চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রধান মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের প্রধান বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা।[১] তিনি একাধারে মেট্রোপলিটন এলাকার ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রধান, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির কর্ণধার এবং জাস্টিস অব পিস বা শান্তি রক্ষাকারী বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[২][৩][৪][৫]

চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট
বাংলাদেশ সরকারের সীল
সম্বোধনরীতিবিজ্ঞ, মাননীয়
সংক্ষেপেসিএমএম
এর সদস্যবাংলাদেশের বিচার বিভাগ
যার কাছে জবাবদিহি করেবাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয়
আসনচিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
নিয়োগকর্তাবাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি
মেয়াদকাল৩ বছর
গঠনের দলিলবাংলাদেশের সংবিধান
গঠন১৯৭৬
ডেপুটিঅতিরিক্ত ‌চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০(১) ধারা অনুযায়ী তার এখতিয়ারাধীন অঞ্চলে সংঘটিত যেকোনও অপরাধ আমলে নিতে পারেন। তিনি তার অধিক্ষেত্রের মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ দমন করার জন্য যেকোনও আদেশ দিতে পারেন।[৬] মহানগরের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সর্বত্র শান্তি রক্ষা করা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের।[৭] তিনি পদাধিকার বলে মাসিক পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সের সভাপতি যাতে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারজেলা প্রশাসক সদস্য। বাংলাদেশের পদমর্যাদা ক্রম অনুযায়ী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের পদমর্যাদা সচিব এর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত কর্মকর্তাদের সমান।[৮]

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে আমলী আদালতের অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করেন এবং তার নির্দেশে এক বা একাধিক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতের দায়িত্ব পালন করেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটগণ মেট্রোপলিটন এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মহানগর দায়রা জজ এর অধীনস্থ। তিনি ক্রিমিনাল রুলস এন্ড অর্ডারস, ২০০৯ এর ৮৫(৩) বিধি অনুযায়ী মাসে একবার তার অধিক্ষেত্রের সমস্ত থানা পরিদর্শন করেন।[৯]

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারার বিধান মোতাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে জাস্টিস অব পিস বা শান্তি রক্ষাকারী বিচারপতি হিসেবে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার নিমিত্তে ত্বরিত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য দায়িত্ব ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তিনি মহানগর এলাকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা এবং মহানগরের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মহানগর দায়রা জজের পরই তার অবস্থান। বাংলাদেশের পদমর্যাদা ক্রমে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের অবস্থান ১৭ নম্বরে।[১০] পুলিশ তদন্ত সহ আইনের প্রয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যকলাপের বিবরণ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক নির্ধারিত আমলী আদালতের অধিক্ষেত্রের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দাখিল করে। মেট্রোপলিটন পুলিশ[১১] আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধের তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যকলাপের জন্য চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট জবাবদিহি করেন।[১২]

ইতিহাস ও উৎপত্তি

সম্পাদনা

২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পূর্বে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাগণ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ১৯৭৬ সালে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ সংশোধন পূর্বক মেট্রোপলিটন এলাকায় জেলা প্রশাসকের সকল প্রকার বিচারিক ক্ষমতা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে অর্পণ করা হয়।[১৩][১৪] বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর জুডিশিয়াল সার্ভিসের বিচারকগণ চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।[১৫]

এখতিয়ার ও ক্ষমতা

সম্পাদনা

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করতে পারেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ২৯(গ) ধারায় বলা হয়েছে, সরকার হাইকোর্ট বিভাগের সাথে পরামর্শক্রমে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অথবা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে মৃত্যুদন্ড ছাড়া সকল অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা অর্পণ করতে পারবে। ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৩(ক) ধারায় উল্লেখ আছে যে, ২৯(গ) ধারা ক্ষমতাবলে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ৭ বছরের অধিক কারাদণ্ড ব্যতীত আইনে অনুমোদিত যেকোনও কারাদণ্ড প্রদান করতে পারবেন।[১৬][১৭]

অপরাধ আমলে গ্রহণ

সম্পাদনা

মেট্রোপলিটন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমল যোগ্য অপরাধের সংবাদ পেলে তাকে এজাহার হিসেবে রেকর্ড করেন। আমল অযোগ্য অপরাধ হলে সেটার জন্য সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয় এবং চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের দ্বারা নির্ধারিত একজন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট অনুমতি দিলে পুলিশ তদন্ত করতে পারে। অন্যদিকে, আদালতে কেউ সরাসরি অভিযোগ নিয়ে আসলে এবং সেটা গুরুতর প্রকৃতির হলে সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(৩) ধারা অনুযায়ী এজাহার হিসেবে রুজু করার জন্য থানার অফিসার ইনচার্জকে নির্দেশ দিতে পারেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারা অনুসারে অভিযোগকারীকে পরীক্ষা করে অপরাধ আমলে নিতে পারেন বা ২০২ ধারা মোতাবেক পুলিশ বা অন্য যে কাউকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। রিপোর্ট প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট ধারায় অপরাধ আমলে নিতে পারেন।

রিমান্ড

সম্পাদনা

বাংলাদেশের সংবিধান এর ৩৩(২) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারা অনুযায়ী পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের সময় হতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে জেলার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক নির্ধারিত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে উপস্থাপন করবে।[১৮] সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট গুরুতর বা সূত্রবিহীন (Clueless) অপরাধের ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনো আসামীকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(১) ধারা মোতাবেক ১৫ দিন পর্যন্ত পুলিশ রিমান্ডের আদেশ দিতে পারেন।

নিয়োগ

সম্পাদনা

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের[১৯] ১১৫ ও ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নিয়োগ দিয়ে থাকেন। আইন মন্ত্রণালয়[২০][২১] সুপ্রীম কোর্টের[২২] সাথে পরামর্শক্রমে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজদের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পদায়ন ও বদলি করে থাকে।

জাস্টিস অব পিস

সম্পাদনা

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারার বিধান মোতাবেক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে জাস্টিস অব পিস বা শান্তি রক্ষাকারী বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পদমর্যাদা

সম্পাদনা

২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এর আপীল বিভাগ ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স বা বাংলাদেশের পদমর্যাদা ক্রম মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে যাতে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে ১৭ নম্বর ক্রমিকে রাখা হয়।[২৩] উল্লেখ্য, মেট্রোপলিটন এলাকার উল্লেখযোগ্য শীর্ষ কর্মকর্তাগণের মধ্যে মহানগর দায়রা জজের পদক্রম ১৬, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজের পদক্রম ১৭, বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট/যুগ্ম মহানগর দায়রা জজের পদক্রম ২১, পুলিশ কমিশনারের পদক্রম ২২ এবং জেলা প্রশাসকের পদক্রম ২৪।[২৪][২৫][২৬]

আরও দেখুন

সম্পাদনা

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. "Legal system of Bangladesh"। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুন ২০১৬ 
  2. "বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত" 
  3. "বিচার বিভাগ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে" 
  4. "ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮" 
  5. "বাংলাদেশের আদালতসমূহ"। ২০১৫-০৯-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৭-০৭ 
  6. "জেলা আদালত"। ১৬ জুন ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২২ 
  7. "বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা" 
  8. "জেলা জজের পদমর্যাদা সচিব ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পদমর্যাদা সচিব মর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের সমান" 
  9. "ক্রিমিনাল রুলস এন্ড অর্ডারস, ২০০৯" [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  10. "দশ পদের পদমর্যাদা পরিবর্তন" 
  11. "মেট্রোপলিটন পুলিশ"। Archived from the original on ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২২ 
  12. "বিচার বিভাগ" 
  13. "বিচার বিভাগকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে সরকার" 
  14. "বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ" 
  15. "সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে" 
  16. "দন্ডবিধি, ১৮৬০" 
  17. "বিচার বিভাগীয় বাতায়ন"। ২৩ মে ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মে ২০২২ 
  18. "গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান" 
  19. "বাংলাদেশের সংবিধানে বিচার বিভাগ" 
  20. "আইন ও বিচার বিভাগ" 
  21. "শেখ হাসিনা বিচার বিভাগকে আপন করে নিয়েছেন" 
  22. "২৩তম প্রধান বিচারপতি হলেন হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী" 
  23. "পদমর্যাদার ক্রম মামলায় সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ"। ১৫ মে ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মে ২০২২ 
  24. "জেলা ও দায়রা জজের পদমর্যাদা এখন ৮ ধাপ ওপরে" 
  25. "জেলা ও দায়রা জজের পদমর্যাদা ১৬ তে উন্নীত" 
  26. "Supreme Court releases full verdict on Warrant of Precedence"