চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ

চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ (The Channel Islands) ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূল হতে কিছুটা দূরে ইংলিশ চ্যানেলে অবস্থিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। ইংলিশ চ্যানেল আটলান্টিক মহাসাগরের একটি শাখা যা দক্ষিণ ইংল্যান্ডকে উত্তর ফ্রান্স থেকে পৃথক করে। চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ ছাড়াও ইংলিশ চ্যানেলে অবস্থিত বেশ কিছু দ্বীপ ফ্রান্সের অন্তর্ভুক্ত, যেমন- ব্রেহাট, আইল দে ব্যাট্‌জ, চ্যাউসি, আইল্‌স সেইন্ট মার্কুফ ইত্যাদি।

গ্রেট বৃটেনের তিনটি 'ক্রাউন ডিপেন্ডেন্সি' দ্বীপের মধ্যে দু'টিই চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত। 'বেইলিউইক অফ জার্সি' এই ক্রাউন ডিপেন্ডেন্সি দ্বীপের মধ্যে একটি। চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের সকল দ্বীপ মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ১৭৪,৪২৯ জন। এখানকার সব দ্বীপ ইংল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত নয় যদিও এদের নিরাপত্তা ও বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের সকল দায়িত্ব ইংল্যান্ড পালন করে। এর ক্রাউন ডিপেন্ডেন্সি দ্বিপগুলোও 'কমনওয়েল্‌থ অফ ন্যাশন' বা 'ইউরোপিয়ান ইউনিয়িন'-এর সদস্য নয়। চ্যানেল দ্বিপপুঞ্জে দু'টি বেইলিউইক অর্থাৎ 'বেলিফ বা বেইলি' আইনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বিদ্যমান। এ বেইলিউইকগুলোর ১৩ শতক থেকে নিজস্ব সরকার রয়েছে। 'বেইলিউইক অফ গার্নজেই বা গার্ন্‌জি(The Bailiwick of Guernsey)' মোট তিনটি এলাকায় বিভক্ত- গার্ন্‌জি, অ্যাল্ডার্নি ও সার্ক। অবশ্য বেইলিউইক অফ জার্সি এবং বেইলিউইক অফ গার্ন্‌জি একই বেইলিউইক এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

খুব সম্ভবত রয়্যাল নেভি বা ইংল্যান্ডের প্রধান নৌবাহিনীর সদস্যরা প্রথম চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ নামটি ব্যবহার করা শুরু করেন ১৮৩০ সালে এবং তাদের থেকেই এই নামটি প্রচলিত হয়েছে। এই নামটি শুধুমাত্র ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমের উপকূল 'কোটেন্টটিন পেনিনসুলা(Cotentin Peninsula)'-তে অবস্থিত দ্বীপমালাকে নির্দেশ করে। যেমন, আইল অফ ওয়াইট ইংলিশ চ্যানেলে অবস্থিত হওইয়া সত্ত্বেও এটি চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্ভুক্ত নয়।

চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ ইংলিশ চ্যানেলের অন্যতম দ্বীপপুঞ্জ। এর সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য সমুদ্রপ্রেমিক ও ভ্রমণকারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এখানকার ইতিহাসও প্রাচীন এবং বৈচিত্রময়। এর দ্বীপগুলোকে 'ডাচি অফ নরম্যান্ডি' নামক একটি ঐতিহাসিক শাসনামলের অবশিষ্টাংশ বলে ধারণা করা হয়। একারণে ইউরোপের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গার মধ্যে চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জকেও একটি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

ইতিহাসসম্পাদনা

প্রাগৈতিহাসিক যুগসম্পাদনা

চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জে মানুষের প্রথম আগমন ঘটে প্রায় আড়াইশো বছর আগে, সে সময় এ দ্বীপপুঞ্জটি ইউরোপ মহাদেশের প্রধান ভূমির সাথে যুক্ত ছিল। পাথর যুগ(Stone Age)-এর পরবর্তী যুগ নিওলিথিক বা প্রাক-প্রস্তর যুগে এই এলাকার সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং বেশ কিছু অঞ্চল প্রধান ভূমী থেকে আলাদা হয়ে যায়, যাদের বর্তমানে একত্রে চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ বলা হয়। এই দ্বীপগুলোর শিলাস্তর বা ভূ-গর্ভস্থ পাথরের প্লেটগুলোর কারণে এগুলো এখনো টিকে আছে এবং বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার পাশাপাশি বিভিন্ন বড় বড় স্থাপনাও এ দ্বীপগুলোতে বিদ্যমান, যেমন, জার্সির 'লা হোগ বি বা La Hougue Bie' নামক সমাধিকেন্দ্র , 'মেনহার্স মূর্তি বা the statue menhirs ' ইত্যাদি।

লৌহযুগ থেকেসম্পাদনা

প্রাচীনকালে পশ্চিম ইউরোপের একটি বড় এলাকাকে 'গল(gaul)' নামে অভিহিত করা হতো, যার একটি অংশের নাম ছিল 'আরমোরিকা'। চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর পরিমাণে আরমোরিকান মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে যা এখানে লৌহযুগের ব্যাবসা ও যোগাযোগের প্রমাণ বহন করে। সে তুলনায় চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জে রোমান উপনিবেশের প্রমাণ অত্যন্ত বিরল, যদিও এখানে রোমান কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের রোমান নাম ছিল 'আই.লেনুরি বা লেনুর দ্বীপপুঞ্জ' এবং প্রাচীন রোমান ম্যাপ 'Tabula Peutingeriana বা পিউটিঙ্গার টেবিল'-এও এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দ্বীপপুঞ্জগুলোর ল্যাটিন নাম এসেছে আরেকটি জনপ্রিয় রোমান প্রাচীন ম্যাপ থেকে যার নাম ছিল 'অ্যান্টোনাইন আইটিন্যারি (Antonine Itinerary) বা অ্যান্টোনাইন ভ্রমণপথ'। গলে রোমান সাম্রাজ্যের সময় যে রোমান সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তাকে বলা 'গ্যালো-রোমান' সংস্কৃতি এবং চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জে এই সংস্কৃতির উপস্থিতি ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এখানে খিষ্টান ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটেছিল। স্যামসন অফ ডল, হেলার, ম্যারকাল্ফ‌ এবং ম্যাগলয়ের এই ধর্মপ্রচারকদের মাঝে ছিলেন অন্যতম। একজন বিশপের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কোন জেলাকে বলা হয় ডায়োসিস। আর রোমান খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের বলা হয় রোমান ক্যাথোলিক। ফ্রান্সের ক্যুটান্সেস নগরীতে নির্মিত রোমান ক্যাথলিকদের একটি ডায়সিসের নাম ছিল 'রোমান ক্যাথোলিক ডায়োসিস অফ ক্যুট্যান্সেস'। চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জগুলো এই ডায়সিসের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ১৬ শতকে রোমান ক্যাথোলিক চার্চগুলোর অপব্যবহারের জন্য ইউরোপে এদের বিরোধী আন্দোলন (আন্দোলনটিকে 'রিফর্মেশন' বলে অভিহিত করা হয়) সংঘটিত হলে দ্বীপপুঞ্জগুলো ডায়োসিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রাক-রোমান যুগে ইউরোপ এবং এশিয়ায় বসবাসকারী একটি জাতির নাম ছিল কেল্ট। এই কেল্ট জাতির মানুষ বা কেল্টিকদের অনেক ধরনের মাঝে একটি ইউরোপিয়ান ধরন ছিল যারা গ্রেট বৃটেনে লৌহযুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত বিরাজ করেছিল এবং এদের নাম ছিল 'কেল্টিক ব্রিটন'। ইংল্যান্ডে বসবাসকারী আরেকটি জাতি অ্যানজিও-স্যাক্সন এবং এদের আক্রমণ করার লক্ষ্যে কেল্টিক ব্রিটনদের চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জতে আগমন ঘটে ৫ম এবং ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে। কিন্তু তাদের সংখ্যা যথেষ্ট না থাকায় চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ জার্মান সম্প্রদায় 'ফ্রাঙ্ক'-দের রাজা দ্বারা শাসিত হতে থাকে এবং এদের চার্চ আবার 'রোমান ক্যাথোলিক ডায়োসিস অফ ক্যুট্যান্সেস' এর অন্তর্ভুক্ত হয়।

৮ম থেকে ১১ শতক পর্যন্ত দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নর্স জাতির জলদস্যুরা ইউরপের নানা অংশে প্রভাব বিস্তার করে। নর্সরা মূলত ভাইকিংস ছিল এবং এদের একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের নাম ছিল 'ভাইকিং এক্সপ্যানশন' যার মাধ্যমে এদের দস্যুতা, অন্যায়, অপহরণ এবং লুটতরাজ বিশ্বব্যাপী বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ম শতাব্দীর শুরুর দিকে চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে এদের আক্রমন ঘটে এবং এ সময়ের পর থেকেই এখানকার অনেক এলাকার নামকরণ নর্সদের ভাষানুসারে করা হয়েছিল এবং বর্তমানে এ নামগুলোতেই দ্বীপগুলো অভিহিত করা হয়।

ডাচি অফ নরম্যান্ডিসম্পাদনা

নরম্যান্ডি ফ্রান্সের একটি প্রদেশের নাম। আর ডাচি(Duchy) বলতে ডাচদের দ্বারা শাসিত রাজ্যকে বোঝানো হয়। ডাচি অফ নরম্যান্ডি দ্বারা মূলত নরম্যান্ডিতে ডাচদের শাসনকে অভিহিত করা হয়। ফ্রান্সের পশ্চিম ফ্রান্সিয়া প্রদেশের রাজা চার্লস তৃতীয়ের আমলে(৮৯৮-৯২২) ডাচি অফ নরম্যান্ডি গঠিত হয়। এর মূল দলিলের নাম ছিল 'ট্রিটি অফ সেইন্ট-ক্লেয়ার-সুর-এপ্তে (Treaty of Saint-Clair-sur-Epte)' এবং এ দলিল অনুযায়ী নর্স জাতির একজন সেনাপতি ও ভাইকিং রোলোকে নরম্যান্ডির প্রথম নৃপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই ডাচিটির অধিবাসীদের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়-'নরম্যান্স'।

৯৩৩ সালে, পশ্চিম ফ্রান্সিয়ার তৎকালীন রাজা রাউল, চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জকে নরম্যান্ডির ২য় শাসক 'উইলিয়াম ১ম লংসোর্ড'-এর হাতে অর্পণ করেন এবং একে ডাচি অফ নরম্যান্ডির অন্তর্ভুক্ত করেন। ১০৬৬ সালে নরম্যান্ডির 'উইলিয়াম ২য়' ইংল্যান্ডকে আক্রমণ করে শাসন করতে শুরু করেন, ফলে তিনি ইংল্যান্ডের 'উইলিয়াম ১ম'-এ পরিণত হন। ১২ থেকে ১৩ শতকের শুরু পর্যন্ত ইংল্যান্ডের শাসনকারী একটি ফরাসি রাজবংশীয় প্রতিষ্ঠান ছিল অ্যানগেভিন। ১২০৪-১২১৪ সালের সময়ে ইংল্যান্ডের রাজা 'জন' ফ্রান্সের আরেক রাজা 'ফিলিপ ২য়'-এর কাছে উত্তর ফ্রান্সের অ্যানগেভিনদের যে অঞ্চলগুলো ছিল সেগুলোসহ নরম্যান্ডির রাজত্ব হারিয়ে ফেললেও চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জকে সে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তার উত্তরাধিকারী ইংল্যান্ডের 'হেনরি ৩য়', ফ্রান্সের 'লুইস ৯ম' এর সাথে করা আনুষ্ঠানিক চুক্তি 'ট্রিটি অফ প্যারিস'-এর মাধ্যমে 'হেনরি ৩য়' ডাচি অফ নরম্যান্ডির উপর থেকে নিজের দাবি এবং পাশাপাশি ফ্রান্সের রাজা যিনি তৎকালীন নরম্যান্ডির নৃপতি ছিলেন, চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের উপর থেকে তার দাবি তুলে নেন। এরপর থেকেই চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ স্ব-শাসিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল এবং ইংল্যান্ডের কোন রাজ্য, গ্রেট বৃটেন বা যুক্তরাজ্য দ্বারা শোষিত হয় নি।