আল-খাজনেহ

নাবাতাই রাজ্যের প্রাচীন মন্দির

আল-খাজনেহ (আরবি: الخزنة‎‎; "কোষাগার") প্রাচীন সময়ের আরব অধ্যুষিত নাবাতাই রাজ্যের পেত্রা শহরের সবচেয়ে বিস্তৃত মন্দিরগুলোর অন্যতম। আদ দেইর সহ এই প্রাচীন নগরীর অন্যান্য ভবনগুলোর মত এই কাঠামোটি পাথুরে পর্বত খোদাই করে নির্মাণ করা হয়েছে।

আল-খাজনেহ

বিশ্বাস করা হয় যে এই কাঠামো ছিল প্রথম শতাব্দীর নাবাতাই রাজা চতুর্থ আরেটাসের সমাধিসৌধ। এটি জর্ডান এবং এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেদুইনদের নিকট এটি আল-খাজনেহ নামে পরিচিত ছিল কেননা তাদের বিশ্বাস ছিল এই ভবনে গুপ্তধন রয়েছে।

নামসম্পাদনা

আরবিতে আল-খাজনেহ অর্থ "কোষাগার", এই নামটি দ্বিতীয় ধাপে উঁচুতে থাকা অলঙ্কৃত পাথরের কলসের কিংবদন্তি থেকে এসেছে যদিও বাস্তবিকভাবে এটি কোন নিরেট বেলেপাথর ছিলো না।[১]

একটি কিংবদন্তি বলে যে মিশরীয় ফারাও ও তার বাহিনী লোহিত সাগরের একত্র হওয়া থেকে পালিয়ে যায়, ফারাওয়ের সম্পদ নিরাপদে রাখার জন্য জাদু দিয়ে খাজনেহ নির্মাণ করে এবং তারপর মোশিকে ধরার প্রচেষ্টায় আবার বেড়িয়ে পড়ে।[১] এই কিংবদন্তির ফলে জায়গাটির নাম হয় খাজনেহ এল-ফারউন, "ফারাওয়ের কোষাগার"।[১]

আরেক কিংবদন্তি দাবি করে যে ডাকাত বা দস্যুরা তাদের লুট করা সম্পদ কলসে লুকিয়ে রেখেছিলো। কলসের উপর বুলেটের আঘাতের একাধিক চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়, বলা হয় গুপ্তধন পাওয়ার জন্য বেদুইনরা কলসটিতে গুলি করেছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন][সন্দেহপূর্ণ ]

ইতিহাসসম্পাদনা

 
সিক থেকে বেরিয়ে আসার সময় পেত্রার কোষাগারের প্রথম ঝলক (আল-খাজনেহ)

চতুর্থ আরেটাসের আমলে প্রথম শতাব্দীতে আল-খাজনেহকে প্রকৃতপক্ষে একটি সমাধিসৌধ এবং সমাধিগৃহ হিসেবে নির্মাণ করা হয়।[২]

ভবনটির স্থাপত্যের অনেকাংশ দুই হাজার বছরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে কারণ এটি পাহাড় থেকে খোদাই করে নির্মাণ করা হয়েছিল। ভবনের খোদাইকৃত ভাস্কর্যগুলো পরকালের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের বলে মনে করা হয়।[৩] মূর্তিগুলোর উপর চারটি ঈগলের মূর্তি রয়েছে যারা আত্মা বহন করে নিয়ে যায়। উপরের ধাপের মূর্তিগুলো দ্বি-কুড়াল বিশিষ্ট নৃত্যরত আমাজনদের। প্রবেশদ্বারটির নিকটে রয়েছে যমজ ক্যাস্টর এবং পোলাক্সের মূর্তি যারা আংশিকভাবে অলিম্পাসে এবং আংশিকভাবে পাতালে বাস করত।

পর্যটনের প্রভাবসম্পাদনা

 
রাতের বেলায় আল-খাজনেহতে পর্যটকেরা

১৮১২ সালে সুইস অভিযাত্রী জোহান লুডভিগ বার্কহার্ট পেত্রা শহর ও আল-খাজনেহ পুনরায় আবিষ্কার করেন। ১৯২০ এর দিকে পশ্চিম ইউরোপের লোকজন মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ ও পর্যটন আরও সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হওয়াতে পেত্রার নিকট একটি ছোট হোটেল চালু করা হয়। অন্যদিকে অজনপ্রিয় ছোট পেত্রায় পর্যটন গড়ে উঠার ফলে সেখানকার বেদুইনদের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামো বদলাতে শুরু করে।[৪]

বর্তমানে পর্যটন জর্ডানের আয়ের প্রধান উৎস।[৫] হোটেল, স্মারক দোকান, রেস্টুরেন্ট ও ঘোড়া রেন্টাল সেবা পেত্রা এলাকা ও এর আশেপাশে প্রাপ্যতা লাভ করে। অর্থনৈতিক প্রভাবগুলি মূলত ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসলেও, স্থানটি বর্ধিত পর্যটনের ফলে হুমকির সম্মুখীন হয়।

স্থান পরিদর্শনকারী বিপুল সংখ্যক লোকের আর্দ্রতা শুকনো বেলেপাথরের ক্ষতি করতে পারে। দেয়ালের সাথে হাত স্পর্শের কারণে স্টিয়ারিক এসিড জমার ফলে দেয়াল এবং কলামে সাদা দাগ দেখা দিয়েছে। দেয়ালে স্পর্শ, হেলান বা ঘর্ষণের কারণে খাজনের পৃষ্ঠতল দশ বছরেরও কম সময়ে ৪০ মিলিমিটার হ্রাস পেয়েছে।[৫]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেসম্পাদনা

আল-খাজনেহ বিভিন্ন হলিউড চলচ্চিত্রে দেখা গেছে, মূলত ১৯৮৯ সালের ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য লাস্ট ক্রুসেড চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে আবির্ভাবের পর জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে, এই চলচ্চিত্রে খাজনের প্রবেশদ্বারটি হাতায় এর নিকটে পবিত্র গ্রেইলের বিশ্রামস্থলের প্রবেশপথ হিসেবে দেখানো হয়। মন্দিরের ভেতরের দৃশ্য ইংল্যান্ডের এলস্ট্রি স্টুডিওতে ধারণ করা হয়।

পিবিএসের নোভা স্পেশাল লস্ট সিটি অব স্টোন এবং এনসিয়েন্ট মেগাস্ট্রাকচার্স: পেত্রা, পিবিএস এর টিভি ধারাবাহিক এবং ন্যাশনাল খাজনেহ ও নাবাতীয় স্থাপত্যশৈলী ও প্রকৌশল তত্ত্বকে উৎসর্গ করে তাদের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছিল।

খাজনেহকে হার্জের দুঃসাহসী টিনটিনের লোহিত সাগরের হাঙর, সিনবাদ অ্যান্ড দ্য আই অব দ্য টাইগার, স্কাই ১ ভ্রমণ ধারাবাহিক অ্যান ইডিয়ট অ্যাবরোড "ডোমিনিয়ন" এর দ্য সিস্টার অব দ্য মার্সি মিউজিক ভিডিও, ইতিহাস ধারাবাহিক দ্যা নেকড আর্কিওলজিস্ট, কোরীয় নাটক মিসাইং, ভিডিও গেম ওভারওয়াচ, এবং মরটাল কমব্যাট:আননিহিলেশন-এ দেখা গেছে। ২০০৭ সালের অ্যাসাসিন্স ক্রিড ভিডিও গেমে আলতাইর ইবন-লা আহাদ জেরুসালেমে সাবলের চতুর্থ রবার্টের সাথে একটি খিলানের দিকে লড়াই করতে থাকে যা খাজনেহ অবলম্বনে নকশা করা হয়েছে।

ত্রিমাত্রিক মডেল সমেত লেজার স্ক্যানিংসম্পাদনা

 
সম্পূর্ণ সম্মুখভাগ

অলাভজনক সংস্থা জামানি প্রজেক্ট ২০১২ সালে কোষাগার স্থানিকভাবে নথিভুক্ত করে, যা বিশেষভাবে ত্রিমাত্রিক বাস্তব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ডিজিটাল নথিভুক্তিকরণ করা হয়। ত্রিমাত্রিক মডেলের নমুনাটি জামানি প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।[৬] জামানি প্রজেক্ট উৎপন্ন তথ্য নিয়ে একটি স্থায়ী রেকর্ড তৈরি করেছে যা গবেষণা, শিক্ষা, পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যাবে।[৭][৮][৯][১০]

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Aretas, I। "Petra: History, Myth, and Earthquakes" (PDF)। পৃষ্ঠা 2–3। ২৮ ডিসেম্বর ২০০৪ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯ 
  2. "Jordan - Touristic Sites - South of Amman"। ১৩ মে ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০৫-২৮ 
  3. "Petra Map & Monuments"। AtlasTours.net। ৪ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০০৯Its elaborately carved facade is alive with a cast of Nabataean deities and mythological characters ... All are funerary symbols. 
  4. Shoup, John (Spring ১৯৮৫)। "The Impact of Tourism on the Bedouin of Petra"Middle East Journal39 (2): 277–291। জেস্টোর 4327067 
  5. Mustafa, Mairna Hussein; Tayeh, Sultan N. Abu (২০১১)। "The Impacts of Tourism Development on the Archaeological Site of Petra and Local Communities in Surrounding Villages"Asian Social Science7 (8)। ডিওআই:10.5539/ass.v7n8p88  
  6. এখানে
  7. Rüther, Heinz। "An African heritage database, the virtual preservation of Africa's past" (PDF)www.isprs.org 
  8. Rajan, Rahim S.; Rüther, Heinz (২০০৭-০৫-৩০)। "Building a Digital Library of Scholarly Resources from the Developing World: An Introduction to Aluka"। African Arts40 (2): 1–7। আইএসএসএন 0001-9933এসটুসিআইডি 57558501ডিওআই:10.1162/afar.2007.40.2.1 
  9. Rüther, Heinz; Rajan, Rahim S. (ডিসেম্বর ২০০৭)। "Documenting African Sites: The Aluka Project"। Journal of the Society of Architectural Historians। University of California Press। 66 (4): 437–443। জেস্টোর 10.1525/jsah.2007.66.4.437ডিওআই:10.1525/jsah.2007.66.4.437 
  10. "Site - Petra"zamaniproject.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১০-২৮ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

  উইকিমিডিয়া কমন্সে আল-খাজনেহ সম্পর্কিত মিডিয়া দেখুন।