অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলা

অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলা[১] (পূর্বনাম: উত্তর-পূর্ব রংপুর জেলা) হচ্ছে বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যের একটি পূর্বতন জেলা। ব্রিটিশ শাসিত বাংলার বৃহত্তর রংপুর জেলা থেকে পৃথক করে আসামে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আসামের শাসকদের দ্বারা জেলাটি গঠিত হয়। বর্তমান আসাম রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের ৬টি জেলা পূর্বে এই জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। সেগুলো হলো: গোয়ালপাড়া, ধুবড়ী, কোকড়াঝাড়, চিরাং, বঙ্গাইগাঁওদক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলা

ইতিহাস

সম্পাদনা

ঐতিহাসিক পটভূমি

সম্পাদনা

এই অঞ্চলটি প্রথম সহস্রাব্দে কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল। পরবর্তীকালে কামরূপ রাজ্যের বিভক্তির পর অঞ্চলটি কামতা রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। ১৪৯৮ সালে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের কামতা বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলটি বাংলা সালতানাতের অন্তর্ভূক্ত হয়। বাংলা সালতানাতের আমলে অঞ্চলটি রাঙামাটি নামে পরিচিত ছিল। ১৫০৫-০৯ সালের মধ্যে হোসেন শাহের পুত্র ও কামতার শাসক শাহজাদা দানিয়াল তথা দুলাল গাজীকে পরাজিত করে আসামের বারো ভূঁইয়ারা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর ১৫১৫ সালের দিকে তাদের হটিয়ে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয় কোচ রাজবংশ। অবশেষে ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে কোচ রাজ্য ভেঙে গেল অঞ্চলটি কোচ হাজো রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। কিন্তু আহোম-মুঘল সংঘাত (১৬১৯-১৬৮২) শুরু হওয়ার পর মুঘলরা অঞ্চলটি জয় করে অঞ্চলটিকে বাংলা সুবাহর অন্তর্ভূক্ত করে। তবে মাঝে ১৬৫৮ সালের দিকে প্রায় তিন বছর ধরে অঞ্চলটি আহোমদের প্রভাবাধীন থাকলেও এটি আহোম অঞ্চলের নিয়মিত অংশ ছিল না।[২] মুঘলদের অধীনে এর প্রশাসনিক এলাকা সরকার ঢেকুরি নামে গঠিত হয়।[৩] বাংলায় নবাবি শাসনের পতনের পর ১৭৬৫ সালে পুরো বাংলার সাথে এই অঞ্চলটিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা এলাকাটিকে রংপুর প্রশাসনের অধীনে পরিচালনা করতে শুরু করে। অর্থাৎ, সেসময় থেকে গোয়ালপাড়া ছিল রংপুর জেলার অংশ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সীমান্ত নীতির অংশ হিসাবে ১৮১৬ সালের কিছু পরে এই অঞ্চলটিকে নিয়ে "রংপুরের উত্তর-পূর্ব অংশ" নামে একটি বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করা হয়। ১৮২২ সালের জানুয়ারিতে ডেভিড ডেভিড স্কটকে এর সিভিল কমিশনার নিযুক্ত করা হয়েছিল।[৪]

গোয়ালপাড়া গঠন

সম্পাদনা

বর্মীদের কাছ সাথে উত্তর-পূর্ব ভারতের দখল নেওয়ার প্রত্যাশায় পূর্ব সীমান্তকে পৃথক একটি সামরিক কমান্ডের অধীনে রাখা হয়েছিল। ডেভিড স্কটকে উত্তর-পূর্ব সীমান্তের রাজনৈতিক দিক এবং আসাম বিষয়গুলোরর তদারকির জন্য গভর্নর-জেনারেলের এজেন্ট হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল।[৫] প্রথম ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধের প্রথম মাসের মধ্যে (মার্চ ১৮২৪), রংপুর, কামরূপ ও দরং অঞ্চলের পূর্বদিকের অঞ্চলগুলো (পূর্ববর্তী আহোম রাজ্যের অধীনস্থ ও পরে বার্মী দখলাধীনে) ব্রিটিশদের দখলে চলে আসে।[৬] ১৮২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে নতুন অধিগ্রহণকৃত অঞ্চলটি "উত্তর-পূর্ব রংপুর" হিসেবে প্রধান কমিশনার ডেভিড স্কটের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আসে।[৭] সেসময় থেকেই প্রথমবারের মতো গোয়ালপাড়ার পূর্বের কামরূপ এবং দরং (মূলত পূর্বতন কোচ হাজোর অংশ) পশ্চিম আসাম (পরে নিম্ন আসাম) হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।[৮]বর্মীরা ১৮২৫ সালে আহোম রাজ্যের রাজধানী বর্তমান আসামের রংপুর ত্যাগ করে এবং ১৮২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ইয়ান্দাবো চুক্তির পরে সাদিয়া এবং বেংমারা অর্থাৎ মটক রাজ্যের (১৮০৫-১৮৩৯) আওতাধীন অঞ্চলগুলো ব্যতীত পুরো আহোম রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং পূর্ব আসাম নামে পরিচিতি লাভ করে। পশ্চিম ও পূর্ব আসামকে সিনিয়র ও জুনিয়র কমিশনার নামে দুটি কমিশনারের অধীনে রাখা হয়েছিল। সিনিয়র কমিশনারের জুনিয়র কমিশনারদের উপর কিছু অগ্রাধিকার ক্ষমতা ছিল। ১৮২৮ সালে জুনিয়র কমিশনারশিপ বিলুপ্ত করা হয়।

১৮৩৩ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন "উত্তর-পূর্ব রংপুর" গোয়ালপাড়া জেলা হিসাবে গঠিত হয়।[৯] ১৮৬৫ সালে ভুটান যুদ্ধ বা ডুয়ার যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা ডুয়ার্সের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং গোয়ালপাড়া সংলগ্ন অংশগুলি এতে যুক্ত হয়।

আসামের অন্তর্গত

সম্পাদনা

১৮৩৩ সাল থেকে অঞ্চলটি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীনে আসামের একটি জেলা হিসেবে ছিল। ১৮৭৪ সালে চিফ কমিশনারের প্রদেশ হিবেবে "নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার" বা উত্তর-পূর্ব সীমান্ত তথা আসাম প্রদেশ গঠিত হলে গোয়ালপাড়া সরাসরি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নিয়ন্ত্রণ থেকে পৃথক হয়ে আসামের অংশ হয়। কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে গোয়ালপাড়া উক্ত প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯১২ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত এই অবস্থা স্থায়ী হয়। এরপর গোয়ালপাড়া পুনরায় আসাম প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের সময় তৎকালীন গোয়ালপাড়া জেলা স্বাধীন ভারতের আসাম রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়।

বর্তমান অবস্থা

সম্পাদনা

বর্তমান আসাম রাজ্যের অংশ হিসেবে গোয়ালপাড়া একাধিকবার বিভাজিত হয়। ১৯৮৩ সালে গোয়ালপাড়া জেলা থেকে পৃথক করে ধুবড়ীকোকড়াঝাড় জেলা গঠন করা হয়। এরপর ১৯৮৯ সালে তৎকালীন গোয়ালপাড়া ও কোকড়াঝাড় জেলা দুটো থেকেই অংশবিশেষ নিয়ে নতুন বঙ্গাইগাঁও জেলা জেলা গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আবার ২০০৪ সালে বঙ্গাইগাঁওকোকড়াঝাড় থেকে অংশবিশেষ নিয়ে চিরাং জেলা গঠন করা হয়। সবশেষ ২০১৬ সালে তৎকালীন ধুবড়ী জেলা থেকে পৃথক করে দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলা গঠন করা হয়। উক্ত ছয়টি জেলার মধ্যে কোকড়াঝাড়চিরাং ২০০৩ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত বড়োল্যান্ডের অংশ। এছাড়া বর্তমান গোয়ালপাড়া জেলা ১৯৯৫ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত রাভা হাজং ও বাকি ধুবড়ী, বঙ্গাইগাঁও ও দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলা ২০২০ সাল থেকে কামতাপুর স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের অংশ।

আরও দেখুন

সম্পাদনা

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. http://lsi.gov.in/library/handle/123456789/3171 [অকার্যকর সংযোগ]
  2. " Ahom territory (i e, by and large, the Brahmaputra Valley without the Goalpara district)."(Guha 1983)
  3. (Dutta 1995)
  4. (Bannerjee 1992)
  5. (Banerjee 1992, পৃ. 5)
  6. (Banerjee 1992, পৃ. 5–6)
  7. (Bannerjee 1992, পৃ. 6)
  8. "The territory on the (west)—Biswanath to Goalpara—was known as western Assam; but another name—Lower Assam—gradually came into use" (Bannerjee 1992, পৃ. 9)
  9. (Bannerjee 1992)

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা

 

  • Bannerjee, A C (১৯৯২)। "Chapter 1: The New Regime, 1826-31"। Barpujari, H K। The Comprehensive History of Assam: Modern PeriodIV। Guwahati: Publication Board, Assam। পৃষ্ঠা 1–43। 
  • Dutta, Birendranath (১৯৯৫)। A Study of the Folk Culture of the Goalpara Region of Assam। Guwahati, Assam: University Publication Department, Gauhati University। 
  • Hunter, William Wislon (১৮৭৯)। A Statistical Account of Assam1। Trübner & co.। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১২-১৩ 
  • Guha, Amalendu (ডিসেম্বর ১৯৮৩), "The Ahom Political System: An Enquiry into the State Formation Process in Medieval Assam (1228-1714)", Social Scientist, 11 (12): 3–34, জেস্টোর 3516963, ডিওআই:10.2307/3516963