কংসাবতী নদী

ভূমিকা

কংসাবতী বা কাঁসাই দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান নদী। কালিদাসের মেঘদূত ও অন্যান্য সংস্কৃত সাহিত্যগ্রন্থে এই নদী কপিশা নামে উল্লিখিত। কিংবদন্তী অনুসারে, সমুদ্রের কাছে বাগদত্তা কংসাবতী কৃষ্ণ দামোদর নদের রূপে আলিঙ্গন করতে ছুটে এলে কংসাবতী দ্রুত ধাবমান হয়ে সমুদ্রে মিলিত হয়। মেদিনীপুর শহর এই নদীর তীরে অবস্থিত।[১]

কংসাবতী নদী (কাঁসাই নদী)
মেদিনীপুর শহরের কাছে কংসাবতী নদী
মেদিনীপুর শহরের কাছে কংসাবতী নদী
দেশ ভারত
রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ
অঞ্চল মেদিনীপুর বিভাগ
জেলা পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর
নগর মেদিনীপুর
উৎস ঝালদা পাহাড়
 - অবস্থান ঝালদা, পুরুলিয়া জেলা, ছোটনাগপুরের মালভূমি, পশ্চিমবঙ্গ
মোহনা হলদি নদী

প্রবাহপথসম্পাদনা

পুরুলিয়া জেলার ঝালদা অঞ্চলে প্রায় ৬০০ মিটার উঁচু পাহাড় ঝাবরবন কাঁসাই নালার আকারে কংসাবতী নদীর উৎপত্তি। নিকটবর্তী অযোধ্যা পাহাড় থেকে সাহারঝোরা নামে একটি ছোট নালা এরপর বেগুনকুদারের কাছে কংসাবতীতে মিশেছে। তেলদিহি গ্রামের কাছে বান্দু বা বন্ধু নদী কংসাবতীতে পড়েছে।

এরপর কংসাবতী পুরুলিয়া-চান্ডিল রেললাইন পেরিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে কিছুদূরে কারমারা নামার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ভেদুয়া গ্রাম পার হয়ে এই নদী বাঁকুড়া জেলায় প্রবেশ করেছে। বাঁকুড়াতেই কংসাবতীর প্রধান উপনদী কুমারী নদীর সঙ্গে এর মিলন। মুকুটমণিপুরে কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থলে বিখ্যাত কংসাবতী বাঁধ ও জলাধারটি গড়ে উঠেছে।

বাঁধ ছেড়ে বেরিয়ে রায়পুরের পাশ দিয়ে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে মেদিনীপুর জেলার বিনপুর অঞ্চলে প্রবেশ করেছে কংসাবতী। ভৈরববাঁকী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে এরপর পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় প্রবেশ করেছে এই নদী। কেশপুরের কাছে নদী দুটি শাখায় ভাগ হয়ে গেছে। একটি শাখা দাশপুর অঞ্চলের উপর দিয়ে পালারপাই নামে প্রবাহিত হয়ে রূপনারায়ণ নদের দিকে এগিয়ে গেছে ও অপর শাখাটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে কালিয়াঘাই বা কেলেঘাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

উপনদীসম্পাদনা

  • সাহারঝোরা – অযোধ্যা পাহাড় থেকে সাহারঝোরার উৎপত্তি। মুরগুমায় এই নদীটির উপর একটি জলাধার নির্মিত হয়েছে মূল সেচকার্যের সুবিধার জন্য। তারপরে বেগুনকুদার কাছে এটি কংসাবতীতে মিশেছে।
  • বান্দু – বান্দু বা বন্ধু নদী সারামবিসি, বুরুডি প্রভৃতি কয়েকটি নালার সঙ্গে মিশে সিরকাবাদের কাছে অযোধ্যা পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। তারপর ২৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তেলডিহি গ্রামের কাছে কংসাবতীতে পড়েছে।
  • কুমারী নদী – কুমারী কংসাবতীর প্রধান উপনদী। এটির উৎপত্তিস্থলও অযোধ্যা পাহাড়। পাহাড়ের পূর্ব ঢাল বেয়ে নেমে আসার সময় কয়েকটি ছোটখাট নালার সঙ্গে মিলিত হয়েছে কুমারী। তারপর দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে পুরুলিয়া-চান্ডিল রেললাইন পেরিয়ে বরাভূম ও মানবাজার ছুঁয়ে এটি বাঁকুড়ায় প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে যে চারটি উপনদী কুমারী নদীতে মিশেছে, তারা হল – হনুমাতা ও নাঙ্গাসাই (ডানদিকের উপনদী) এবং ঝোর ও চাকা (বাঁদিকের উপনদী)। অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের টোটকা নদী বান্দোয়ান পেরিয়ে মাঝিডিহির কাছে কুমারী নদীতে মিলিত হয়েছে। মুকুটমণিপুরে ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমারী নদী কংসাবতীতে পতিত হয়েছে।
  • ভৈরববাঁকী – ভৈরববাঁকী বাঁকুড়া জেলার রানিবাঁধে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে কংসাবতীতে মিলিত হয়েছে। এর প্রধান উপনদী তারাফেনী।

কংসাবতী জলাধারসম্পাদনা

খাতড়ার বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলাদ্বয়ের সীমান্তবর্তী এলাকায় কংসাবতী ও কুমারী নদীর সংগমস্থলের উপর কংসাবতী বাঁধ ও জলাধার নির্মিত হয়েছে। ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কালে সেচের সুবিধার জন্য এই বাঁধ ও জলাধার নির্মিত হয়। বাঁধটির দৈর্ঘ্য ১০,০৯৮ মিটার ও উচ্চতা ৩৮ মিটার। জলাধারের আয়তন ৮৬ বর্গ কিলোমিটার। এই জলাধার ঘিরে মুকুটমণিপুরে একটি মনোরম পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।[২]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপকুমার (২০০৭)। বাংলার নদনদী। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং। [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. "Irrigation & Waterways Dept – Irrigation Sector – Major Irrigation Projects – Kangasbati"। ২৭ আগস্ট ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২২ মে ২০০৮