্ময় মিত্র
  • আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড় (১৯৫৫) - মোহিনী চৌধুরী / কমল দাশগুপ্ত
  • যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল (১৯৫৫) - মোহিনী চৌধুরী / কমল দাশগুপ্ত
  • তোমারে তো আজও ভুলি নাই (১৯৪৩) - প্রনব রায় / কমল দাশগুপ্ত
  • প্রথম প্রদীপ জ্বালো (১৯৪৯) - কাজী নজরুল ইসলাম / কাজী নজরুল ইসলাম
  • জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা (১৯৪৯) - কাজী নজরুল ইসলাম / কাজী নজরুল ইসলাম

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

বহি:সংযোগসম্পাদনা