উইকিপিডিয়া আলোচনা:নিবন্ধ সৃষ্টিকরণ/subir mondal

সক্রিয় আলোচনা

সুবীর মণ্ডল ও তাঁর সাহিত্যের নিবিড় পাঠ সুবোধ মণ্ডল (গবেষক, রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড়)



সুবীর মণ্ডলের জীবনঃ ১৯৬৭ সালের ৩০ আগষ্ট সুন্দরবনের অখ্যাত সাতজেলিয়া দ্বীপের পরশমনি গ্রামে জন্ম। সুন্দরবনের ছোট্ট দত্ত নদীর কূলে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। গ্রামে পড়াশোনার পর ১৯৮৮ সালে ক্যানিং ট্যাংরাখালি কলেজ থেকে সাম্মানিক বাংলা বিষয়ে গ্রাজুয়েট, ১৯৯০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করেন। ১৯৯৪ সালে দমদম এয়ারপোর্টের কাছে কমলাপুর কমলা বিদ্যাপীঠে শিক্ষক পদে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। সুবীর মণ্ডল ২০০৯ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা লিপির উপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। এবং ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের প্রতিভাধর তরুণ কবি সুবীর মণ্ডল বড় অকালে চির না ফেরার দেশে চলে যান।

সাহিত্য চর্চাঃ

    সুবীর মণ্ডল কবিতাপাগল মানুষ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি নিয়মিত কবিতাচর্চা করতেন। যে পরিবেশ থেকে তাঁর উঠে আসা, তাতে কবিতা আর সুবীর মণ্ডল এক সঙ্গে উচ্চারিত হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রত্যন্ত সুন্দরবনের যে অঞ্চলের মানুষের সাহিত্যচর্চা তো দূরের কথা, শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সামান্য, সেখানকার মানুষ হয়ে বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি হয়ে ওঠা সত্যিই একটা বড় চ্যালেঞ্জ; রুপকথার গল্পের মতই। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে আকাশবাণিতে প্রথম স্বরচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে তাঁর সাতজেলিয়ার রাজপুত্র হয়ে ওঠা। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সমস্ত বড় কাগজে লেখালেখি শুরু। একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর’ (১৯৯৪), ‘জলটোপ’ (১৯৯৯), ‘ঠাম্মাকে বলিস’ (১৯৯৯), ‘এক্সোডাস’ (২০০৬), ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ (২০০৮), ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ (২০১০), ‘ওডিসি’ (১৪১৬), ‘লাইফ লাইন’ (২০১২), ‘আঠারো ভাটির উপকথা’ (২০১২), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০১২), ‘কদমবুশি’ (২০১৩) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ । এছাড়া ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় সুন্দরবনের পটভূমিতে কবির কলমে লেখা একমাত্র উপন্যাস ‘পাউড়’ ।
    বাংলা লিপির উপর তাঁর  গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলা লিপির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। কবিতাপ্রান সুবীর মণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘কবীর’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা। ২০০২ সালে তিনি ‘কবীর পত্রিকা’ সম্পাদনা শুরু করেন। বিনয় মজুমদারের সাক্ষাৎকার দিয়ে ‘কবীর’ পত্রিকার পথ চলা শুরু। ২০১২ সালে তাঁর এই পত্রিকায় চল্লিশজন বিশিষ্ট কবির সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় ‘উবাচ’ নামে। ২০১২ সালে এই পত্রিকায় নির্বাচিত এক’শ জন কবির গুরুত্বপূর্ণ কবিতা প্রকাশিত হয়।
    সুবীর মণ্ডল তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে (১৯৬৭ - ২০১২) মাত্র এগারোটি কাব্যগ্রন্থ ও একটি উপন্যাস রচনা করার সুযোগ পেলেও তিনি সাহিত্য চর্চার জন্য বিভিন্ন সময় নানারকম সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। ২০০১ সালে তিনি কবিতা রচনার জন্য ‘বনানী পত্রিকা’ কতৃক সম্মানিত হন। ২০০৯ সালে তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়-এর বাংলা বিভাগ তাঁকে ‘কবিতা স্মারক’ সম্মান প্রদান করে। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ‘বিনয় মজুমদার স্মৃতিরক্ষা কমিটি’ তাঁকে মরণোত্তর ‘বিনয়পদক’ প্রদান করেন। ২০১৩ সালের ৬ জানুয়ারি ‘দৌড় পত্রিকা’ কতৃক সুবীর মণ্ডল সম্পাদিত ‘কবীর পত্রিকা’ সংবর্ধিত হয়।
    সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মগ্রহন করে ‘কবিতা পাগল’ সুবীর মণ্ডল বাংলা কবিতার জগতে যে অবদান রেখে গেছেন তা বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। কবিতা রচনা করে কিম্বা পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে সুবীর মণ্ডল বাংলা সাহিত্য সংসারকে আরও সমৃদ্ধ করতো যদি না মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে অকালে চলে যেতে হোত।


সুবীর মণ্ডলের কাব্যের অন্দরমহল

    সুবীর মণ্ডল নব্বই দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি। নব্বই দশকে বাংলা কবিতায় বহু কবির জন্ম হয়। ভালো-মন্দ কবিতে ভরা নব্বই দশকের বাংলা কবিতার ‘হিজিবিজি জগতে’ তিনি স্বতন্ত্র শিল্পী। নব্বই দশকের কবিতাচর্চার প্রসারিত সংসারে তিনি নিজস্ব সুরে গান বেঁধেছেন। আসলে সুবীর মণ্ডলের সামগ্রিক কবিতাচর্চা বিশেষ কোন ধারনার দ্বারা পরিচালিত বা প্রভাবিত হয়নি। একেবারে স্বতন্ত্রভাবে নিজস্ব ‘শব্দগোপালে’ সৃষ্ট তাঁর কাব্যজগৎ। কবি আলোক সরকারের কথায়ঃ

“নব্বই দশকের কবিদের মধ্যে যার কবিতা আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করতো তিনি সুবীর মণ্ডল। ..................................................সুবীর মণ্ডল আমার মনে হয় কবিতা লিখবার সময় কোন বিশেষ ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হননি। তার কাছে কবিতার একমাত্র লক্ষ্য কবিতা হয়ে ওঠা। তার কবিতার প্রধান প্রতিজ্ঞা রূপগত। অনেকটা সাবেকি ধরণের ছন্দ-মিল বজায় রেখে তিনি কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে চলতেন। এবং ছন্দে, বিশেষ করে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে তার দখল ছিল অসামান্য।”১

    সুবীর মণ্ডলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর’। খুব অল্প বয়সে কবি মাকে হারান। সমগ্র কাব্য জুড়ে মা হারানো এক কিশোরের বিলাপ ধ্বনিত হয়েছে করুন কান্নায়। মায়ের স্মৃতিতে, মা হারানো বেদনায় সমগ্র কাব্যটির প্রতিটি শব্দ যেন ব্যথিত, ভারাক্রান্ত। মায়ের স্মৃতিতে ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর কাব্যটি’ এক অনন্য আবেদন সৃষ্টি করেছে বাংলা কবিতার সংসারে।
    ‘জনম দুঃখিনী মা’ প্রতিটি সন্তানের পরম আশ্রয়, শেষতম অবলম্বন। কিন্তু অসময়ে, নিতান্ত ছোটো বয়সে কবিকে একা করে তাঁর মা চলে গেছেন চির না ফেরার দেশে। তাই মাকে অশ্রয় করে কবির অকৃত্রিম বাৎসল্য, মায়ের জন্য কবি মনের হাহাকার ধরা পড়েছে এই কাব্যের প্রতিটি কবিতায়ঃ

“আমার খুব অসুখ করলে মনে পড়ে আমার খুব মন খারাপ করলে মনে পড়ে আমার মাকে কখনও প্রনাম করা হয়নি”২ কবির এই করুণ উচ্চারণ প্রতিটি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রতিটি পাঠককে তাঁর মায়ের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। সমগ্র কাব্যে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, মায়ের প্রতি ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ কাব্যটিকে এক অনন্যমাত্রা দান করেছে। কবি আজও অসুস্থ হলে মায়ের সেবা পেতে ব্যাকুল হয়ে পড়েনঃ আমার খুব অসুখ করলে আমি জানলা দিয়ে মেঘ দেখি কিংবা কারও উদ্বিগ্ন আঁচল আর আমার বিছানা এবং জুতো চুপচাপ শুয়ে থাকে

দুধ সাদা মেঘের নিচে অথচ কতদিন আমাদের দেখা সাক্ষাৎ নেই আর কোনো শৈশবের ছোট হাতে তার বুক থেকে আঁচল খসাতে গেলে ঝর ঝর করে বৃষ্টি নামে আমার বালিশে আমার নক্‌সী কাঁথায় আমার দু-গাল বেয়ে মায়ের চোখের জল আর মেঘ ভেঙে যায় কল্যানময়ী মেঘ ভেঙে যায়”৩

কবির এই সহজ সরল সত্য উচ্চারণ কাব্যটিতে অকৃত্রিম বাৎসল্য রসের সৃষ্টি করেছে।

    ‘জলটোপ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে এক প্রেমিকের অভিমান, বিরহের করুন কান্না। প্রেমের কবিতা বাংলা সাহিত্যে কম লেখা হয়নি, বিরহের কবিতা হয়ত আরো বেশি। কিন্তু প্রেমিকার প্রতি অভিমান, অভিযোগ, ক্রোধে সুবীর মণ্ডল প্রেমের যে নিবিড় চিত্র তুলে ধরেছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। প্রেমের বা বিরহের কবিতা কবি সুবীর মণ্ডলের লেখায় নতুন ভাষা পায় যখন তিনি তাঁর প্রেমিকার প্রতি এক বুক অভিমান নিয়ে উচ্চারণ করেনঃ

“যদি চাও, জয়েন্ট ছবি থেকে তোমার অংশ তুমি ছিঁড়ে নিতে পারো আমি আপত্তি করব না। শুধু, আমার যে হাত কাটা পড়বে আর জড়িয়ে থাকবে তোমার কাঁধে যদি কখনও দরকার হয় আমি অবশ্যই ফেরত চাইব।”৪ প্রেমিকার প্রত্যাখ্যানকে মানতে পারেন না কবি। শত তিরষ্কারেও কবি শুধু ভালোবেসে যেতে চান তার প্রেমিকাকে। প্রেমিকার প্রতি গভীর ভালোবাসায় উচ্চারণ করেনঃ

“.....শুধু তোমার জন্য, এই দেখ আমার হৃৎপিণ্ড আমি উপড়ে ফেলেছি দুই হাতে, তুমি কি—অপদার্থ বলবে আমাকে, বলবে হৃদয়হীন!”৫

প্রেমিকার জন্য এই আত্মত্যাগ, এই সমর্পণ, এই নিবেদনের সহজ উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যে বিরল। আত্মত্যাগ নিবেদন, সমর্পণের মাধ্যমে মধুর রস পূর্ণতা পায়। প্রেমের কবিতা তখনই সফল প্রেমের কবিতা হয়ে ওঠে, যখন কবিতায় অকৃত্রিম মধুর রসের অবতারণা ঘটে। এদিক থেকে সুবীর মণ্ডলের প্রেমের কবিতাগুলি সফল বলা যায়।

   ‘ঠাম্মাকে বলিস’ কাব্যে অনেক তত্ত্বকথাকে সামনে এনেছেন কবি। সমাজ, ধর্মের নানা বিষয়কে আলোচনা করেছেন এখানে। হিন্দুধর্মের নানা প্রসঙ্গ, ভক্তিবাদী আন্দোলন, ভারতের সংবিধান—নানাবিধ বিষয় উঠে এসেছে। কবিতা, শব্দ, ছন্দ প্রভৃতি সম্পর্কে কবির  গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রকাশিত হয়েছে এখানে। ‘খসড়া কবিতা’য় নিজের কবিতা রচনা সম্পর্কে বলেনঃ

“...........শব্দ পুষেছি গুটি কয় এই টুক টুক, উড়তে পারে না—পড়ে যায় নিজে নিজে কিছু খেতেও শেখেনি, মুখে তুলে দিলে তবে খায়—এমন বিচ্ছু—চোখ খুলে দেখেও না চেয়ে; এত যে করছি তন্ময়—”৬ কবিতাকে পক্ষী শাবকের সঙ্গে তুলনা সুবীর মণ্ডলের কবিতাকে এক নতুনতর মাত্রা দান করে। কখনও আবার কবিতাগুলোকে নিজের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন। আসলে কবি সাহিত্যিক বা যে কোনও শিল্পীর সৃষ্ট সম্পদ তো তাঁদের সন্তানসম। পরম স্নেহ, মমতা, বাৎসল্যে শিল্পী তাঁর শিল্পকে তাঁর হৃদয়ে ভ্রুণ সঞ্চারের মতো করে সঞ্চার করতে থাকেন, লালন পালন করেন। তারপর সময় মতো প্রসব করেন সাহিত্যের পাতায়। কবির কথায়ঃ “জানি যে শব্দ আছে আমার শরীরে তাহাকে প্রসব করি—শব্দ, গোপাল অতিশয় দুষ্টু ও দারুণ সরল”৭

কবি তাঁর প্রসব করা সন্তান ‘শব্দ গোপাল’কে বলে যান, “লায়েক গোপাল আজ, কবিকে চিনিস/ মরিলে বুড়োর মুখে নুড়ো জ্বেলে দিস।”৮ শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তিলে তিলে গড়ে তোলা ‘দুষ্টু দামাল’ আত্মজর কাছে তিনি সেবা যত্ন পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, মৃত্যুর পরও আত্মজসম কবিতাকে মুখাগ্নি করার কথা বলে যান। কবিতাকে নিয়ে এই কল্পনা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, কবি সুবীর মণ্ডলের হাতে বাংলা কবিতার ভাবনার জগতের এক দৃষ্টান্তমুলক বাঁক বদল ঘটে গেছে। ‘এক্সোডাস’ কাব্যে কবিতা নিয়ে নানারকম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন কবি। কবিতা রচনা সম্পর্কে তাঁর মতামতঃ

‘ধোঁয়া – ধুলো - কুবাতাস, প্রাত্যহিক বিষাদ বাঁচিয়ে কিছু শব্দ — উপার্জন, রেখে দিই প্রাণের ভিতর ফুলের কোরক যেন, স্বেদ – স্বপ্ন - ভালোবাসা দিয়ে রচি বা আনন্দ ঋতু — দেবশিশু খেলে একঘর।”৯

    ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ ও ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ কাব্য দুটিতে কবি সনেটকে সৃষ্টি করেছেন নতুনভাবে। আধুনিক সময়ের কবি সুবীর মণ্ডল অত্যন্ত সচেতনভাবে দক্ষতার সঙ্গে সনেটের ছন্দে বাঁধতে পেরেছেন তাঁর মনের ভাবকে। সনেটের সফল সৃষ্টির জন্য এই কাব্য দুটি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।  
    ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ কাব্যে কবি মানুষের কামনাবাসনাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। সমগ্র কাব্যের প্রত্যেকটি কবিতায় কামনা বাসনার মতো মানুষের আদিম প্রবৃত্তির অকৃত্রিম ভাষারূপ দিতে পেরেছেন। যোনি, স্তন, সঙ্গম, পরকীয়ার অকৃত্রিম বর্ণনায় কবি যৌনতাকে নতুন রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তবে ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ কাব্যে যৌনতার নিবিড় বর্ণনার পরও যৌনতা ছাপিয়ে সফল কবিতা হয়ে ওঠে সুবীর মণ্ডলের লেখনী কৌশলে। কবি মন্দাক্রান্তা সেন মনে করেনঃ

“এরকম বিশুদ্ধ কামের কবিতা, সমগ্র সংকলন জুড়ে, বাংলা সাহিত্যে, মধ্যযুগের পর, খুব বেশি লেখা হয়নি। এবং এ কাম আরও তুরীয় কেননা এ কাম পরকীয়া—”১০ “.....গ্রন্থটির অনবদ্য অঙ্গসজ্জা। খাজুরাহো ও কোনারকের অপূর্ব মিথুন মূর্তির ছবিগুলি, যেভাবে প্রতিটি কবিতার বাঁ পাশে মুদ্রিত, তাতে এই বইটি যেন এক কালেটর’স এডিশন হয়ে উঠেছে। অসামান্য এই গ্রন্থ পরিকল্পনা, যা কবির উত্তীর্ণ কবিতাগুলির পাশাপাশি আমাদের আরওবেশি করে মনে করিয়ে দেয় যৌনতা কখন কিভাবে শিল্প হয়ে উঠতে পারে। শিল্প হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জৈবনিকতারও একটা মধুর জীবনভাষ্যও বটে।”১১

    ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ কাব্যের মোট চারটি অংশ-- ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’, ‘শ্রীচরণকমলেষু’, ‘পাখিদের মেয়ে তুই’ আর ‘শিকড়ের ছেঁড়া টান’। জীবনে বিচিত্র ধরণের অনুভূতির জগৎ নিয়ে এ কাব্যটি নির্মিত। চির না ফেরার দেশে চলে যাওয়া মাকে চিঠি লিখে কবি বাবা, ভাই, বোন, ভগ্নিপোত, নিজের স্ত্রী, কন্যা সহ পরিবারের সকলের খবর পৌছে দেন মেঘ, বাতাস, নদীর মাধ্যমে। এখানে কবির চিন্তা ভাবনা মণ্ডল ‘মেঘদূত’ কাব্যের ভাবনাকে ছুঁইয়ে যায়। কবি যেন এখানে মেঘদূতের যক্ষঃ

“শ্রীচরণকমলেষু, মা আমার—কতদিন পর তোমাকে লিখছি ফের, এই চিঠি, যে তুমি এখন বৃত্তের বাহিরে থাকো, কোনোদিন পাও কী না পাও মেঘকে তলব করি, নদীকে ও বাতাসকে ডাকি—”১২ সনেটের বন্ধনে মনের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সুকৌশলে বাঁধতে পেরেছেন কবি এখানে। ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ কাব্যের আলোচনায় কবি সুজিত সরকার বলেছেনঃ “সুবীর মণ্ডলের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই কবি তাঁর সমস্তরকম আবেগ - অনুভূতি - বলবার কথাকে সনেটের চোদ্দো লাইনের বাঁধুনিতে অনায়াসেই প্রকাশ করতে সক্ষম। বাংলা কবিতায় এখন সনেট চর্চা কমে এসেছে। কিন্তু সুবীর মণ্ডল এই আঙ্গিকে কবিতা রচনায় দক্ষতার এমন এক শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছেন যে সদ্য লিখতে আসা অল্পবয়সী কবিরা তাঁর কবিতা পড়লে উপকৃত হবেন, বুঝতে পারবেন যে তাঁরা যে ভাষায় লিখতে চাইছেন সেই ভাষাতে সনেট রচনা সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সুবীর মণ্ডলের এই কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতায় একটি স্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে একদিন।”১৩ লাইফ লাইনে মৃত্যু

    সুবীর মণ্ডলের কাব্যজগত বৈচিত্রময়। সীমিত জীবনকালে তাঁর সৃষ্টি অতি সামান্য অথচ অসামান্য। তাঁর প্রতিভা প্রস্ফুটিত হবার আগেই যদি না ঝরে যেত তাহলে বাংলা কাব্য সংসার অনেক সমৃদ্ধ হোত। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে মা হারানো বেদনায় তিনি লিখলেন ‘আমার মায়ের চোখ থেকে তুলসীপাতা/ সরিয়ে নাও/ সহ্য হয় না’—শুরু হল কবি সুবীর মণ্ডলের পথ চলা। মা হারানো এক কৈশোরের করুণ কান্নায় ভারাক্রান্ত কবি সুবীর মণ্ডলের কবিতা পথ চলতে চলতে হঠাৎ করেই আবার কবিকে লিখতে হোল নিজেরই সীমিত জীবনের সমাপ্তির কাহিনী ‘লাইফ লাইন’। তাই কবি সুবীর মণ্ডলের কাব্যের আলোচনায় ‘লাইফ লাইন’ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ‘মৃত্যু’ কবিতায় লিখেছেন—‘মৃত্যু অজ্ঞাত মোর/আজি তার তরে/ ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে/ এত ভালোবাসি/ বলে হয়েছে প্রত্যয়/ মৃত্যুরে আমি ভালো/ বাসিব নিশ্চয়।’ রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃত্যু ছিল অজ্ঞাত, তাই মৃত্যুকে নিয়ে তিনি নানারকম রোম্যান্টিক কল্পনা করেছিলেন, মৃত্যুকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন। কিন্তু যে মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী, সময়ের আগে যাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মৃত্যু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁর পক্ষে কি মৃত্যুকে নিয়ে রোমাঞ্চকর কাহিনি রচনা সম্ভব? মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে কি মৃত্যুকে ভালোবাসার কথা বলা যায়? মৃত্যু অমোঘ, তাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেতে গেলে হাত টেনে ধরে। শিয়রে যদি মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে তবে আর কি করার থাকে মানুষের? মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের মুখে কি কান্না ছাড়া কোনো কথা আসতে পারে? আসন্ন মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের কি উপলব্ধি হতে পারে, কোন কোন চিন্তা মানুষের মাথায় আসে, তার এক বিচিত্র অনুভবের ইতিকাব্য সুবীর মণ্ডলের ‘লাইফ লাইন’। সাক্ষাৎ মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে লিখে ফেলা আস্ত একখানা জীবন্ত কাব্য— যার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে মৃত্যুর কথা, মৃত্যু সম্পর্কে নানা চিন্তাভাবনা, মৃত্যুর নিবিড় অনুভূতি—বিচিত্র সব উপলব্ধি।

    মৃত্যু নিয়ে সাহিত্যে শিল্পে বহু আলোচনা হয়েছে। এই মৃত্যু কি? কিভাবে আসে মৃত্যু? মৃত্যু যন্ত্রণা কেমন হয়?  মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের চিন্তায় কোন কোন কথা আসে? মৃত্যুর পর নিজের স্ত্রী, কন্যা, আত্মীয়–পরিজন সকলের কি অবস্থা হয়? শিল্পী সাহিত্যিক কিম্বা সাধারণ মানুষ, যাঁরা কঠোর পরিশ্রমে তিলে তিলে যে সৃষ্টি করে গেছে তার অবস্থা কি হয় তাঁর মৃত্যুর পর? মৃত্যুর পর তার কথা কেউ কি ভাবে? মনে রাখে?— এসব জানার সুযোগ থাকে না মৃত ব্যক্তির কাছে। আসলে এগুলো মৃতের অধিকারের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু সৃজনশীল শিল্পীর কল্পনায় ধরা পড়ে মৃত্যুর সামগ্রিক চিত্র, না জানা নানা রকম কথা, মৃত্যুর আগের, মৃত্যুর সময়ের বা মৃত্যুর পরের নানারকম অবস্থা। স্টোকের মতো আকস্মিক মারণরোগে আক্রান্ত হয়ে সুবীর মণ্ডল মৃত্যু বিষয়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন, মৃত্যুর একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন, হাসপাতালের ডেটলের গন্ধ ভরা বেডে শুয়ে মৃত্যু সম্পর্কে সেই অভিজ্ঞতায় লিখে ফেললেন ‘লাইফ লাইন’ কাব্য। কাব্যের একেবারে শুরুতে মৃত্যু সম্পর্কে বললেনঃ

“মৃত্যুর সঙ্গে এই যা হল, তাকে সঙ্গম বলা যায়। বলা যায়, যে কোনো সঙ্গমের মতোই এ-ও একটা যুদ্ধ। এ-ও একটা যুদ্ধ, কেন না, ঘটনাটা ঘটার সময় কেউ কাউকে এক বিঘৎ-ও জমি ছেড়ে দেয় না; বরং কে, কত তাড়াতাড়ি অন্যজনকে ঘায়েল করতে পারে, প্রাণপণ মহড়া চলে তারই। এ যাত্রা মৃত্যুকে যে বিছানায় ফেলে চলে আসতে পেরেছি, মনে হচ্ছে কিসের যেন জোয়ার লেগেছে ভিতরে। মনে হচ্ছে, একটা কিছুর জন্ম হবে এখনই। একটা কিছু। সম্ভবত নীল রঙের আলো। আমি ঠিকই টের পাচ্ছি, জড়িয়ে ধরছে আমাকে। কাল যদি মৃত্যু আমাকে বিছানায় ফেলে চলে যায়, আমি এই উপলব্ধির কথা, এই ক-লাইন ডেটল গন্ধ, জনে জনে বলে যেতে চাই।”১৪

         জীবনের পরিনতি তো মৃত্যু। কিন্তু সময়ের আগে মারণরোগ যখন জীবনকে খাদের কিনারায় দাঁড় করায়, তখন একদিকে ‘চাঁদের ডাক’ আর অন্যদিকে ‘চিতাকাঠের ডাক’। চাঁদের ডাক রোমাঞ্চ জাগায়, কিন্তু চিতাকাঠের ডাক জাগায় আতঙ্ক। চাঁদের ডাক এড়ানো যায়, কিন্তু চিতাকাঠের ডাক তো অমোঘ; অনিবার্য। মৃত্যুচিন্তা মানুষকে অসহায় করে তোলে। মৃত্যু যখন একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন জীবন আর মৃত্যু নিয়ে শুরু হয় নানা চিন্তাভাবনা। এই মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের বিচিত্র উপলব্ধি সুবীর মণ্ডলের ‘লাইফ লাইন’; মৃত্যুপথযাত্রী এক মানুষের জীবন্ত উপলব্ধি।
    ঘোষিত হয়ে গেছে সময় বড় কম। জীবন আর মৃত্যুর মাঝের ‘জিরন খোলা’ হাসপাতাল। শমন শিয়রে দাঁড়িয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ‘সরি একটু দেরি হয়ে গেল’, কিম্বা ‘প্লিজ একটু দাঁড়াও’— এভাবে মৃত্যুকে থামানো যায় না জানেন কবি। কিন্তু বয়স তো মাত্র চল্লিশ, এই অসময়ে যাওয়া যায়! আশ্রয়হীন স্ত্রী, অভিভাবকহীন কন্যা, ছোট ছোট অপূরণীয় কত স্বপ্ন— এসব ফেলে যাওয়া যায়! এই অকালে মৃত্যুর সময় জীবন তো হাতছানি দিয়ে ডাকবেই। অসহ্য ডেটল – ঔষধ – ব্যাণ্ডেজের গন্ধ, সাদা কাপড় ঢাকা শবদেহ অসহায় বিপন্ন করে তোলে কবিকে। আর এই বিপন্নতা থেকে জন্ম নেয় জীবন-মৃত্যুর ছায়াছবি, একটা মৃত মানুষের জীবন্ত উপলব্ধি ‘লাইফ লাইন’। তাই ‘লাইফ লাইন’ অসহ্য এক আর্তি নিয়ে থেকে গেলো পাঠকের সামনে’।১৫ ‘লাইফ লাইনে’র সমগ্র কবিতা জুড়ে মৃত্যুর কথা, মৃত্যুর চিন্তা, মৃত্যুর আতঙ্ক, মৃত্যুর সঙ্গে হাসি ঠাট্টা— বিচিত্র সব উপলব্ধি। কবি দেবারতি মিত্র সুবীর মণ্ডলের মৃত্যু নিয়ে লেখা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

“বাংলা কবিতায় মৃত্যুর এই রূপ আশ্চর্যভাবে মৌলিক ও তুলনাহীন। বেশ কিছুদিন ধরে মৃত্যুর কাছাকাছি ছিলেন বলেই হয়তো তাঁর চেতনায় এরকম সূক্ষাতিসূক্ষ্ম কল্পনার অঙ্কুর গজাচ্ছিল।”১৬

আঠারো ভাটির উপকথাঃ প্রান্তিক মানুষের কথা

   কবি সুবীর মণ্ডল আজ কবিতা রসিকের কাছে নানা দিক থেকে পরিচিত। কিন্তু ভূমিপূত্র হিসাবে তিনি তাঁর প্রান্তিক সুন্দরবনের একেবারে সাধারণ মানুষ, তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে যে কাব্যটি লিখলেন তাকে বাদ দিয়ে সুবীর মণ্ডলের সাহিত্যর আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শৈশবকাল থেকে দেখা সুবীর মণ্ডলের ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা অনুভূতিকে কবি তাঁর ‘আঠারো ভাটির উপকথা’ কাব্যে ধরে রাখলেন। এর ফলে এই কাব্যটি সুবীর মণ্ডলের সাহিত্য ধারায় শুধু বৈচিত্র সৃষ্টি করল না, শহুরে মানুষদের সুন্দরবনের মানুষের বৈচিত্রময় জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিতও করে দিল। কাহিনীর আকারে আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সুবীর মণ্ডলের ‘আঠারো ভাটির উপকথা’ তাই বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য গ্রন্থ।
          সুন্দরবনের পৌরানিক নাম ‘আঠারো ভাটি’। স্কটল্যাণ্ডের ধনী ব্যবসায়ী স্যার হ্যামিল্টন সাহেব মানুষের জন্য কিছু করার নেশায় রাজ ঐশ্বর্য ছেড়ে, অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে চলে আসেন। সেখানে ‘বাদা’ কেটে তৈরি করেন ‘আবাদ’। বন কেটে বসত গড়ে সুন্দরবনের ভূগোল দিলেন পাল্টে। ক্রমে হিংস্র ‘রয়্যালবেঙ্গল’ অধ্যুষিত সুন্দরবনের অরণ্যের ইতিহাসে শুরু হল আধুনিক মানব সভ্যতার অভ্যুত্থানের ইতিহাস। মা বনবিবির ‘আঠারো ভাটি’তে হিংস্র হুঙ্কার মুছে জেগে উঠল মানুষের কোলাহল। নদী থেকে মাছ - কাঁকড়া, জঙ্গল থেকে কাঠ – মোম – মধু সংগ্রহ করে অল্পদিনে বন বিবির ‘আঠারো ভাটি’ পরিণত হল রূপকথার স্বপ্নপুরী। তবে বাঘ কুমীর তাড়িয়ে বসত করার জন্য প্রতিনিয়ত নদীতে কুমীরের আর জঙ্গলে বাঘের হানা চলতে থাকে। তবুও থেমে থাকেনা সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষের জীবন। জীবনের চেনা পথ দিয়েই এগিয়ে চলে আঠারো ভাটির জীবন। কবি সুবীর মণ্ডল আশ্চর্য আঠারো ভাটির মানুষের জীবন – জীবিকা - মৃত্যু, প্রেম – ভালোবাসা, আনন্দ – অনুষ্ঠানের বিচিত্র কাহিনীতে লিখে ফেললেন আস্ত একটা কাব্য-- ‘আঠারো ভাটির উপকথা’। 
    ভূমিপুত্রের দায়িত্বে পরম মমতায় লিখলেন জল – জঙ্গলাশ্রিত মানুষদের জীবনের নানা চিত্র। কবি লিখলেন সুন্দরবনের মানুষরা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে, নৌকা থেকে কখনও কখনও জার ভর্তি মাধু নামে, নামে না সুধন্য মৌলেদের মত মানুষেরা। নিজের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নদীতে পড়ে ‘মীন’ ধরা ময়নার বিয়ের অল্পদিন আগে কুমিরে তার ‘সোন্দর’ পা কেটে নিয়ে চলে যায়। এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে মন্ত্রবলে বাঘ চালান করা হলধর আলিপুর জেলে চালান হয়ে যায় বাঘের চামড়া পাচার করার অপরাধে। নদীতে বাঁধ দিয়ে অরণ্যাশ্রিত দ্বীপ জলমুক্ত করেই সুন্দরবনের মানুষের বাস। তাই মাঝে মাঝে বাঁধ ভেঙে ‘আয়লা’র আতঙ্কে কেঁপে ওঠে সুন্দরবনের মানুষ। তবে সে স্মৃতি মুছে ফেলে মঙ্গল সর্দারেরা মোরগ বগলে সোজা চলে যায় লড়াইয়ের আসরে। নিজের প্রিয় মোরগ হেরে ‘পাউড়ে’র গ্লানি মাথায় নিয়ে দুঃখে গলা পর্যন্ত হাঁড়িয়া পান করে রাস্তায় সজোরে হাত চাপড়ে বলতে থাকে—‘গেল তো লাড় এট্টা ডিম গেল’। ‘সিউলি’ সমীরুদ্দি ‘মেয়েদের ব্লাউজ খোলা, সায়া ওঠানোর মতো করে খেজুর গাছের ‘ডেগো’ আর বাকলের জাল উঠিয়ে রাখে’। তারপর শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস বের করে। খেজুর গাছের রস বের করতে গিয়ে তার যৌন আকাঙ্খা জেগে ওঠে, মনে পড়ে যায় স্ত্রীর কথা। ‘হাঁসা’টা হারিয়ে গেলে হাঁসীর কষ্টের কথা ভেবে কেঁদে ওঠে ফুলবাসীর মন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ‘ধাড়ী’ বা ‘বকরী’দের পাল ধরাতে গিয়ে কার্ত্তিকের সাক্ষাৎ ঘটে তাঁর পূর্বপ্রেমিকার সঙ্গে। তার পাঁঠার মতো সেও পূর্ব প্রেমিকার সঙ্গে আদিম কামনায় মেতে ওঠে নিস্তব্ধ দুপুরে। বিয়ের পাঁচ বছর পরও সন্তান না হওয়া সোনাতনের বৌ সন্তান কামনায় সরল বিশ্বাসে ‘শঙ্খ’ লাগা সাপের সামনে পেতে দেয় নতুন গামছা। এভাবে সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপের মাটি ঘেঁষা মানুষের কথায় গড়ে উঠল সুবীর মণ্ডলের ‘আঠারো ভাটির উপকথা’। কবি বিভাস রায়চৌধুরীর কথায়ঃ

“মৃত্যু অনিবার্য, তাকে ভুলে থেকেই লীলা করতে হয় আমাদের। এই লীলাকেও চিনতে যে পেরেছিল সুবীর, তার প্রমাণ ‘আঠারো ভাটির উপকথা’র কবিতাবলি। প্রান্তিক জীবনের বিচিত্র গল্পাভাস কবিতাগুলোকে দিয়েছে অন্য মূল্য। ব্যক্তির বাইরে যে দিগন্তবিস্তৃত পৃথিবী, তার কবিতাগুলোকে দিয়েছে অন্য মূল্য।”১৭

সুবীর মণ্ডলের একমাত্র উপন্যাস পাউড়ঃ শুধুই পরাজয়

    সুবীর মণ্ডল বাংলা সাহিত্যে নব্বইয়ের দশকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিত। তাঁর কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যের নতুন সুর সংযোজন করেছিল একথা অস্বীকার করা যায় না। কবি সুবীর মণ্ডলের আত্মজীবনীমূলক একমাত্র উপন্যাস ‘পাউড়’ বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। আদ্যপান্ত মধ্যম পুরুষে লেখা এ উপন্যাস কবির নিজেরই জীবনের গদ্যময় কাহিনী। আদ্যোপান্ত মধ্যম পুরুষে লেখা পাউড় উপন্যাসে সুন্দরবনের গোসাবা থানার জল জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট সাতজেলিয়া দ্বীপের মানুষদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, সংস্কার, ভাষা, ধর্মবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে জল-জঙ্গল থেকে শহর কলকাতায় উঠে আসা স্কুল শিক্ষক কবির জীবন সংকটের কাহিনী ধরা আছে। লেখা আছে কবি সুবীর মণ্ডলের বার বার হেরে যাওয়া পৌরুষের কাহিনী।
    পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে আজও মোরগ লড়াই প্রচলিত। যুযুধান দুই মোরগের পায়ে ইস্পাতের ধারালো ‘অস্ত্র’ বেঁধে লড়াইয়ের আসরে ছেড়ে দেওয়া হয়। জীবনপণে দুই মোরগ পৌরুষের পরীক্ষা দিতে থাকে। যতক্ষণ না রণক্ষেত্রে একটা মোরগের মৃত্যু হয়, অথবা লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালায় ততসময় চলতে থাকে এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। জীবন যুদ্ধে যে মোরগ রক্ত বমি করে মরে বা যার পৌরুষ পরাজিত হয়,‘পাউড়ে’র অপমান জোটে তার ললাটে। অন্যদিকে যে মোরগ লড়াইয়ের ময়দানে প্রচণ্ড পরাক্রমে তার পৌরুষ প্রতিষ্ঠিত করে, সেই ‘জিতকারে’র গরিমায় গর্বিত হয় আখড়ায় সমবেত মানুষের কাছে। বাংলার আদিবাসী সমাজের প্রচলিত এই আকর্ষণীয় মোরগ লড়াইয়ের অনুসঙ্গে সুবীর মণ্ডল নিজের জীবনের করুন কাহিনীকে তুলে ধরলেন অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে। ‘পাউড়’ উপন্যাসে পরাজিত পাউড়ের ব্যঞ্জনায় ঔপন্যাসিক উপস্থাপন করলেন জীবনযুদ্ধে বার বার নিজেরই পরাজয়ের কাহিনি।
    উপন্যাসের নায়ক ‘তুমি’ সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের পরিবেশ ছেড়ে পড়াশোনার জন্য শহর কলকাতায় চলে আসেন। পড়াশোনা শেষে চাকরসূত্রে শহর কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান তিনি। গ্রামেরই মেয়ে সীমাকে নিয়ে শহর কলকাতায় ঘর বাঁধেন। তবে সীমাকে নিয়ে তাঁর বাঁধা ঘর কখনও সুখের নীড় হয়ে ওঠেনি। ‘অ্যাজোস্পার্মিয়া’ রোগে আক্রান্ত ‘তুমি’ অর্থাৎ সুবীর মণ্ডল অল্প দিনের মধ্যে জেনে যান তিনি কখনও বাবা হতে পারবেন না। চারিদিকের পরিচিত-অপরিচিতরা সহজে সন্তান জন্মদান করে চলেছে অনবরত। তাঁর ছোট বেলার বন্ধু কদমের ‘বছর বিয়নে বৌ’ বছরের পর বছর ‘মাইয়ে’ সন্তান প্রসব করে। তাঁর কৈশোরের প্রেমিকা মৌ নপুংসক অবিনাশকে বিয়ে করেও ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দেয় অবৈধভাবে। আই.সি.ডি.এস কর্মী শাশুড়ীর খাতায় লক্ষ্য করেন গ্রামের প্রধান গগনহরি ৫৫ বছর বয়সেও তার স্ত্রীকে স্বাভাবিকভাবে গর্ভবতী করে। কলেজ থেকে ফেরার পথে গৌরীকে সন্ধ্যার অন্ধকারেগ রেপ করে মানিক। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গর্ভবতী হয় গৌরী। এলাকার পঞ্চায়েত প্রধান বাজারে শুয়ে থাকা পাগলীর গর্ভে ডুকিয়ে দেয় ফলপ্রসু অবৈধ বীজ।  অথচ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল যুবক হয়েও তিনি তাঁর স্ত্রীকে গর্ভবতী করার উপযোগী বীজ বপন করতে পারেন না, পারেন না স্ত্রীর মা হবার সাধ মেটাতে। জীবের সহজ সৃষ্টি তার কাছে সারা জীবনের মতো অধরা থেকে গেলো। 
    এই পুরুষত্বহীনতা প্রতিমুহুর্ত ঔপন্যাসিককে কুরে কুরে খায়, অপমানিত হতে হয় সকলের কাছে। গ্রাম থেকে ডাক্তার দেখাতে আসা কাকার মেয়ে খুকু মৃত বাচ্চা প্রসব করলে হিজড়েরা তাঁরই বাচ্চা হয়েছে ভেবে টাকা নিতে আসে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা জানার পর তাঁকে ‘আঁটকুড়ো মাষ্টার তোর একটা ছেলে হয় না’ বলে গালাগালি দিয়ে চলে যায়। প্রতিমুহুর্তে তাঁকে ডাক্তারের কাছে শুনতে হয় উপহাস, অপমানকর কথাবার্তা। তাঁর স্কুলেরই এক গরীব মেধাবী ছাত্র দীনেশ, যাকে তিনি সন্তান স্নেহে বিনামূল্যে পড়াতেন, চাকরী পাবার পর পড়ার টাকা শোধ দিতে এসে অপমানের সুরে তাঁকে শুনিয়ে দেয়, ‘স্যার এমনি এমনি কেউ কারো বাবা হয় না’। এমনকি নিজেরই স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতি নিয়ত শুনতে হয়, ‘গর্ভধারণ তো আর ওষুধে হয় না’ বা (পুতুলের) ‘আমি তো প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি না’।– এমনই নানারকম শীতল অথচ শ্লেষাত্মক আক্রমণ।
    জীবের ‘সবচেয়ে সহজ সৃষ্টি’ তাঁর কাছে সারা জীবনের মতো অধরা থেকে গেলো। পরাজয়ের গ্লানিতে প্রচণ্ড রাগে ট্রাউজার খামচে ধরেন অসহায়ের মতো। সন্তানের জন্য হাহাকারে বাৎসল্যে কেঁদে ওঠে মন। স্ত্রীর মাতৃত্বের সাধ মেটাতে না পারার অপরাধবোধে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয় প্রতিনিয়ত। অসহায়ের মতো স্ত্রীকে কখনও পরপুরুষের বীজ গর্ভে ধারণ করার প্রস্তাব দেন, স্ত্রীর মাতৃত্বের সাধ পূরণ করার জন্য। কখনও ঈশ্বর অবিশ্বাসী হয়েও ঠাম্মার পাঠানো ভণ্ড সাধু ‘পাগলা বাবা’র ‘বাবা হওয়ার’ ওষুধ খেয়ে নেন অন্ধ বিশ্বাসে। যখন সব আশা শেষ, তখন দত্তক নিয়ে পিতৃত্বের স্বাদ মেটাতে চেয়েছেন। কিন্তু সে আশাও মেটে না তাঁর। ডাক্তার সুদীপের চেম্বারে গৌরীর অবৈধ সন্তানকে নিতের গিয়ে দেখেন, বারবার মৃত সন্তান জন্ম দেওয়া তাঁর খুড়তুতো বোন খুকি বসে আছে সন্তানটিকে নেবার জন্য। এভাবে সারা উপন্যাস জুড়ে ঘরে বাইরে বিধ্বস্ত কবির জীবনের গদ্যময় কাহিনী রচিত হয়েছে ‘পাউড়’ উপন্যাসে।
    পুরুষ হয়েও কবি এখানে সারা উপন্যাস জুড়ে পুরুষের পরিচয় রাখতে পারেননি। পৌরুষের পরাক্রমে স্ত্রীর গর্ভে ফলপ্রসু বীজ দিয়ে ভ্রূণ সঞ্চার তো দূরের কথা, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘ডোনারস্পার্ম’ ব্যবহারের মাধ্যমে গর্ভসঞ্চারেও বাধ সেধেছে তার মধ্যবিত্ত সংস্কারাচ্ছন্ন মন। এমনকি দত্তক নিয়েও স্ত্রীর মাতৃত্বের সাধ মেটাতে সফল হননি শেষপর্যন্ত। কখনও শারীরিক অক্ষমতা, কখনও মধ্যবিত্ত মনের সংকীর্ণতা, সংস্কারাচ্ছন্নতা, কখনও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পৌরুষ বড় অসহায়। জীবনভর পরাজয় জীবনযুদ্ধের ময়দানে ‘পাউড়ে’ পরিণত করেছে বারবার। সারা উপন্যাসের প্রতিটি অনুচ্ছেদ পরাজয়ের অপরাধবোধ আর গ্লানির করুণ কান্নায় ভারাক্রান্ত। কাহিনীর নায়ক কবির জীবন শেষপর্যন্ত কঠিন গদ্যে পরিণত হয়েছে। কবি সারা জীবনের মত কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে কঠিন গদ্যকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
    কবি সুবীর মণ্ডলের নিজের জীবনের কাহিনী ‘পাউড়’। সমগ্র উপন্যাসটিতে ‘মধ্যম পুরুষ কথন রীতি’ ব্যবহার করে তিনি উপন্যাসের কথন রীতির নতুনত্ব দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে মধ্যম পুরুষ কথন রীতিতে খুব কম উপন্যাস লেখা হয়েছে। কবির কলমে লেখা একমাত্র এ উপন্যাস ভাষা ব্যবহারের দক্ষতায় পাঠকের কাছে অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের মানুষের মুখের ভাষা, প্রচলিত সংস্কার বিশ্বাস, তাদের জীবনযাত্রা ইত্যাদির নিখুঁত ব্যবহারে এক বৈচিত্রময় ও আকর্ষণীয় কাহিনিকে সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তাই সুবীর মণ্ডলের একমাত্র উপন্যাস ‘পাউড়’ বাং
                                            --------------------------

সূত্র নির্দেশঃ ১। ‘সুবীরের কবিতাঃ অনুপম রূপকল্প’, আলোক সরকার, ‘কবীর’, সুবীর মণ্ডল স্মরণ সংখ্যা, মার্চ, ২০১৩, পৃষ্ঠা ১৯ ২। ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর’, ‘কখনও আমার মাকে’, সুবীর মণ্ডল, ‘অভিযান পাবলিশার্স’, প্রথম প্রকাশ, ৩০ আগস্ট ২০১২, পৃষ্ঠা ১৩ ৩। তদেব, ‘কখনও আমার মাকে’, পৃষ্ঠা ১৩ ৪। তদেব, ‘জলটোপ’, ‘বিভাব কবিতা’, পৃষ্ঠা ১৯ ৫। তদেব, ‘জলটোপ’, ‘জলটোপ’, পৃষ্ঠা ২৪ ৬। তদেব, ‘ঠাম্মাকে বলিস’, ‘একটি খসড়া কবিতা’, পৃষ্ঠা ৩৪ ৭। তদেব, ‘শব্দ গোপাল’, পৃষ্ঠা ৩৯ ৮। তদেব, পৃষ্ঠা ৩৯ ৯। তদেব, ‘এক্সোডাস’, ‘একটি জটিল কবিতা’, পৃঃ ৬১ ১০। ‘শৃঙ্গার চতুর্দশীঃ একটা মধুর জীবনভাষ্যও বটে’, মন্দাক্রান্তা সেন, ‘কবীর’, ‘সুবীর মণ্ডল স্মরণ সংখ্যা’, মার্চ ২০১৩, পৃঃ ১৮৭ ১১। তদেব, পৃঃ ১৮৯ ১২। ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’, ‘শ্রীচরণকমলেষু’, সুবীর মণ্ডল, ‘অভিযান পাবলিশার্স’, প্রথম প্রকাশ, ৩০ আগস্ট ২০১২, পৃঃ ৮৫ ১৩। ‘একটি মনে রাখবার মতো কাব্যগ্রন্থ’, সুজিত সরকার, ‘কবীর’, ‘সুবীর মণ্ডল স্মরণ সংখ্যা’, মার্চ ২০১৩, পৃঃ ১৯৩ ১৪। ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘লাইফ লাইন’, ‘বিভাব কবিতা’, সুবীর মণ্ডল, ‘অভিযান পাবলিশার্স’, প্রথম প্রকাশ, ৩০ আগস্ট ২০১২, পৃঃ ১১৮ ১৫। ‘নিজস্ব সৌন্দর্য নিয়ে মিলনাকাঙ্খী’, বিভাষ রায়চৌধুরী, ‘কবীর’, ‘সুবীর মণ্ডল স্মরণ সংখ্যা’, মার্চ ২০১৩, পৃঃ ৪৪ ১৬। ‘জীবন, জীবনই সুবীরের কবিতায়’, দেবারতি মিত্র, ‘সুবীর মণ্ডল স্মরণ সংখ্যা’, মার্চ ২০১৩, পৃঃ ২৮ ১৭। তদেব, পৃঃ ৪৪



তথ্যসূত্রসম্পাদনা


আমার নিবন্ধটির বিষয়বস্তু হচ্ছে...


সুবীর মণ্ডল ও তাঁর সাহিত্যের নিবিড় পাঠ সুবোধ মণ্ডল (গবেষক, রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড়)



সুবীর মণ্ডলের জীবনঃ ১৯৬৭ সালের ৩০ আগষ্ট সুন্দরবনের অখ্যাত সাতজেলিয়া দ্বীপের পরশমনি গ্রামে জন্ম। সুন্দরবনের ছোট্ট দত্ত নদীর কূলে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। গ্রামে পড়াশোনার পর ১৯৮৮ সালে ক্যানিং ট্যাংরাখালি কলেজ থেকে সাম্মানিক বাংলা বিষয়ে গ্রাজুয়েট, ১৯৯০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করেন। ১৯৯৪ সালে দমদম এয়ারপোর্টের কাছে কমলাপুর কমলা বিদ্যাপীঠে শিক্ষক পদে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। সুবীর মণ্ডল ২০০৯ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা লিপির উপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। এবং ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের প্রতিভাধর তরুণ কবি সুবীর মণ্ডল বড় অকালে চির না ফেরার দেশে চলে যান।

সাহিত্য চর্চাঃ

    সুবীর মণ্ডল কবিতাপাগল মানুষ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি নিয়মিত কবিতাচর্চা করতেন। যে পরিবেশ থেকে তাঁর উঠে আসা, তাতে কবিতা আর সুবীর মণ্ডল এক সঙ্গে উচ্চারিত হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রত্যন্ত সুন্দরবনের যে অঞ্চলের মানুষের সাহিত্যচর্চা তো দূরের কথা, শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সামান্য, সেখানকার মানুষ হয়ে বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি হয়ে ওঠা সত্যিই একটা বড় চ্যালেঞ্জ; রুপকথার গল্পের মতই। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে আকাশবাণিতে প্রথম স্বরচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে তাঁর সাতজেলিয়ার রাজপুত্র হয়ে ওঠা। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সমস্ত বড় কাগজে লেখালেখি শুরু। একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর’ (১৯৯৪), ‘জলটোপ’ (১৯৯৯), ‘ঠাম্মাকে বলিস’ (১৯৯৯), ‘এক্সোডাস’ (২০০৬), ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ (২০০৮), ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ (২০১০), ‘ওডিসি’ (১৪১৬), ‘লাইফ লাইন’ (২০১২), ‘আঠারো ভাটির উপকথা’ (২০১২), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০১২), ‘কদমবুশি’ (২০১৩) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ । এছাড়া ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় সুন্দরবনের পটভূমিতে কবির কলমে লেখা একমাত্র উপন্যাস ‘পাউড়’ ।
    বাংলা লিপির উপর তাঁর  গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলা লিপির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। কবিতাপ্রান সুবীর মণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘কবীর’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা। ২০০২ সালে তিনি ‘কবীর পত্রিকা’ সম্পাদনা শুরু করেন। বিনয় মজুমদারের সাক্ষাৎকার দিয়ে ‘কবীর’ পত্রিকার পথ চলা শুরু। ২০১২ সালে তাঁর এই পত্রিকায় চল্লিশজন বিশিষ্ট কবির সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় ‘উবাচ’ নামে। ২০১২ সালে এই পত্রিকায় নির্বাচিত এক’শ জন কবির গুরুত্বপূর্ণ কবিতা প্রকাশিত হয়।
    সুবীর মণ্ডল তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে (১৯৬৭ - ২০১২) মাত্র এগারোটি কাব্যগ্রন্থ ও একটি উপন্যাস রচনা করার সুযোগ পেলেও তিনি সাহিত্য চর্চার জন্য বিভিন্ন সময় নানারকম সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। ২০০১ সালে তিনি কবিতা রচনার জন্য ‘বনানী পত্রিকা’ কতৃক সম্মানিত হন। ২০০৯ সালে তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়-এর বাংলা বিভাগ তাঁকে ‘কবিতা স্মারক’ সম্মান প্রদান করে। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ‘বিনয় মজুমদার স্মৃতিরক্ষা কমিটি’ তাঁকে মরণোত্তর ‘বিনয়পদক’ প্রদান করেন। ২০১৩ সালের ৬ জানুয়ারি ‘দৌড় পত্রিকা’ কতৃক সুবীর মণ্ডল সম্পাদিত ‘কবীর পত্রিকা’ সংবর্ধিত হয়।
    সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মগ্রহন করে ‘কবিতা পাগল’ সুবীর মণ্ডল বাংলা কবিতার জগতে যে অবদান রেখে গেছেন তা বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। কবিতা রচনা করে কিম্বা পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে সুবীর মণ্ডল বাংলা সাহিত্য সংসারকে আরও সমৃদ্ধ করতো যদি না মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে অকালে চলে যেতে হোত।


সুবীর মণ্ডলের কাব্যের অন্দরমহল

    সুবীর মণ্ডল নব্বই দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি। নব্বই দশকে বাংলা কবিতায় বহু কবির জন্ম হয়। ভালো-মন্দ কবিতে ভরা নব্বই দশকের বাংলা কবিতার ‘হিজিবিজি জগতে’ তিনি স্বতন্ত্র শিল্পী। নব্বই দশকের কবিতাচর্চার প্রসারিত সংসারে তিনি নিজস্ব সুরে গান বেঁধেছেন। আসলে সুবীর মণ্ডলের সামগ্রিক কবিতাচর্চা বিশেষ কোন ধারনার দ্বারা পরিচালিত বা প্রভাবিত হয়নি। একেবারে স্বতন্ত্রভাবে নিজস্ব ‘শব্দগোপালে’ সৃষ্ট তাঁর কাব্যজগৎ। কবি আলোক সরকারের কথায়ঃ

“নব্বই দশকের কবিদের মধ্যে যার কবিতা আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করতো তিনি সুবীর মণ্ডল। ..................................................সুবীর মণ্ডল আমার মনে হয় কবিতা লিখবার সময় কোন বিশেষ ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হননি। তার কাছে কবিতার একমাত্র লক্ষ্য কবিতা হয়ে ওঠা। তার কবিতার প্রধান প্রতিজ্ঞা রূপগত। অনেকটা সাবেকি ধরণের ছন্দ-মিল বজায় রেখে তিনি কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে চলতেন। এবং ছন্দে, বিশেষ করে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে তার দখল ছিল অসামান্য।”১

    সুবীর মণ্ডলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর’। খুব অল্প বয়সে কবি মাকে হারান। সমগ্র কাব্য জুড়ে মা হারানো এক কিশোরের বিলাপ ধ্বনিত হয়েছে করুন কান্নায়। মায়ের স্মৃতিতে, মা হারানো বেদনায় সমগ্র কাব্যটির প্রতিটি শব্দ যেন ব্যথিত, ভারাক্রান্ত। মায়ের স্মৃতিতে ‘পথ রয়েছে পায়ের ভিতর কাব্যটি’ এক অনন্য আবেদন সৃষ্টি করেছে বাংলা কবিতার সংসারে।
    ‘জনম দুঃখিনী মা’ প্রতিটি সন্তানের পরম আশ্রয়, শেষতম অবলম্বন। কিন্তু অসময়ে, নিতান্ত ছোটো বয়সে কবিকে একা করে তাঁর মা চলে গেছেন চির না ফেরার দেশে। তাই মাকে অশ্রয় করে কবির অকৃত্রিম বাৎসল্য, মায়ের জন্য কবি মনের হাহাকার ধরা পড়েছে এই কাব্যের প্রতিটি কবিতায়ঃ

“আমার খুব অসুখ করলে মনে পড়ে আমার খুব মন খারাপ করলে মনে পড়ে আমার মাকে কখনও প্রনাম করা হয়নি”২ কবির এই করুণ উচ্চারণ প্রতিটি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রতিটি পাঠককে তাঁর মায়ের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। সমগ্র কাব্যে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, মায়ের প্রতি ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ কাব্যটিকে এক অনন্যমাত্রা দান করেছে। কবি আজও অসুস্থ হলে মায়ের সেবা পেতে ব্যাকুল হয়ে পড়েনঃ আমার খুব অসুখ করলে আমি জানলা দিয়ে মেঘ দেখি কিংবা কারও উদ্বিগ্ন আঁচল আর আমার বিছানা এবং জুতো চুপচাপ শুয়ে থাকে

দুধ সাদা মেঘের নিচে অথচ কতদিন আমাদের দেখা সাক্ষাৎ নেই আর কোনো শৈশবের ছোট হাতে তার বুক থেকে আঁচল খসাতে গেলে ঝর ঝর করে বৃষ্টি নামে আমার বালিশে আমার নক্‌সী কাঁথায় আমার দু-গাল বেয়ে মায়ের চোখের জল আর মেঘ ভেঙে যায় কল্যানময়ী মেঘ ভেঙে যায়”৩

কবির এই সহজ সরল সত্য উচ্চারণ কাব্যটিতে অকৃত্রিম বাৎসল্য রসের সৃষ্টি করেছে।

    ‘জলটোপ’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে এক প্রেমিকের অভিমান, বিরহের করুন কান্না। প্রেমের কবিতা বাংলা সাহিত্যে কম লেখা হয়নি, বিরহের কবিতা হয়ত আরো বেশি। কিন্তু প্রেমিকার প্রতি অভিমান, অভিযোগ, ক্রোধে সুবীর মণ্ডল প্রেমের যে নিবিড় চিত্র তুলে ধরেছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। প্রেমের বা বিরহের কবিতা কবি সুবীর মণ্ডলের লেখায় নতুন ভাষা পায় যখন তিনি তাঁর প্রেমিকার প্রতি এক বুক অভিমান নিয়ে উচ্চারণ করেনঃ

“যদি চাও, জয়েন্ট ছবি থেকে তোমার অংশ তুমি ছিঁড়ে নিতে পারো আমি আপত্তি করব না। শুধু, আমার যে হাত কাটা পড়বে আর জড়িয়ে থাকবে তোমার কাঁধে যদি কখনও দরকার হয় আমি অবশ্যই ফেরত চাইব।”৪ প্রেমিকার প্রত্যাখ্যানকে মানতে পারেন না কবি। শত তিরষ্কারেও কবি শুধু ভালোবেসে যেতে চান তার প্রেমিকাকে। প্রেমিকার প্রতি গভীর ভালোবাসায় উচ্চারণ করেনঃ

“.....শুধু তোমার জন্য, এই দেখ আমার হৃৎপিণ্ড আমি উপড়ে ফেলেছি দুই হাতে, তুমি কি—অপদার্থ বলবে আমাকে, বলবে হৃদয়হীন!”৫

প্রেমিকার জন্য এই আত্মত্যাগ, এই সমর্পণ, এই নিবেদনের সহজ উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যে বিরল। আত্মত্যাগ নিবেদন, সমর্পণের মাধ্যমে মধুর রস পূর্ণতা পায়। প্রেমের কবিতা তখনই সফল প্রেমের কবিতা হয়ে ওঠে, যখন কবিতায় অকৃত্রিম মধুর রসের অবতারণা ঘটে। এদিক থেকে সুবীর মণ্ডলের প্রেমের কবিতাগুলি সফল বলা যায়।

   ‘ঠাম্মাকে বলিস’ কাব্যে অনেক তত্ত্বকথাকে সামনে এনেছেন কবি। সমাজ, ধর্মের নানা বিষয়কে আলোচনা করেছেন এখানে। হিন্দুধর্মের নানা প্রসঙ্গ, ভক্তিবাদী আন্দোলন, ভারতের সংবিধান—নানাবিধ বিষয় উঠে এসেছে। কবিতা, শব্দ, ছন্দ প্রভৃতি সম্পর্কে কবির  গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রকাশিত হয়েছে এখানে। ‘খসড়া কবিতা’য় নিজের কবিতা রচনা সম্পর্কে বলেনঃ

“...........শব্দ পুষেছি গুটি কয় এই টুক টুক, উড়তে পারে না—পড়ে যায় নিজে নিজে কিছু খেতেও শেখেনি, মুখে তুলে দিলে তবে খায়—এমন বিচ্ছু—চোখ খুলে দেখেও না চেয়ে; এত যে করছি তন্ময়—”৬ কবিতাকে পক্ষী শাবকের সঙ্গে তুলনা সুবীর মণ্ডলের কবিতাকে এক নতুনতর মাত্রা দান করে। কখনও আবার কবিতাগুলোকে নিজের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন। আসলে কবি সাহিত্যিক বা যে কোনও শিল্পীর সৃষ্ট সম্পদ তো তাঁদের সন্তানসম। পরম স্নেহ, মমতা, বাৎসল্যে শিল্পী তাঁর শিল্পকে তাঁর হৃদয়ে ভ্রুণ সঞ্চারের মতো করে সঞ্চার করতে থাকেন, লালন পালন করেন। তারপর সময় মতো প্রসব করেন সাহিত্যের পাতায়। কবির কথায়ঃ “জানি যে শব্দ আছে আমার শরীরে তাহাকে প্রসব করি—শব্দ, গোপাল অতিশয় দুষ্টু ও দারুণ সরল”৭

কবি তাঁর প্রসব করা সন্তান ‘শব্দ গোপাল’কে বলে যান, “লায়েক গোপাল আজ, কবিকে চিনিস/ মরিলে বুড়োর মুখে নুড়ো জ্বেলে দিস।”৮ শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তিলে তিলে গড়ে তোলা ‘দুষ্টু দামাল’ আত্মজর কাছে তিনি সেবা যত্ন পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, মৃত্যুর পরও আত্মজসম কবিতাকে মুখাগ্নি করার কথা বলে যান। কবিতাকে নিয়ে এই কল্পনা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, কবি সুবীর মণ্ডলের হাতে বাংলা কবিতার ভাবনার জগতের এক দৃষ্টান্তমুলক বাঁক বদল ঘটে গেছে। ‘এক্সোডাস’ কাব্যে কবিতা নিয়ে নানারকম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন কবি। কবিতা রচনা সম্পর্কে তাঁর মতামতঃ

‘ধোঁয়া – ধুলো - কুবাতাস, প্রাত্যহিক বিষাদ বাঁচিয়ে কিছু শব্দ — উপার্জন, রেখে দিই প্রাণের ভিতর ফুলের কোরক যেন, স্বেদ – স্বপ্ন - ভালোবাসা দিয়ে রচি বা আনন্দ ঋতু — দেবশিশু খেলে একঘর।”৯

    ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ ও ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ কাব্য দুটিতে কবি সনেটকে সৃষ্টি করেছেন নতুনভাবে। আধুনিক সময়ের কবি সুবীর মণ্ডল অত্যন্ত সচেতনভাবে দক্ষতার সঙ্গে সনেটের ছন্দে বাঁধতে পেরেছেন তাঁর মনের ভাবকে। সনেটের সফল সৃষ্টির জন্য এই কাব্য দুটি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।  
    ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ কাব্যে কবি মানুষের কামনাবাসনাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। সমগ্র কাব্যের প্রত্যেকটি কবিতায় কামনা বাসনার মতো মানুষের আদিম প্রবৃত্তির অকৃত্রিম ভাষারূপ দিতে পেরেছেন। যোনি, স্তন, সঙ্গম, পরকীয়ার অকৃত্রিম বর্ণনায় কবি যৌনতাকে নতুন রূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তবে ‘শৃঙ্গার চতুর্দশী’ কাব্যে যৌনতার নিবিড় বর্ণনার পরও যৌনতা ছাপিয়ে সফল কবিতা হয়ে ওঠে সুবীর মণ্ডলের লেখনী কৌশলে। কবি মন্দাক্রান্তা সেন মনে করেনঃ

“এরকম বিশুদ্ধ কামের কবিতা, সমগ্র সংকলন জুড়ে, বাংলা সাহিত্যে, মধ্যযুগের পর, খুব বেশি লেখা হয়নি। এবং এ কাম আরও তুরীয় কেননা এ কাম পরকীয়া—”১০ “.....গ্রন্থটির অনবদ্য অঙ্গসজ্জা। খাজুরাহো ও কোনারকের অপূর্ব মিথুন মূর্তির ছবিগুলি, যেভাবে প্রতিটি কবিতার বাঁ পাশে মুদ্রিত, তাতে এই বইটি যেন এক কালেটর’স এডিশন হয়ে উঠেছে। অসামান্য এই গ্রন্থ পরিকল্পনা, যা কবির উত্তীর্ণ কবিতাগুলির পাশাপাশি আমাদের আরওবেশি করে মনে করিয়ে দেয় যৌনতা কখন কিভাবে শিল্প হয়ে উঠতে পারে। শিল্প হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জৈবনিকতারও একটা মধুর জীবনভাষ্যও বটে।”১১

    ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ কাব্যের মোট চারটি অংশ-- ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’, ‘শ্রীচরণকমলেষু’, ‘পাখিদের মেয়ে তুই’ আর ‘শিকড়ের ছেঁড়া টান’। জীবনে বিচিত্র ধরণের অনুভূতির জগৎ নিয়ে এ কাব্যটি নির্মিত। চির না ফেরার দেশে চলে যাওয়া মাকে চিঠি লিখে কবি বাবা, ভাই, বোন, ভগ্নিপোত, নিজের স্ত্রী, কন্যা সহ পরিবারের সকলের খবর পৌছে দেন মেঘ, বাতাস, নদীর মাধ্যমে। এখানে কবির চিন্তা ভাবনা মণ্ডল ‘মেঘদূত’ কাব্যের ভাবনাকে ছুঁইয়ে যায়। কবি যেন এখানে মেঘদূতের যক্ষঃ

“শ্রীচরণকমলেষু, মা আমার—কতদিন পর তোমাকে লিখছি ফের, এই চিঠি, যে তুমি এখন বৃত্তের বাহিরে থাকো, কোনোদিন পাও কী না পাও মেঘকে তলব করি, নদীকে ও বাতাসকে ডাকি—”১২ সনেটের বন্ধনে মনের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সুকৌশলে বাঁধতে পেরেছেন কবি এখানে। ‘মাটিতে পায়ের ছাপ’ কাব্যের আলোচনায় কবি সুজিত সরকার বলেছেনঃ “সুবীর মণ্ডলের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই কবি তাঁর সমস্তরকম আবেগ - অনুভূতি - বলবার কথাকে সনেটের চোদ্দো লাইনের বাঁধুনিতে অনায়াসেই প্রকাশ করতে সক্ষম। বাংলা কবিতায় এখন সনেট চর্চা কমে এসেছে। কিন্তু সুবীর মণ্ডল এই আঙ্গিকে কবিতা রচনায় দক্ষতার এমন এক শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছেন যে সদ্য লিখতে আসা অল্পবয়সী কবিরা তাঁর কবিতা পড়লে উপকৃত হবেন, বুঝতে পারবেন যে তাঁরা যে ভাষায় লিখতে চাইছেন সেই ভাষাতে সনেট রচনা সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সুবীর মণ্ডলের এই কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতায় একটি স্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে একদিন।”১৩ লাইফ লাইনে মৃত্যু

    সুবীর মণ্ডলের কাব্যজগত বৈচিত্রময়। সীমিত জীবনকালে তাঁর সৃষ্টি অতি সামান্য অথচ অসামান্য। তাঁর প্রতিভা প্রস্ফুটিত হবার আগেই যদি না ঝরে যেত তাহলে বাংলা কাব্য সংসার অনেক সমৃদ্ধ হোত। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে মা হারানো বেদনায় তিনি লিখলেন ‘আমার মায়ের চোখ থেকে তুলসীপাতা/ সরিয়ে নাও/ সহ্য হয় না’—শুরু হল কবি সুবীর মণ্ডলের পথ চলা। মা হারানো এক কৈশোরের করুণ কান্নায় ভারাক্রান্ত কবি সুবীর মণ্ডলের কবিতা পথ চলতে চলতে হঠাৎ করেই আবার কবিকে লিখতে হোল নিজেরই সীমিত জীবনের সমাপ্তির কাহিনী ‘লাইফ লাইন’। তাই কবি সুবীর মণ্ডলের কাব্যের আলোচনায় ‘লাইফ লাইন’ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ‘মৃত্যু’ কবিতায় লিখেছেন—‘মৃত্যু অজ্ঞাত মোর/আজি তার তরে/ ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে/ এত ভালোবাসি/ বলে হয়েছে প্রত্যয়/ মৃত্যুরে আমি ভালো/ বাসিব নিশ্চয়।’ রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃত্যু ছিল অজ্ঞাত, তাই মৃত্যুকে নিয়ে তিনি নানারকম রোম্যান্টিক কল্পনা করেছিলেন, মৃত্যুকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন। কিন্তু যে মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী, সময়ের আগে যাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মৃত্যু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁর পক্ষে কি মৃত্যুকে নিয়ে রোমাঞ্চকর কাহিনি রচনা সম্ভব? মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে কি মৃত্যুকে ভালোবাসার কথা বলা যায়? মৃত্যু অমোঘ, তাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যেতে গেলে হাত টেনে ধরে। শিয়রে যদি মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে তবে আর কি করার থাকে মানুষের? মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের মুখে কি কান্না ছাড়া কোনো কথা আসতে পারে? আসন্ন মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের কি উপলব্ধি হতে পারে, কোন কোন চিন্তা মানুষের মাথায় আসে, তার এক বিচিত্র অনুভবের ইতিকাব্য সুবীর মণ্ডলের ‘লাইফ লাইন’। সাক্ষাৎ মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে লিখে ফেলা আস্ত একখানা জীবন্ত কাব্য— যার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে মৃত্যুর কথা, মৃত্যু সম্পর্কে নানা চিন্তাভাবনা, মৃত্যুর নিবিড় অনুভূতি—বিচিত্র সব উপলব্ধি।

    মৃত্যু নিয়ে সাহিত্যে শিল্পে বহু আলোচনা হয়েছে। এই মৃত্যু কি? কিভাবে আসে মৃত্যু? মৃত্যু যন্ত্রণা কেমন হয়?  মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের চিন্তায় কোন কোন কথা আসে? মৃত্যুর পর নিজের স্ত্রী, কন্যা, আত্মীয়–পরিজন সকলের কি অবস্থা হয়? শিল্পী সাহিত্যিক কিম্বা সাধারণ মানুষ, যাঁরা কঠোর পরিশ্রমে তিলে তিলে যে সৃষ্টি করে গেছে তার অবস্থা কি হয় তাঁর মৃত্যুর পর? মৃত্যুর পর তার কথা কেউ কি ভাবে? মনে রাখে?— এসব জানার সুযোগ থাকে না মৃত ব্যক্তির কাছে। আসলে এগুলো মৃতের অধিকারের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু সৃজনশীল শিল্পীর কল্পনায় ধরা পড়ে মৃত্যুর সামগ্রিক চিত্র, না জানা নানা রকম কথা, মৃত্যুর আগের, মৃত্যুর সময়ের বা মৃত্যুর পরের নানারকম অবস্থা। স্টোকের মতো আকস্মিক মারণরোগে আক্রান্ত হয়ে সুবীর মণ্ডল মৃত্যু বিষয়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন, মৃত্যুর একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন, হাসপাতালের ডেটলের গন্ধ ভরা বেডে শুয়ে মৃত্যু সম্পর্কে সেই অভিজ্ঞতায় লিখে ফেললেন ‘লাইফ লাইন’ কাব্য। কাব্যের একেবারে শুরুতে মৃত্যু সম্পর্কে বললেনঃ

“মৃত্যুর সঙ্গে এই যা হল, তাকে সঙ্গম বলা যায়। বলা যায়, যে কোনো সঙ্গমের মতোই এ-ও একটা যুদ্ধ। এ-ও একটা যুদ্ধ, কেন না, ঘটনাটা ঘটার সময় কেউ কাউকে এক বিঘৎ-ও জমি ছেড়ে দেয় না; বরং কে, কত তাড়াতাড়ি অন্যজনকে ঘায়েল করতে পারে, প্রাণপণ মহড়া চলে তারই। এ যাত্রা মৃত্যুকে যে বিছানায় ফেলে চলে আসতে পেরেছি, মনে হচ্ছে কিসের যেন জোয়ার লেগেছে ভিতরে। মনে হচ্ছে, একটা কিছুর জন্ম হবে এখনই। একটা কিছু। সম্ভবত নীল রঙের আলো। আমি ঠিকই টের পাচ্ছি, জড়িয়ে ধরছে আমাকে। কাল যদি মৃত্যু আমাকে বিছানায় ফেলে চলে যায়, আমি এই উপলব্ধির কথা, এই ক-লাইন ডেটল গন্ধ, জনে জনে বলে যেতে চাই।”১৪

         জীবনের পরিনতি তো মৃত্যু। কিন্তু সময়ের আগে মারণরোগ যখন জীবনকে খাদের কিনারায় দাঁড় করায়, তখন একদিকে ‘চাঁদের ডাক’ আর অন্যদিকে ‘চিতাকাঠের ডাক’। চাঁদের ডাক রোমাঞ্চ জাগায়, কিন্তু চিতাকাঠের ডাক জাগায় আতঙ্ক। চাঁদের ডাক এড়ানো যায়, কিন্তু চিতাকাঠের ডাক তো অমোঘ; অনিবার্য। মৃত্যুচিন্তা মানুষকে অসহায় করে তোলে। মৃত্যু যখন একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন জীবন আর মৃত্যু নিয়ে শুরু হয় নানা চিন্তাভাবনা। এই মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের বিচিত্র উপলব্ধি সুবীর মণ্ডলের ‘লাইফ লাইন’; মৃত্যুপথযাত্রী এক মানুষের জীবন্ত উপলব্ধি।
    ঘোষিত হয়ে গেছে সময় বড় কম। জীবন আর মৃত্যুর মাঝের ‘জিরন খোলা’ হাসপাতাল। শমন শিয়রে দাঁড়িয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ‘সরি একটু দেরি হয়ে গেল’, কিম্বা ‘প্লিজ একটু দাঁড়াও’— এভাবে মৃত্যুকে থামানো যায় না জানেন কবি। কিন্তু বয়স তো মাত্র চল্লিশ, এই অসময়ে যাওয়া যায়! আশ্রয়হীন স্ত্রী, অভিভাবকহীন কন্যা, ছোট ছোট অপূরণীয় কত স্বপ্ন— এসব ফেলে যাওয়া যায়! এই অকালে মৃত্যুর সময় জীবন তো হাতছানি দিয়ে ডাকবেই। অসহ্য ডেটল – ঔষধ – ব্যাণ্ডেজের গন্ধ, সাদা কাপড় ঢাকা শবদেহ অসহায় বিপন্ন করে তোলে কবিকে। আর এই বিপন্নতা থেকে জন্ম নেয় জীবন-মৃত্যুর ছায়াছবি, একটা মৃত মানুষের জীবন্ত উপলব্ধি ‘লাইফ লাইন’। তাই ‘লাইফ লাইন’ অসহ্য এক আর্তি নিয়ে থেকে গেলো পাঠকের সামনে’।১৫ ‘লাইফ লাইনে’র সমগ্র কবিতা জুড়ে মৃত্যুর কথা, মৃত্যুর চিন্তা, মৃত্যুর আতঙ্ক, মৃত্যুর সঙ্গে হাসি ঠাট্টা— বিচিত্র সব উপলব্ধি। কবি দেবারতি মিত্র সুবীর মণ্ডলের মৃত্যু নিয়ে লেখা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

“বাংলা কবিতায় মৃত্যুর এই রূপ আশ্চর্যভাবে মৌলিক ও তুলনাহীন। বেশ কিছুদিন ধরে মৃত্যুর কাছাকাছি ছিলেন বলেই হয়তো তাঁর চেতনায় এরকম সূক্ষাতিসূক্ষ্ম কল্পনার অঙ্কুর গজাচ্ছিল।”১৬

আঠারো ভাটির উপকথাঃ প্রান্তিক মানুষের কথা

   কবি সুবীর মণ্ডল আজ কবিতা রসিকের কাছে নানা দিক থেকে পরিচিত। কিন্তু ভূমিপূত্র হিসাবে তিনি তাঁর প্রান্তিক সুন্দরবনের একেবারে সাধারণ মানুষ, তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে যে কাব্যটি লিখলেন তাকে বাদ দিয়ে সুবীর মণ্ডলের সাহিত্যর আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শৈশবকাল থেকে দেখা সুবীর মণ্ডলের ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা অনুভূতিকে কবি তাঁর ‘আঠারো ভাটির উপকথা’ কাব্যে ধরে রাখলেন। এর ফলে এই কাব্যটি সুবীর মণ্ডলের সাহিত্য ধারায় শুধু বৈচিত্র সৃষ্টি করল না, শহুরে মানুষদের সুন্দরবনের মানুষের বৈচিত্রময় জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিতও করে দিল। কাহিনীর আকারে আঞ্চলিক ভাষায় লেখা সুবীর মণ্ডলের ‘আঠারো ভাটির উপকথা’ তাই বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য গ্রন্থ।
          সুন্দরবনের পৌরানিক নাম ‘আঠারো ভাটি’। স্কটল্যাণ্ডের ধনী ব্যবসায়ী স্যার হ্যামিল্টন সাহেব মানুষের জন্য কিছু করার নেশায় রাজ ঐশ্বর্য ছেড়ে, অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে চলে আসেন। সেখানে ‘বাদা’ কেটে তৈরি করেন ‘আবাদ’। বন কেটে বসত গড়ে সুন্দরবনের ভূগোল দিলেন পাল্টে। ক্রমে হিংস্র ‘রয়্যালবেঙ্গল’ অধ্যুষিত সুন্দরবনের অরণ্যের ইতিহাসে শুরু হল আধুনিক মানব সভ্যতার অভ্যুত্থানের ইতিহাস। মা বনবিবির ‘আঠারো ভাটি’তে হিংস্র হুঙ্কার মুছে জেগে উঠল মানুষের কোলাহল। নদী থেকে মাছ - কাঁকড়া, জঙ্গল থেকে কাঠ – মোম – মধু সংগ্রহ করে অল্পদিনে বন বিবির ‘আঠারো ভাটি’ পরিণত হল রূপকথার স্বপ্নপুরী। তবে বাঘ কুমীর তাড়িয়ে বসত করার জন্য প্রতিনিয়ত নদীতে কুমীরের আর জঙ্গলে বাঘের হানা চলতে থাকে। তবুও থেমে থাকেনা সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষের জীবন। জীবনের চেনা পথ দিয়েই এগিয়ে চলে আঠারো ভাটির জীবন। কবি সুবীর মণ্ডল আশ্চর্য আঠারো ভাটির মানুষের জীবন – জীবিকা - মৃত্যু, প্রেম – ভালোবাসা, আনন্দ – অনুষ্ঠানের বিচিত্র কাহিনীতে লিখে ফেললেন আস্ত একটা কাব্য-- ‘আঠারো ভাটির উপকথা’। 
    ভূমিপুত্রের দায়িত্বে পরম মমতায় লিখলেন জল – জঙ্গলাশ্রিত মানুষদের জীবনের নানা চিত্র। কবি লিখলেন সুন্দরবনের মানুষরা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে, নৌকা থেকে কখনও কখনও জার ভর্তি মাধু নামে, নামে না সুধন্য মৌলেদের মত মানুষেরা। নিজের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নদীতে পড়ে ‘মীন’ ধরা ময়নার বিয়ের অল্পদিন আগে কুমিরে তার ‘সোন্দর’ পা কেটে নিয়ে চলে যায়। এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে মন্ত্রবলে বাঘ চালান করা হলধর আলিপুর জেলে চালান হয়ে যায় বাঘের চামড়া পাচার করার অপরাধে। নদীতে বাঁধ দিয়ে অরণ্যাশ্রিত দ্বীপ জলমুক্ত করেই সুন্দরবনের মানুষের বাস। তাই মাঝে মাঝে বাঁধ ভেঙে ‘আয়লা’র আতঙ্কে কেঁপে ওঠে সুন্দরবনের মানুষ। তবে সে স্মৃতি মুছে ফেলে মঙ্গল সর্দারেরা মোরগ বগলে সোজা চলে যায় লড়াইয়ের আসরে। নিজের প্রিয় মোরগ হেরে ‘পাউড়ে’র গ্লানি মাথায় নিয়ে দুঃখে গলা পর্যন্ত হাঁড়িয়া পান করে রাস্তায় সজোরে হাত চাপড়ে বলতে থাকে—‘গেল তো লাড় এট্টা ডিম গেল’। ‘সিউলি’ সমীরুদ্দি ‘মেয়েদের ব্লাউজ খোলা, সায়া ওঠানোর মতো করে খেজুর গাছের ‘ডেগো’ আর বাকলের জাল উঠিয়ে রাখে’। তারপর শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস বের করে। খেজুর গাছের রস বের করতে গিয়ে তার যৌন আকাঙ্খা জেগে ওঠে, মনে পড়ে যায় স্ত্রীর কথা। ‘হাঁসা’টা হারিয়ে গেলে হাঁসীর কষ্টের কথা ভেবে কেঁদে ওঠে ফুলবাসীর মন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ‘ধাড়ী’ বা ‘বকরী’দের পাল ধরাতে গিয়ে কার্ত্তিকের সাক্ষাৎ ঘটে তাঁর পূর্বপ্রেমিকার সঙ্গে। তার পাঁঠার মতো সেও পূর্ব প্রেমিকার সঙ্গে আদিম কামনায় মেতে ওঠে নিস্তব্ধ দুপুরে। বিয়ের পাঁচ বছর পরও সন্তান না হওয়া সোনাতনের বৌ সন্তান কামনায় সরল বিশ্বাসে ‘শঙ্খ’ লাগা সাপের সামনে পেতে দেয় নতুন গামছা। এভাবে সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপের মাটি ঘেঁষা মানুষের কথায় গড়ে উঠল সুবীর মণ্ডলের ‘আঠারো ভাটির উপকথা’। কবি বিভাস রায়চৌধুরীর কথায়ঃ

“মৃত্যু অনিবার্য, তাকে ভুলে থেকেই লীলা করতে হয় আমাদের। এই লীলাকেও চিনতে যে পেরেছিল সুবীর, তার প্রমাণ ‘আঠারো ভাটির উপকথা’র কবিতাবলি। প্রান্তিক জীবনের বিচিত্র গল্পাভাস কবিতাগুলোকে দিয়েছে অন্য মূল্য। ব্যক্তির বাইরে যে দিগন্তবিস্তৃত পৃথিবী, তার কবিতাগুলোকে দিয়েছে অন্য মূল্য।”১৭

সুবীর মণ্ডলের একমাত্র উপন্যাস পাউড়ঃ শুধুই পরাজয়

    সুবীর মণ্ডল বাংলা সাহিত্যে নব্বইয়ের দশকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিত। তাঁর কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যের নতুন সুর সংযোজন করেছিল একথা অস্বীকার করা যায় না। কবি সুবীর মণ্ডলের আত্মজীবনীমূলক একমাত্র উপন্যাস ‘পাউড়’ বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। আদ্যপান্ত মধ্যম পুরুষে লেখা এ উপন্যাস কবির নিজেরই জীবনের গদ্যময় কাহিনী। আদ্যোপান্ত মধ্যম পুরুষে লেখা পাউড় উপন্যাসে সুন্দরবনের গোসাবা থানার জল জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট সাতজেলিয়া দ্বীপের মানুষদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, সংস্কার, ভাষা, ধর্মবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে জল-জঙ্গল থেকে শহর কলকাতায় উঠে আসা স্কুল শিক্ষক কবির জীবন সংকটের কাহিনী ধরা আছে। লেখা আছে কবি সুবীর মণ্ডলের বার বার হেরে যাওয়া পৌরুষের কাহিনী।
    পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে আজও মোরগ লড়াই প্রচলিত। যুযুধান দুই মোরগের পায়ে ইস্পাতের ধারালো ‘অস্ত্র’ বেঁধে লড়াইয়ের আসরে ছেড়ে দেওয়া হয়। জীবনপণে দুই মোরগ পৌরুষের পরীক্ষা দিতে থাকে। যতক্ষণ না রণক্ষেত্রে একটা মোরগের মৃত্যু হয়, অথবা লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালায় ততসময় চলতে থাকে এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। জীবন যুদ্ধে যে মোরগ রক্ত বমি করে মরে বা যার পৌরুষ পরাজিত হয়,‘পাউড়ে’র অপমান জোটে তার ললাটে। অন্যদিকে যে মোরগ লড়াইয়ের ময়দানে প্রচণ্ড পরাক্রমে তার পৌরুষ প্রতিষ্ঠিত করে, সেই ‘জিতকারে’র গরিমায় গর্বিত হয় আখড়ায় সমবেত মানুষের কাছে। বাংলার আদিবাসী সমাজের প্রচলিত এই আকর্ষণীয় মোরগ লড়াইয়ের অনুসঙ্গে সুবীর মণ্ডল নিজের জীবনের করুন কাহিনীকে তুলে ধরলেন অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে। ‘পাউড়’ উপন্যাসে পরাজিত পাউড়ের ব্যঞ্জনায় ঔপন্যাসিক উপস্থাপন করলেন জীবনযুদ্ধে বার বার নিজেরই পরাজয়ের কাহিনি।
    উপন্যাসের নায়ক ‘তুমি’ সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের পরিবেশ ছেড়ে পড়াশোনার জন্য শহর কলকাতায় চলে আসেন। পড়াশোনা শেষে চাকরসূত্রে শহর কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান তিনি। গ্রামেরই মেয়ে সীমাকে নিয়ে শহর কলকাতায় ঘর বাঁধেন। তবে সীমাকে নিয়ে তাঁর বাঁধা ঘর কখনও সুখের নীড় হয়ে ওঠেনি। ‘অ্যাজোস্পার্মিয়া’ রোগে আক্রান্ত ‘তুমি’ অর্থাৎ সুবীর মণ্ডল অল্প দিনের মধ্যে জেনে যান তিনি কখনও বাবা হতে পারবেন না। চারিদিকের পরিচিত-অপরিচিতরা সহজে সন্তান জন্মদান করে চলেছে অনবরত। তাঁর ছোট বেলার বন্ধু কদমের ‘বছর বিয়নে বৌ’ বছরের পর বছর ‘মাইয়ে’ সন্তান প্রসব করে। তাঁর কৈশোরের প্রেমিকা মৌ নপুংসক অবিনাশকে বিয়ে করেও ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দেয় অবৈধভাবে। আই.সি.ডি.এস কর্মী শাশুড়ীর খাতায় লক্ষ্য করেন গ্রামের প্রধান গগনহরি ৫৫ বছর বয়সেও তার স্ত্রীকে স্বাভাবিকভাবে গর্ভবতী করে। কলেজ থেকে ফেরার পথে গৌরীকে সন্ধ্যার অন্ধকারেগ রেপ করে মানিক। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গর্ভবতী হয় গৌরী। এলাকার পঞ্চায়েত প্রধান বাজারে শুয়ে থাকা পাগলীর গর্ভে ডুকিয়ে দেয় ফলপ্রসু অবৈধ বীজ।  অথচ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল যুবক হয়েও তিনি তাঁর স্ত্রীকে গর্ভবতী করার উপযোগী বীজ বপন করতে পারেন না, পারেন না স্ত্রীর মা হবার সাধ মেটাতে। জীবের সহজ সৃষ্টি তার কাছে সারা জীবনের মতো অধরা থেকে গেলো। 
    এই পুরুষত্বহীনতা প্রতিমুহুর্ত ঔপন্যাসিককে কুরে কুরে খায়, অপমানিত হতে হয় সকলের কাছে। গ্রাম থেকে ডাক্তার দেখাতে আসা কাকার মেয়ে খুকু মৃত বাচ্চা প্রসব করলে হিজড়েরা তাঁরই বাচ্চা হয়েছে ভেবে টাকা নিতে আসে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা জানার পর তাঁকে ‘আঁটকুড়ো মাষ্টার তোর একটা ছেলে হয় না’ বলে গালাগালি দিয়ে চলে যায়। প্রতিমুহুর্তে তাঁকে ডাক্তারের কাছে শুনতে হয় উপহাস, অপমানকর কথাবার্তা। তাঁর স্কুলেরই এক গরীব মেধাবী ছাত্র দীনেশ, যাকে তিনি সন্তান স্নেহে বিনামূল্যে পড়াতেন, চাকরী পাবার পর পড়ার টাকা শোধ দিতে এসে অপমানের সুরে তাঁকে শুনিয়ে দেয়, ‘স্যার এমনি এমনি কেউ কারো বাবা হয় না’। এমনকি নিজেরই স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতি নিয়ত শুনতে হয়, ‘গর্ভধারণ তো আর ওষুধে হয় না’ বা (পুতুলের) ‘আমি তো প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি না’।– এমনই নানারকম শীতল অথচ শ্লেষাত্মক আক্রমণ।
    জীবের ‘সবচেয়ে সহজ সৃষ্টি’ তাঁর কাছে সারা জীবনের মতো অধরা থেকে গেলো। পরাজয়ের গ্লানিতে প্রচণ্ড রাগে ট্রাউজার খামচে ধরেন অসহায়ের মতো। সন্তানের জন্য হাহাকারে বাৎসল্যে কেঁদে ওঠে মন। স্ত্রীর মাতৃত্বের সাধ মেটাতে না পারার অপরাধবোধে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয় প্রতিনিয়ত। অসহায়ের মতো স্ত্রীকে কখনও পরপুরুষের বীজ গর্ভে ধারণ করার প্রস্তাব দেন, স্ত্রীর মাতৃত্বের সাধ পূরণ করার জন্য। কখনও ঈশ্বর অবিশ্বাসী হয়েও ঠাম্মার পাঠানো ভণ্ড সাধু ‘পাগলা বাবা’র ‘বাবা হওয়ার’ ওষুধ খেয়ে নেন অন্ধ বিশ্বাসে। যখন সব আশা শেষ, তখন দত্তক নিয়ে পিতৃত্বের স্বাদ মেটাতে চেয়েছেন। কিন্তু সে আশাও মেটে না তাঁর। ডাক্তার সুদীপের চেম্বারে গৌরীর অবৈধ সন্তানকে নিতের গিয়ে দেখেন, বারবার মৃত সন্তান জন্ম দেওয়া তাঁর খুড়তুতো বোন খুকি বসে আছে সন্তানটিকে নেবার জন্য। এভাবে সারা উপন্যাস জুড়ে ঘরে বাইরে বিধ্বস্ত কবির জীবনের গদ্যময় কাহিনী রচিত হয়েছে ‘পাউড়’ উপন্যাসে।
    পুরুষ হয়েও কবি এখানে সারা উপন্যাস জুড়ে পুরুষের পরিচয় রাখতে পারেননি। পৌরুষের পরাক্রমে স্ত্রীর গর্ভে ফলপ্রসু বীজ দিয়ে ভ্রূণ সঞ্চার তো দূরের কথা, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘ডোনারস্পার্ম’ ব্যবহারের মাধ্যমে গর্ভসঞ্চারেও বাধ সেধেছে তার মধ্যবিত্ত সংস্কারাচ্ছন্ন মন। এমনকি দত্তক নিয়েও স্ত্রীর মাতৃত্বের সাধ মেটাতে সফল হননি শেষপর্যন্ত। কখনও শারীরিক অক্ষমতা, কখনও মধ্যবিত্ত মনের সংকীর্ণতা, সংস্কারাচ্ছন্নতা, কখনও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পৌরুষ বড় অসহায়। জীবনভর পরাজয় জীবনযুদ্ধের ময়দানে ‘পাউড়ে’ পরিণত করেছে বারবার। সারা উপন্যাসের প্রতিটি অনুচ্ছেদ পরাজয়ের অপরাধবোধ আর গ্লানির করুণ কান্নায় ভারাক্রান্ত। কাহিনীর নায়ক কবির জীবন শেষপর্যন্ত কঠিন গদ্যে পরিণত হয়েছে। কবি সারা জীবনের মত কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে কঠিন গদ্যকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
    কবি সুবীর মণ্ডলের নিজের জীবনের কাহিনী ‘পাউড়’। সমগ্র উপন্যাসটিতে ‘মধ্যম পুরুষ কথন রীতি’ ব্যবহার করে তিনি উপন্যাসের কথন রীতির নতুনত্ব দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে মধ্যম পুরুষ কথন রীতিতে খুব কম উপন্যাস লেখা হয়েছে। কবির কলমে লেখা একমাত্র এ উপন্যাস ভাষা ব্যবহারের দক্ষতায় পাঠকের কাছে অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের মানুষের মুখের ভাষা, প্রচলিত সংস্কার বিশ্বাস, তাদের জীবনযাত্রা ইত্যাদির নিখুঁত ব্যবহারে এক বৈচিত্রময় ও আকর্ষণীয় কাহিনিকে সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তাই সুবীর মণ্ডলের একমাত্র উপন্যাস ‘পাউড়’ বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় উপন্যাসের দাবী রাখে।
                                            --------------------------


তথ্যসূত্রসম্পাদনা


"নিবন্ধ সৃষ্টিকরণ/subir mondal" প্রকল্প পাতায় ফিরুন।