আনন্দচন্দ্র রায়

বাঙালি সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ

আনন্দচন্দ্র রায় (১৮৪৪ — ১৯৩৫) একজন বাঙালি সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ।

প্রারম্ভিক জীবন

সম্পাদনা

আনন্দচন্দ্র রায় ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৪ সালে। তারা ছিলেন আদতে রাজশাহীর বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। পিতা গৌরসুন্দর রায় ঢাকার নীলকর জমিদার জেমস ওয়াইজের জমিদারি এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। আনন্দচন্দ্র ঢাকার পোগোজ স্কুলে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং পরে ওকালতি পাশ করে ঢাকার আদালতে কাজে যোগ দেন।[১]

কর্মজীবন

সম্পাদনা

আনন্দচন্দ্র রায় আইন ব্যবসায়ে যথেষ্ট খ্যাতি ও পয়সা অর্জন করেন। জমিদারি ক্রয় করে ঢাকায় সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন। তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ফটক নির্মাণ এবং মন্দিরের সার্বিক ব্যয়বহনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। নিজ এলাকায় স্ত্রী আনন্দময়ীর নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর সক্রিয়ভাবে স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ঢাকায় বিভিন্ন সভা সমিতিতে তিনি বক্তব্য রাখেন ও সরকারের কাছে আবেদন করেন পৌরসভাগুলিকে দেশীয়দের হাতে ন্যস্ত করার। তিনি Dacca People’s Association বা ঢাকা সাধারণ সভার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৮৮৪ সালের মিউনিসিপ্যালিটি আইন পাস হলে আনন্দচন্দ্র রায় ঢাকা পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হন ও ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পূর্ববঙ্গ জমিদার সভা ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। জগন্নাথ কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অবদান রাখেন । অবশ্য প্রথম দিকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ছিলেন না তিনি।[২] ভিক্টোরিয়া কলেজের পরিচালনা পর্ষদের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।[৩] বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন আনন্দচন্দ্র। এরপর তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১২ সালে তিনি ঢাকায় কংগ্রেস প্রাদেশিক সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। জনহিতৈষী কাজের জন্য সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর উপাধি দেয়।

ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম চেয়ারম্যান

সম্পাদনা

১৮৮৫ সালের ২০ এপ্রিল চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পদের জন্য সবদিক থেকেই তিনি ছিলেন যোগ্য। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি অবদান রাখতে পারছিলেন না। কিছুটা সাধারণভাবেই তিনি মিউনিসিপ্যালিটির কাজকর্ম শুরু করেন। ইউরোপিয়ানদের সাথে ভালো ইংরেজির মাধ্যমে যোগাযোগ করার ক্ষমতা তার ছিল কিন্তু মেথর, অর্ধ-শিক্ষিত, সাধারণ কর্মচারীদের সাথে তিনি একাত্ম হতে পারেননি। যার ফলে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হল কমিশনার আর শহরের সাধারণ অধিবাসীদের মধ্যে। এছাড়া নিজ দলের লোকদের পদোন্নতি দেয়ার চেষ্টাও অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তোলে। এই ব্যাপারগুলো আরও বিকট আকার ধারণ করে যখন আনন্দচন্র রায় এবং তার দলের লোকরা গৃহকর আরও বাড়িয়ে দেয়। এটি যদিও বাংলা সরকারের আদেশেই করা হয়েছিল। এর বিরোধিতা করেছিল ঢাকার মুসলমান সমাজ। খাজা আব্দুল গণিকে তারা অনুরোধ করতে থাকেন তাদের এই প্রতিবাদে একাত্ম হওয়ার। এতো কিছুর মাঝেও আনন্দচন্দ্র রায়ের ভাবমূর্তি ছিল সাধারণ। তার প্রতি অসন্তোষ আরও প্রকট হয় যখন তিনি লেফটেন্যান্ট-গভর্নর স্যার রিভার্স থমসনের ঢাকা সফর উপলক্ষ্যে ঢাকা শহর সাজানোর জন্য ২৭০/- টাকা বরাদ্দ দেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষ থেকে মামলাও করা হয়। আর মামলার নেতৃত্ব দেন জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক শ্রী প্রসণ্ণকুমার বোস। এই ঘটনায় আনন্দচন্দ্র রায় খুবই মর্মাহত হন। পরবর্তী নির্বাদনে তিনি আর প্রতিদন্দ্বিতা করেন নি। ঢাকার উন্নয়নে আনন্দচন্দ্র রায় যদিও খুব একটা প্রভাব রাখতে পারেন নি তবে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিকে একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অনেক।[৪]

আনন্দচন্দ্র রায় ১৯৩৫ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।[৫]

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. "রায়, আনন্দচন্দ্র - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১১ 
  2. "ইতিহাসের আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১১ 
  3. "বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার স্মরণীয় বরণীয়-রায় বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায়" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১১ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  4. আহমেদ, শরীফ উদ্দিন (২০০১)। ঢাকা ইতিহাস ও নগর জীবন। ধানমন্ডি, ঢাকা: শাহিনা রহমান, একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিসার্স লাইব্রেরি। পৃষ্ঠা ২৭৭–২৮২। আইএসবিএন 9843233751 
  5. প্রতিবেদক, নড়িয়া বার্তা (২০১৯-০৫-০৭)। "ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান নড়িয়ার আনন্দচন্দ্র রায়"নড়িয়া বার্তা (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১১ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]