চুম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ্যা

পারমাণবিক ইলেকট্রনের কোয়ান্টাম দশা নির্ণয়ে ব্যবহৃত চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যার মধ্যে তৃতীয়; কোন উপস্তরের অরবিটালগুলোর পার্থক্য নিরূপণ করে; ত্রিমাত্রিক স্থানে অরবিটালের দিকবিন্যাস নির্ণয়ের জন্য অ্যাজিমুথাল কোয়ান্টাম সংখ্যার মান গণনায় ব্যবহৃত হয়

চৌম্বক বা চুম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ্যা (magnetic quantum number, ) হচ্ছে পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় ব্যবহৃত চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যার একটি। এই চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যা হচ্ছে: মুখ্য কোয়ান্টাম সংখ্যা, অ্যাজিমুথাল কোয়ান্টাম সংখ্যা, চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা, এবং ঘূর্ণন কোয়ান্টাম সংখ্যা। এই চারটি সংখ্যা একত্রে মিলে কোন ইলেকট্রনের অনন্য কোয়ান্টাম দশা নির্দেশ করে। কোন পরমাণুর চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা এর উপশক্তিস্তরের অভ্যন্তরে বিদ্যমান কক্ষক/অরবিটালগুলোর (orbitals) মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে, এবং অরবিটালের ত্রিমাত্রিক দিকবিন্যাসের অ্যাজিমুথাল উপাংশ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়। কোন নির্দিষ্ট উপশক্তিস্তরের (যেমন- অথবা ) ইলেকট্রনগুলো -এর মান (০, ১, ২ অথবা ৩) দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়ে থাকে। এর মান শূন্যসহ (০) থেকে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এজন্য উপস্তরগুলোর প্রত্যেকে যথাক্রমে ১, ৩, ৫ এবং ৭টি করে অরবিটাল ধারণ করে, যেখানে এর মান যথাক্রমে এর মধ্যে থাকে। এই অরবিটালগুলোর প্রত্যেকে সর্বোচ্চ দুইটি করে ইলেকট্রন (বিপরীত ঘূর্ণনবিশিষ্ট) ধারণ করতে পারে, যা পর্যায় সারণী গঠনের মূল ভিত্তি।

প্রতিপাদনসম্পাদনা

 
এই অরবিটালগুলোর চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যার মান, বাম থেকে ডান দিকে মানের উর্ধ্বক্রমানুসারে যথাক্রমে   । অ্যাজিমুথাল উপাংশের ওপর   এর নির্ভরশীলতা বর্ণ অবক্রম (color gradient) হিসেবে দেখা যায়, যা উল্লম্ব অক্ষের সাপেক্ষে  -সংখ্যক বার পুনরাবৃত্ত হয়।

কোন পরমাণুর শক্তির দশার সাথে চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যা সংশ্লিষ্ট থাকে। চারটি কোয়ান্টাম সংখ্যা  [সন্দেহপূর্ণ ] দ্বারা কোন একটি ইলেকট্রনের সম্পূর্ণ এবং অনন্য কোয়ান্টাম দশাকে বলা হয় এর তরঙ্গ ফাংশন বা অরবিটাল। একটি ইলেকট্রনবিশিষ্ট কোন পরমাণুর তরঙ্গ ফাংশনের শ্রোডিঙ্গার সমীকরণ হচ্ছে একটি পৃথকযোগ্য (seperable) আংশিক ব্যবকলনীয় সমীকরণ (হিলিয়াম অণু অথবা অন্যান্য অণু যেখানে ইলেকট্রনসমূহের মধ্যে পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া বিদ্যমান, সেখানে এটা প্রযোজ্য নয়; সেক্ষেত্রে আরও পরিশীলিত সমাধান পদ্ধতি আবশ্যক[১])। এর মানে হলো, গোলকাকার স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় প্রকাশিত তরঙ্গ ফাংশনকে ( ) বিশ্লেষণ করে ব্যাসার্ধ ( ), অক্ষকোটি বা পোলার কোণ (colatitude or polar angle;  ), এবং অ্যাজিমুথ (azimuth;  ) এর তিনটি ফাংশনের গুণফল আকারে প্রকাশ করা যায়।[২]

 

  এর জন্য যে ব্যবকলনীয় সমীকরণ তা   আকারে নিয়ে সমাধান করা যায়। কারণ, অ্যাজিমুথ কোণ   এর যেসব মানের পার্থক্য   রেডিয়ান (৩৬০ ডিগ্রি) এর সমান, সেগুলো ত্রিমাত্রিক স্থানে একই অবস্থান নির্দেশ করে, এবং   এর যথেচ্ছ বড় কোন মানের জন্য   এর সার্বিক মান বৃদ্ধি পায় না, যেমনটা বাস্তব সূচকের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।   সহগের মান অবশ্যই   এর কোয়ান্টায়িত পূর্ণ-সাংখ্যিক গুণিতক হতে হবে, যাতে করে কাল্পনিক সূচক   পাওয়া যায়।[৩] এই পূর্ণ সংখ্যাগুলো হচ্ছে চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা। পোলার কোণের সমীকরণেও একই ধ্রুবক পাওয়া যায়, যেখানে   এর বৃহত্তর মানসমূহের জন্য   এর মান হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আর   এর যেসব মান অ্যাজিমুথাল কোয়ান্টাম সংখ্যা,   এর মানের চেয়ে বৃহত্তর হয়, সেগুলোর জন্য   এর কোন সমাধান অনুমোদিতে নয়।

কোয়ান্টাম সংখ্যাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক
অরবিটাল মানসমূহ   এর মানের সংখ্যা[৪] প্রতি উপস্তরে

সর্বোচ্চ ইলেকট্রন সংখ্যা

   
s        
p        
d        
f        
g        

কৌণিক ভরবেগ এর উপাংশ হিসেবেসম্পাদনা

 
কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় কাক্ষিক কৌণিক ভরবেগের (orbital angular momentum) চিত্র। কোণ ও সমতলগুলো দ্বারা   এবং   হলে, কৌণিক ভরবেগ ভেক্টরের সম্ভাব্য সকল দিকবিন্যাস নির্দেশ করা হয়েছে। এমনকি   এর প্রান্তীয় মানের ক্ষেত্রেও,  -উপাংশের মান ভেক্টরের সার্বিক মানের তুলনায় ক্ষুদ্রতর হয়।

পোলার স্থানাংকের জন্য ব্যবহৃত অক্ষটি যথেচ্ছভাবে নির্বাচন করা হয়। চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা   দ্বারা, এই ইচ্ছামত-নির্বাচিত দিক বরাবর কৌণিক ভরবেগের অভিক্ষেপ নির্দেশ করে, প্রচলিত নিয়মে যাকে  -অক্ষ বা কোয়ান্টায়ন অক্ষ,   হিসেবে অভিহিত করা হয়।  -অক্ষ বরাবর কৌণিক ভরবেগের মান নিচের সূত্র থেকে নির্ণয় করা যায়:[৪]

 

এটি পরমাণুর ইলেকট্রনের মোট কাক্ষিক কৌণিক ভরবেগ (orbital angular momentum),   এর একটি উপাংশ, যার মান ইলেকট্রন উপস্তরের অ্যাজিমুথাল কোয়ান্টাম সংখ্যা,   এর সাথে নিম্নোক্ত সমীকরণের মাধ্যমে সম্পর্কিত:

  ;

যেখানে,   লঘুকৃত প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক। এখানে লক্ষ্যণীয় যে,   হলে  , এবং   এর উচ্চ মানের জন্য   এর আসন্ন মান   ধরে নেওয়া যায়। তিনটি অক্ষ বরাবর যুগপৎভাবে ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগের মান নির্ণয় করা অসম্ভব নয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম প্রদর্শন করেন অটো স্টার্ন (Otto Stern) এবং ওয়াল্টার গের্লাখ (Walther Gerlach), তাদের স্টার্ন-গের্লাখ পরীক্ষা'র মাধ্যমে।[৫]

যে কোন তরঙ্গের কম্পাঙ্ককে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক দ্বারা গুণ করলে, ঐ তরঙ্গের শক্তি পাওয়া যায়। এই তরঙ্গ কণা-সদৃশ শক্তির প্যাকেট প্রদর্শন করে, যা কোয়ান্টা নামে পরিচিত। প্রত্যেক কোয়ান্টাম দশার জন্য কোয়ান্টাম সংখ্যা নির্ণয়ে ব্যবহৃত সূত্রে লঘুকৃত প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক ব্যবহার করা হয়, যা কেবল সুনির্দিষ্ট বা বিচ্ছিন্ন বা কোয়ান্টায়িত শক্তিস্তরসমূহকে অনুমোদন করে।[৪]

চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর প্রভাবসম্পাদনা

চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা  , শিথিলভাবে, কৌণিক ভরবেগ ভেক্টরের দিকে নির্দেশ করে। চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা  , কেবল তখনই কোন ইলেক্ট্রনের শক্তিকে প্রভাবিত করে যদি তা কোন চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থান করে। কারণ চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে,   এর ভিন্ন ভিন্ন ইচ্ছাধীন মানের জন্য প্রাপ্ত অনুষঙ্গী গোলকাকার উপাংশগুলো (spherical harmonics) সমতুল্য হয়। বহিঃস্থ কোন চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে কোন পারমাণবিক অরবিটালের শক্তির পরিবর্তন নির্দেশ করে চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা (জেমান প্রভাব) — এজন্যই এর নাম দেওয়া হয়েছে চৌম্বক কোয়ান্টাম সংখ্যা। তবে, কোন পারমাণবিক অরবিটালে অবস্থিত ইলেক্ট্রনের প্রকৃত চৌম্বক দ্বিপোল ভ্রামক যে শুধু ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ হতে আসে তা নয়, বরং ইলেকট্রনের ঘূর্ণন থেকেও আসে, যা ঘূর্ণন কোয়ান্টাম সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

যেহেতু কোন চৌম্বকক্ষেত্রে প্রতিটি ইলেকট্রনেরই একটি চৌম্বক ভ্রামক থাকে, সেহেতু এরা একটি টর্ক সৃষ্টি করে, যা   ভেক্টরকে চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে সমান্তরালে স্থাপন করতে চেষ্টা করে। এই ঘটনা "Larmor precession" নামে পরিচিত।

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Helium atom"। ২০১০-০৭-২০। 
  2. "Hydrogen Schrodinger Equation"hyperphysics.phy-astr.gsu.edu 
  3. "Hydrogen Schrodinger Equation"hyperphysics.phy-astr.gsu.edu 
  4. Herzberg, Gerhard (১৯৫০)। Molecular Spectra and Molecular Structure (২য় সংস্করণ)। D van Nostrand Company। পৃষ্ঠা ১৭–১৮। 
  5. "Spectroscopy: angular momentum quantum number"। Encyclopædia Britannica।