কৃষ্ণপুর গণহত্যা

কৃষ্ণপুর গণহত্যা বা কৃষ্ণপুর হত্যাকাণ্ড ১৯৭১ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের সিলেট জেলার কৃষ্ণপুর এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে সংগঠিত হয়। কৃষ্ণপুরে, পাকিস্তানি দখলদারি সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে ১২৭ জন বাঙ্গালী হিন্দুদের হত্যা করে।[১] পার্শ্ববর্তী গ্রামে একশোরও অধিক হিন্দু হত্যা করা হয়।

কৃষ্ণপুর গণহত্যা
কৃষ্ণপুর গণহত্যা বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
কৃষ্ণপুর গণহত্যা
স্থানকৃষ্ণপুর, সিলেট, বাংলাদেশ
তারিখ১৮ই সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ (ইউটিসি+৬:০০)
লক্ষ্যবাঙ্গালী হিন্দু
হামলার ধরনগণহত্যা
ব্যবহৃত অস্ত্ররাইফেল
নিহত১২৭
হামলাকারী দলপাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার

পটভূমিসম্পাদনা

কৃষ্ণপুর গ্রামটি বলভদ্রা নদীর পাশে সিলেট জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল।[২] বর্তমানে গ্রামটি হবিগঞ্জ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে একদম শেষমাথায় লাখাই উপজেলার অধীনে পড়েছে। লাখাই থানা থেকে কৃষ্ণপুর গ্রামের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে।[৩] গ্রামের দক্ষিণ দিকে বলভদ্রা নদী বয়ে গেছে যা হবিগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক করেছে।[৩] কৃষ্ণপুর এবং পার্শ্ববর্তী চণ্ডীপুর গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছয়মাস, কৃষ্ণপুর গ্রামের লোকেরা সাধারণভাবে জীবনযাপন করেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হওয়ার আশংকায়, গ্রামটি প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়াতে অনেক হিন্দু শরণার্থী হিসেবে কৃষ্ণপুর গ্রামে আশ্রয় নেয়। যদিও পাকিস্তানি দখলদারি সেনাবাহিনী হবিগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং লাখাই পর্যন্ত এসে পৌঁছে যায়, তবে তারা কৃষ্ণপুরের দিকে অগ্রসর হয়নি। ১৯৭১ সালের আগস্টে, পাকিস্তানি দখলদারি সেনাবাহিনী বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত এলাকা পর্যন্ত হিন্দুদের উপর গণহত্যাসহ কতিপয় যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়। যাইহোক, সেপ্টেম্বর মাস থেকে, পাকহানাদারদের নৃশংসতা কিছুটা হ্রাস পায়। ১৬ সেপ্টেম্বর, কৃষ্ণপুর গ্রাম থেকে একদল লোক লাখাই গিয়েছিল, অষ্টগ্রাম হতে কিছু নৌকা দ্বারা তাদের ধরা হয়।[২]

হত্যাকাণ্ডসম্পাদনা

১৬ সেপ্টেম্বর, রাজাকাররা গভীর রাতে দেশীয় নৌকা নিয়ে গ্রামটিতে এসে পোঁছে এবং সারা গ্রাম বেষ্টন করে ফেলে। ১৮ই সেপ্টেম্বর খুব ভোরে, ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে হবে, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ক্যাম্প হতে পাকিস্তানি সৈন্যের একটি দল কৃষ্ণপুর গ্রামে আসে।[৪] পাকহানাদাররা দুটি স্পীডবোটে করে দুটি দলে আসে। গ্রামে ঢুকে একটি দল নৌকা থেকে নেমে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। অন্য দলটি তখন গ্রাম এবং নৌকা পাহারা দিতে থাকে। ঐসময়ে, গ্রামে ঢুকে রাজাকাররাও গুলি চালাতে থাকে এবং গ্রামে লুটপাট শুরু করে। তারা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে বন্দুকের মাথা টিকিয়ে গ্রামবাসীদের নগদ টাকাপয়সা এবং স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। রাজাকারদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে, পাকিস্তানি সৈন্যরা সারা গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। অতঃপর তারা ১৩০ জন ব্যক্তিকে কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে চক্রাকারে দাঁড় করায়। লোকগুলোকে একটি সারিতে দাঁড় করিয়ে বার্স্ট ফায়ার করে হত্যা করা হয়। প্রমোদ রায়, নবদ্বীপ রায় এবং হরিদাস রায় বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়ে বেঁচে যায়। তারা সারা জীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে।

চণ্ডীপুরে মাত্র ১৬ টি পরিবারের বাস ছিল। গ্রামের সকল বাসিন্দাদের একই লাইনে দাঁড় করিয়ে বার্স্ট ফায়ার করা হয়। ৪৫জন হিন্দু এতে মারা যায়। এই গণহত্যায় মাত্র দুজন ব্যক্তি বেঁচে যায়।[৪] লালচাঁদপুর এলাকায়, মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে ৪০জন হিন্দুকে বেষ্টন করে রাখা হয়। তাদের সবকিছু লুটপাটের পর, তাদেরকে একই লাইনে দাঁড় করিয়ে বার্স্ট ফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। গোকুলনগরেও একই কায়দায় হিন্দুদের হত্যা করা হয়।[৪]

অনুসন্ধানসম্পাদনা

২০১০ সালের ৪টা মার্চ, বেঁচে যাওয়া হরিদাস রায় হবিগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে লিয়াকত আলী এবং অন্যান্য রাজাকারদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।[৫] লিয়াকত আলী হবিগঞ্জ জেলার, লাখাই উপজেলার মরাকারি গ্রামের বাসিন্দা এবং লাখাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। মামলা করার পরপরই, রাজাকারদের কাছ থেকে রায় হত্যার হুমকি পেতে থাকেন। ৭ই জুন ২০১০, তিনি থানা একটি জেনারেল ডায়রি বা জিডি করে আসেন। ১২ই আগস্ট ২০১০, কৃষ্ণপুর গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধের প্রথম মামলা হিসেবে সিলেট বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দ্বারা গৃহীত হয়।[৪] হবিগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার মোহাম্মদ আলী পাঠানের মতে, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের একটি দল গণহত্যার স্থানটি পরিদর্শন করে যায়।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি" জানার আছে বাকিKaler Kantho (Bengali ভাষায়)। Dhaka। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১০। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩ 
  2. গণহত্যা দিবস আজ কৃষ্ণপুরে মহালয়ায় মহাপ্রলয়sangbadsamoy24.com (Bengali ভাষায়)। Dhaka। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ [অকার্যকর সংযোগ]
  3. Mohammad, Tajul (ফেব্রুয়ারি ২০০৫) [1989]। সিলেটে গণহত্যা [Genocide in Sylhet] (Revised 2nd সংস্করণ)। Dhaka: Sahitya Prakash। পৃষ্ঠা 199–200। আইএসবিএন 984-465-416-5 
  4. Dulal, Zia uddin (১৮ সেপ্টেম্বর ২০১২)। "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি" কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস ১৮ সেপ্টেম্বরbanglanews24.com (Bengali ভাষায়)। Dhaka। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  5. "War crime case filed against Habiganj AL leader"bdnews24.com। ৪ মার্চ ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩