কংগ্রেস রেডিও বা কংগ্রেস বেতার (ইংরেজি: Congress Radio) হল স্বাধীনতা সংগ্রামী ডঃ রামমনোহর লোহিয়ার পরিকল্পনায় এক কংগ্রেসের সর্বক্ষণের মহিলাকর্মী ঊষা মেহতার (২৫ মার্চ,১৯২০ – ১১ আগস্ট,২০০০) উদ্যোগে গঠিত এক অসামরিক গোপন বেতারকেন্দ্র। এটি 'কংগ্রেস রেডিও' নামে পরিচিত ছিল।

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ৯ই আগস্ট মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বৃটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধী সহ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার করতে শুরু করলে দেশজুড়ে সে আন্দোলন ভয়ংকর চেহারা নেয়। স্বতঃস্ফূর্ত সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কয়েক হাজার প্রতিবাদী প্রাণ হারান আর ভারত রক্ষা আইনে আটক হন প্রায় আঠারো হাজার রাজনৈতিক কর্মী। এমতাবস্থায় কংগ্রেসের সর্বক্ষণের মহিলাকর্মী ঊষা মেহতা প্রয়োজন বোধ করলেন দেশবিরোধী প্রচার চালানো আর নেতা ও সাধারণ কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য এক গোপন বেতার মাধ্যমের। তিনি কয়েকজন সহযোগীদের সহায়তায় এবং রামমনোহর লোহিয়া ভিটলদাস খক্কর, বাবু ভাই টক্কর, চন্দ্রকান্ত জাভেরি প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বদান্যতায় তৈরি করেন সিক্রেট কংগ্রেস রেডিও। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরুর ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই তৎকালীন বোম্বাই বর্তমানের মুম্বইয়ের কোন এক গোপন আস্তানা হতে ১৪ই আগস্ট বেতার সম্প্রচারে ভেসে এল সেই মহিলার কণ্ঠস্বর- " This is Congress Radio calling on ( a wavelength of ) 42.34 meters from somewhere in India...." অর্থাৎ 'আমি ভারতের কোন এক জায়গা থেকে ৪২.৩৪ মিটার বেতার তরঙ্গে চালিত কংগ্রেস রেডিও থেকে বলছি...'

এই বেতার মাধ্যমে আন্দোলনের কাজ অনেক সহজ হল। ইংরেজ পুলিশের কাছে যেগুলি নিষিদ্ধ খবর সেগুলি বিনা বাধায় জনতার কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছিল। বিপ্লবী আন্দোলন আরো জোরদার সম্ভব হয়েছিল। দেশের অন্যান্য প্রদেশের নেতা দের সাথে যোগাযোগ রেখে নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ চলত সন্তর্পণে। আর পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য প্রায় রোজই প্রচার কেন্দ্রের জায়গা বদল হত। কিন্তু এক ভারতীয় টেকনিশিয়ানের বিশ্বাসঘাতকতায় এর সন্ধান পেয়ে যায় পুলিশ। ১২ই নভেম্বর বেতারকেন্দ্রের প্রধান ঊষা মেহতা সহ সকলেই গ্রেফতার হন। ছয় মাস ধরে জেরার মধ্যে বহু প্রলোভনে তিনি নির্বাক ছিলেন। ফলে কারাবাস ভোগ করেন চার বৎসর। [১]

এ ছিল বোম্বাই তথা মুম্বইয়ের ঘটনা। বিয়াল্লিশের ঠিক ওই সময়ে রামমনোহর লোহিয়া (২৩ শে মার্চ,১৯১০ - ১২ অক্টোবর,১৯৬৭) উদ্যোগে কংগ্রেস সমাজতান্ত্রিক দলের পক্ষে কলকাতাতেও গোপন বেতারকেন্দ্র খোলা হয়েছিল। তার চারজন পরিচালক ছিলেন। তাঁরা হলেন - উদয়ন চট্টোপাধ্যায়, তাঁর অনুজ সংবরণ চট্টোপাধ্যায়, মোহন সিং স্যাণ্ডার ও দিলীপকুমার বিশ্বাস। কলকাতার (নিষিদ্ধ) প্রথম বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি অনুষ্ঠান ৪১.৬৮ মিটার ব্যান্ড-এ,শর্ট ওয়েভ-এ পরিচালনা করতেন দিলীপকুমার বিশ্বাস৷ হিন্দিতে বলতেন মোহন সিং স্যাণ্ডার৷ এটা ছিল রামমোহন লোহিয়ার পরিকল্পনা৷ রাত নটা থেকে শুরু হত অনুষ্ঠান - This is a Congress Radio Calling from somewhere in India. Hallo everybody! Here is the news – এই কথাগুলিই বলেই খবর পড়তেন উদয়ন চট্টোপাধ্যায়,সঙ্গে থাকতেন উদয়নের অনুজ সংবরণ, দিলীপকুমার বিশ্বাস পড়তেন কথিকা,আর সে খবর শোনা যেত উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। এমন কি আবহাওয়া অনুকূল থাকলে সুদূর বর্মাতেও সে সম্প্রচার শোনা যেত। স্যাবোটাজ-এর খবর থাকত, ব্রিটিশদের অত্যাচারের খবর থাকত৷ প্রথম দিকে নটা থেকে নটা পনেরো,এবং পরে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় অনেকক্ষণ চলত সে অনুষ্ঠান৷ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে এক একদিন এক এক জায়গা থেকে সম্প্রচার হত৷ সেসময় Anti-Piracy Detection Van তখন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত৷ বেশীর ভাগই ভাড়া বাড়ি থেকে,পরিত্যক্ত জায়গা থেকে তাঁরা বেতার সম্প্রচার করতেন৷ একদিন যখন বরানগরে জাপানী বোমাবর্ষণ হয়, তাঁরা একটানা তিন ঘণ্টা হোসপাইপের মধ্যে শুয়ে কাটান৷ উদয়ন চট্টোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে, যদিও এই বেতার সম্প্রচারের অস্তিত্ব পুলিশ ঘুণাক্ষরেও তাঁর কাছ থেকে জানতে পারেনি৷ দিলীপকুমার বিশ্বাস ধরা পড়েননি কখনও, কিন্তু পুলিশ সন্দেহ করে তাঁকে শেষের দিকে যখন দেশের স্বাধীনতা প্রায় দোরগোড়ায়৷ [২]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. তপন মালিক। ""আগস্ট আন্দোলনে ঊষা মেহতার গোপন বেতার কেন্দ্র, কী বার্তা ছিল কংগ্রেসের""। সংগ্রহের তারিখ ২০ আগস্ট ২০২০ 
  2. দেবব্রত চক্রবর্তী। "ঐতিহাসিক দিলীপকুমার বিশ্বাস:শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি"। সংগ্রহের তারিখ ২০ আগস্ট ২০২০