ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতা

১৯২৪ সালে রেজা শাহ রাজপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।[১] তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ্য প্রদর্শন বা অভিব্যক্তি, যেমন মহিলাদের হিজাবচাদর পরিধান এবং পুরুষদের মুখের লোম (গোঁফ ব্যতীত) রাখাকে অবৈধ ঘোষণা করেন। জনসাধারণের ধর্মীয় অনুষ্ঠান (যেমন মুহররমআশুরা) উদযাপন নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলামিক ধর্মগুরুদের প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার করাকে নিষিদ্ধ করা হয়। মসজিদকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করা হয়।

ধর্মীয় রক্ষণশীলদের দ্বারা সমালোচিত এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দ্বারা স্বৈরাচারী হিসেবে চিহ্নিত হলেও রেজা শাহ ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার অভিপ্রায় ছিল সরকার ও সমাজের উপর শিয়া ধর্মগুরুদের প্রভাব অপসারণ করা। তার শাসনকালে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষ নীতির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানে সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামি চরমপন্থার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, আহমাদ কাসরাভির মত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ ও লেখকরা মুসলিম যোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। এসব যোদ্ধাদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিলেন নাভভাব সাফাভি, যিনি বর্তমানে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকার দ্বারা একজন বীর হিসেবে পরিচিত।

শাপুর বখতিয়ার, ইরানের শেষ ধর্মনিরপেক্ষ প্রধানমন্ত্রী

ইরানে ইঙ্গ–সোভিয়েত আক্রমণের মাধ্যমে ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী রেজা শাহকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত এবং নির্বাসিত করে। এভাবেই, ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতার যুগের অবসান ধটে। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে ইরানে গণতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হয় কিন্তু মধ্য ইরানের গ্রাম্য এলাকাসমূহে শিয়া ধর্মগুরুদের প্রাথমিক সমর্থন থাকায় তাদের পুনরায় পূর্বের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

১৯৫৩ সালের পরে ইরানি সরকার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য হারাতে থাকলে রেজা শাহের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিসমূহ পুনরধিষ্ঠিত এবং সরকার ও জনজীবন থেকে শিয়া ধর্মগুরু ও ধর্মের প্রভাব অপসারণ করার জন্য ব্যাপকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ১৯৬০ সালের পরে মোহাম্মদ রেজা পাহলাভি ধর্মতত্ত্বের ক্যাথলিক ও খ্রিষ্টীয় বিদ্যালয়সমূহের অনুকরণে শিয়া ধর্মগুরুদের ধর্মপ্রচারের ধর্মীয় সনদ ও অনুমতিপ্ত্র লাভ করার জন্য রাজ্য কর্তৃক পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। মোহাম্মাদ রেজা শাহ ১৯৭০ এর দশকে আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে শিয়া ধর্মগুরুদের আইনসভায় যোগদান থেকে বিরত রাখা এবং জনসম্মুখে ধর্ম ও ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম প্রদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

রেজা শাহ ও মোহাম্মাদ রেজা শাহ উভয়েই বিপ্লব পরবর্তী ফ্রান্স এবং ধর্ম ও রাজ্যের বিভেদের সমর্থনকারী চিন্তাভাবনার রাজনৈতিক ক্লাসিক্যাল আমেরিকান স্কুল দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তারা উভয়েই ইরানে ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য ব্রিটেনকে দোষারোপ করেন। এজন্যই, পাহলাভি সবলভাবে ইরানের সাথে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।[২] ১৯৭৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শাপুর বখতিয়ারের সরকারের পতন হলে ঐ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী মেহদি বাজারগানের নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ্‌ খামেনেই ও তার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সমর্থক গোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাহদি মুক্তবাজার অর্থনীতির আওতায় একটি জাতীয়তাবাদী ইসলামিক গণতান্ত্রিক[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে ইরানে মৌলবাদি ছাত্রদের দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর মেহদি বাজারগানের সরকার দল বেঁধে পদত্যাগ করে।[৩]

বাজারগানের সরকারের পতনকেই সরকারিভাবে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার সমাপ্তি বলে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রী দল আয়াতুল্লাহ খামেনেইকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগপূর্বক বর্তমানে প্রচলিত ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে।

ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ইসলামপন্থি সরকারবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষরা দেশটিতে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। পরে তাদেরকে ধর্মগুরুদের দ্বারা ধর্মদ্রোহী ও মুরতাদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং অনেককেই কারাদণ্ড, মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও নির্বাসন দেয়া হয়।

ইরানের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ্গণ ও ব্যক্তিত্বসম্পাদনা

  • রেজা শাহ
  • মোহাম্মাদ মোসাদ্দেঘ
  • আহমাদ কাসরাভি
  • দারিউশ ফরওউহার
  • শাপুর বখতিয়ার
  • ফজলুল্লাহ জায়েদি
  • দারিউশ হুমায়ুন
  • মোহাম্মাদ রেজা পাহলাভি
  • আমির-আব্বাস হোভেদা

আরও দেখুনসম্পাদনা

Referencesসম্পাদনা