কুমায়ূনী ভাষা

কুমায়ূনী ভাষা (कुमाऊँनी) ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবারের অন্তর্গত একটি উত্তরা ইন্দো-আর্য বা পাহাড়ী ভাষাগুলি একটি৷ একুশ লক্ষ জনের ভাষা এই কুমায়ূনীর সাথে পার্শ্ববর্তী গাড়োয়ালী ভাষার প্রভূত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়৷ ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের এই ভাষা দুটি একত্রে কেন্দ্রীয় পাহাড়ী ভাষাগোষ্ঠী গঠন করে৷

কুমায়ূনী
कुमाऊँनी
(কুমাঊঁনী)
Kumaoni written in kumaoni language2019.png
দেবনাগরী লিপিতে লেখা কুমাঊঁনী (বা কুমায়ূনী)
দেশোদ্ভবভারত
অঞ্চলকুমায়ূন, উত্তরাখণ্ড
জাতিতত্ত্বকুমায়ূনি জাতি
মাতৃভাষী
২১ লক্ষ (২০১১ ভারতের জনগণনা)[১]
দেবনাগরী লিপি
শারদা লিপি (ঐতিহাসিক)
টাকরী লিপি (ঐতিহাসিক)
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩kfy
গ্লোটোলগkuma1273[২]

কুমায়ূনী বিপন্ন ভাষার তালিকার অন্তর্ভুক্ত না হলেও ইউনেস্কোর আটলাস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড'স ল্যাঙ্গুয়েজ ইন ডেঞ্জার-এর তথ্য অনুসারে এটি একটি অসুরক্ষিত ভাষা, কঠোরভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজন।[৩] মোটামুটি ভাবে যারা কুমায়ূনী ভাষা বলেন, বোঝেন এবং প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার করেন তারা একই রকমভাবে হিন্দিও বুঝতে সক্ষম।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ভাষাটি বর্তমানে বৃহত্তর হিন্দি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

লিপিসম্পাদনা

বর্তমানে কুমায়ুন ভাষা লেখার জন্য সরকারিভাবে মান্যতা প্রাপ্ত দেবনাগরী লিপির ব্যবহার হলেও ঐতিহাসিকভাবে অন্যান্য পাহাড়ী ভাষাগুলির মত এই ভাষাটি টাকরী লিপিতে লেখা হতো। পরবর্তীকালে দেবনাগরী লিপি উক্ত লিপির একাধিক রকমফেরকে প্রতি স্থাপিত করে।

 
রাজা বাজ বাহাদুর এর চিত্র এবং চিত্রের উপরে বামদিকে টাকরি লিপিতে লেখার নিদর্শন

এতদ্ব্যতীত অতি সাম্প্রতিককালে কুমায়ূনের তালেশ্বর মন্দির থেকে পাওয়া গিয়েছে টাকরী লিপির জনক গুপ্ত লিপিতে খোদিত কিছু নিদর্শন, যা তালেশ্বর তাম্রলেখদ্বয় নামেও পরিচিত।

 
আনুমানিক ৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে কুমায়ূনী ভাষায় দেবনাগরী লিপিতে খোদিত একটি পুরাতন তাম্রলেখ

কত্যুরী ও চাঁদ রাজবংশের রাজাদের রাজত্বকালের কুমায়ূনী ভাষায় লিখিত নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে একাধিক মন্দিরে।[৪][৫] কুমায়ূনী ভাষা ছিল পূর্বতন কুমায়ূন রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

ভৌগোলিক বিস্তার ও উপভাষাসম্পাদনা

কুমায়ূন অঞ্চলে একাধিক উপভাষা রয়েছে। কুমায়ূনী ভাষার উপভাষাগুলিকে একে অপরের থেকে পৃথক করার বিশেষ কোনো যুক্তিসম্মত প্রক্রিয়া নেই। সর্বাধিক ব্যক্তি বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় বা কালি কুমায়ূনী উপভাষাটি আলমোড়া জেলা এবং নৈনিতাল জেলার উত্তরাংশে কথিত। উত্তর-পূর্ব কুমায়ূনী বলা হয় পিথোরাগড় অঞ্চলে। নৈনিতাল জেলার দক্ষিণ পূর্ব দিকের কথিত উপভাষাটি দক্ষিণ-পূর্ব কুমায়ূনী। পশ্চিমা কুমায়ূনীবলা হয় আলমোড়া এবং নৈনিতাল জেলার পশ্চিম দিকে।

সবিস্তারে:[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

নেপালের সুদূর পশ্চিম প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে কুমায়ূনী ভাষীরা বসবাস করেন।[৭]

জেলা অনুযায়ী পরিসংখ্যানসম্পাদনা

ব্যাকরণসম্পাদনা

ইন্দো আর্য ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে কুমায়ূনীর সাথে অন্যান্য ইন্দো আর্য ভাষা যথা হিন্দি, গাড়োয়ালী, কাশ্মীরি, পশ্চিমা পাহাড়ী এবং নেপালি ভাষার মিল পাওয়া যায়৷ কেন্দ্রীয় পাহাড়ী গাড়োয়ালী ভাষা ও পূর্ব পাহাড়ী (মতান্তরে কেন্দ্রীয়) ডোটেলী ভাষা ও পশ্চিমা পাহাড়ী জৌনসারী ভাষার সাথে বিশেষ সাদৃশ্য পাওয়া যায়৷

বাহ্লিক ভাষী খশ জাতি ছিলো পার্বত্য অঞ্চলে আগত প্রথম জাতি৷ পরবর্তীকালে তাদের ভাষা অবলুপ্ত হয়ে পড়লেও তারই প্রভাবে পাহাড়ী ভাষাগুলির ব্যাকরণ মোটামুটিভাবে একই৷ কুমায়ূনী ভাষায় ক্রিয়াপদের স্বতন্ত্র রূপ একটি মূল ক্রিয়ার থেকে বিবর্তিত হয়ে আসে যা কাশ্মীরি ভাষার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। কুমায়ূনীতে কর্তার লিঙ্গ অনুসারে পরিবর্তিত হয়৷

ভাষার সাদৃশ্য
  খশকুরা কুমায়ূনী কাশ্মীরি
  পুং স্ত্রী পুং স্ত্রী পুং স্ত্রী
আছি ছু ছু ছিক ছু থুস ছেস
আছো ছাস ছেস ছৈ ছি ছুখ ছেখ
আছে ছা ছে ছি ছুহ্ ছেহ্

ক্রিয়া ধাতুরূপসম্পাদনা

"লেখ" ক্রিয়ার কাল, বচন ও পুরুষভেদে ক্রিয়ার ধাতুরূপ বদল৷

বর্তমান কালসম্পাদনা

  • একবচন
কুমায়ূনী প্রতিবর্ণী বাংলা
मैं लेखनू মৈঁ লেখনু আমি লিখি
तू लेख छे তু লেখ ছে তুমি লেখো
उ लिखनो উ লেখনো সে লেখে
  • বহুবচন
কুমায়ূনী প্রতিবর্ণী ইংরাজী
हम लेखनु হম লেখনু আমরা লিখি
तुम लेख छो তুম লেখ ছো তোমরা লেখো
ऊँ लेखन छन ঊঁ লেখন ছন তারা লেখে

অতীত কালসম্পাদনা

  • একবচন
কুমায়ূনী প্রতিবর্ণী ইংরাজী
मेल लिखौ মেল লিখৌ আমি লিখেছিলাম
त्वील लिखौ ত্বীল লিখৌ তুমি লিখেছিলে
वील लिखौ বীল লিখৌ সে লিখেছিলো
  • বহুবচন
কুমায়ূনী প্রতিবর্ণী ইংরাজী
हमुल लेखौ হমুল লেখো আমরা লিখেছিলাম
तुमुल लेखौ তুমুল লেখো তোমরা লিখেছিলে
उनुले लेखौ উনুলে লেখো তারা লিখেছিলো

ভবিষ্যত কালসম্পাদনা

  • একবচন
কুমায়ূনী প্রতিবর্ণী ইংরাজী
मैं लिखूंलो মৈঁ লিখুঁলো আমি লিখবো
तू लेखले তু লেখলে তুমি লিখবে
उ लेखल উ লেখল সে লিখবে
  • বহুবচন
কুমায়ূনী প্রতিবর্ণী ইংরাজী
हम लेखुंला হম লেখুঁলা আমরা লিখব
तुम लेखला তুম লেখলা তোমরা লিখবে
ऊँ लेखल ঊঁ লেখল তারা লিখবে

সরকারী পদমর্যাদাসম্পাদনা

ভারতের মর্যাদাপ্রাপ্ত ভাষাগুলির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে কুমায়ূনী ও গাড়োয়ালী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলভুক্ত করার জন্য বহু দিন দাবী প্রকাশ করা হচ্ছে৷ ২০১০ খ্রিস্টাব্দে একটি বেসরকারী সদস্য বিল উপস্থাপন করা হয় লোকসভায় গাড়োয়ালী ও কুমায়ূনী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করার কথা আলোচনার জন্য রাজ্য লোকসভায় সোচ্চার হওয়ার জন্য৷[৮][৯]

জনজাতির কথ্য ভাষা সংরক্ষণ ও জন সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে উত্তরাখণ্ড রাজ্য সরকার কুমায়ূন বিভাগে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে কূমায়ূনী ভাষার বই প্রকাশিত করেন৷[১০]

কলাকৌশলসম্পাদনা

চলচ্চিত্রসম্পাদনা

  • মেঘ আ, (প্রথম কুমায়ূনী চলচ্চিত্র),[১১] পরিচালক কাকা শর্মা, প্রযোজক এস.এস বিষ্ট, ১৯৮৭[১২]
  • তেরি সৌঁ, (প্রথম কুমায়ূনী ও গাড়োয়ালী উভয়ভাষার চলচ্চিত্র),[১৩] লেখক, প্রযোজক ও পরিচালক অনুজ যোশী,[১৪] ২০০৩৷

বেতারসম্পাদনা

  • ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে আকাশবাণী লক্ষ্ণৌ থেকে "উত্তরায়ন" নামে একটি নতুন অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়৷ এটি ছিলো মূলত রাজ্যের চিনা সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের জন্য৷
  • স্থানীয় জনজাতিগুলির অন্নয়নের স্বার্থে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ১১ই মার্চ একটি কমিউনিটি রেডিও সার্ভিস শুরু হয়, যা ছিলো "কুমায়ূনবাণী"৷ উত্তরাখণ্ডের গভর্নর মার্গারেট আলভা প্রথম রাজ্যে সম্প্রদায় ভিত্তিক বেতার স্টেশন শুরু করেন৷ কুমায়ূনবাণীর প্রাথমিক বিষয় ছিলো আবহাওয়া, কৃষিকাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার প্রসার৷ রেডিও স্টেশনটি মুক্তেশ্বর|মুক্তেশ্বরের ২০০০ জনসাধারণের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে৷[১৫]
  • উত্তরাখণ্ডের লোকগীতি প্রচারের লক্ষ্যে ও বিশ্বের কাছে হিমালয়ের ভাষাগুলি পৌঁছে দিতে কুমায়ূন, গাড়োয়াল ও জৌনসার ইন্টারনেট রেডিও শুরু হয়৷ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত এক উত্তরাখণ্ডী এই চ্যানেলটি শুরু করার পর অধিক জনপ্রিয়তার কারণে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে এটির বিটা ভার্সনও শুরু হয়৷ পরে এটি হিমালয়ের চিরাচরিত সুর বেদুপাকো বরমসা ও নারাইন কাফল পাকো চৈত - নামে নামাঙ্কিত৷[১৬]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. টেমপ্লেট:E21
  2. হ্যামারস্ট্রোম, হারাল্ড; ফোরকেল, রবার্ট; হাস্পেলম্যাথ, মার্টিন, সম্পাদকগণ (২০১৭)। "Kumaoni"গ্লোটোলগ ৩.০ (ইংরেজি ভাষায়)। জেনা, জার্মানি: মানব ইতিহাস বিজ্ঞানের জন্য ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট। 
  3. "UNESCO Interactive Atlas of the World's Languages in Danger"UNESCO। সংগ্রহের তারিখ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ 
  4. Śarmā, Devīdatta (১৯৮৩)। Linguistic History of Uttarākhaṇḍa (ইংরেজি ভাষায়)। Vishveshvaranand Vedic Research Institute। 
  5. Miśra, Nityānanda (১৯৯৪)। Source Materials of Kumauni History (ইংরেজি ভাষায়)। Shree Almora Book Depot। আইএসবিএন 978-81-85865-24-9 
  6. "Uttaranchal Dialects and Languages - Uttarakhand Worldwide - Kumaoni and Garhwali - Kumaon and Garhwal Dialects"। Uttaranchal.org.uk। ৫ মার্চ ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ জুলাই ২০১২ 
  7. Eichentopf, Stephanie R. (২০১৪)। A Sociolinguistic Study of Dotyali (প্রতিবেদন)। Tribhuvan University and SIL International। পৃষ্ঠা 14। 
  8. "Members want inclusion of Kumaoni, Garhwali in 8th schedule"। ২০১২-০৩-২৭। ২০১২-০৩-২৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০১-১১ 
  9. Saxena, Shivani (২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "Postcards demand official language status for Kumaoni, Garhwali"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০২-১২ 
  10. "CM releases Kumaoni books for school students - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০১-১১ 
  11. Kumaoni Cinema ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ তারিখে Pahari Shabdkosh.
  12. First Kumaoni Film[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ] Bollywood Sargam.
  13. The Times of India Teri Saun, 10 May 2003.
  14. Film set in 1994 Uttarakhand Movement ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে Nandadevi Campaign.
  15. "Teri launches Kumaon Vani community radio service"। One India। সংগ্রহের তারিখ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ 
  16. Dr. Shailesh Upreti (২৩ ফেব্রু ২০১১)। "First e Radio of Uttarakhand"official। bedupako। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুন ২০০৮