এই নিবন্ধটি দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত নয়; এটি শারদীয়া দুর্গাপূজার ‘অকালবোধন’ ধারণা-সংক্রান্ত}}

কৃত্তিবাসি রামায়ণ গ্রন্থে বর্ণিত রাম কর্তৃক দুর্গার অকালবোধনের দৃশ্য; খিদিরপুর ভেনাস ক্লাবের পূজামণ্ডপ, কলকাতা, ২০১০।

অকালবোধন হল শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি অথবা শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে হিন্দু দেবী দুর্গার পূজারম্ভের প্রাক্কালে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, শরৎকাল দেবলোকের রাত্রি দক্ষিণায়নের অন্তর্গত। তাই এই সময় দেবপূজা করতে হলে, আগে দেবতার বোধন (জাগরণ) করতে হয়। একাধিক পুরাণ ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে যে, রাবণ বধের পূর্বে রাম দেবী দুর্গার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে বিল্ববৃক্ষতলে বোধনপূর্বক দুর্গাপূজা করেছিলেন। শরৎকাল দেবপূজার ‘শুদ্ধ সময়’ নয় বলে রাম কর্তৃক দেবী দুর্গার বোধন ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত হয়। উল্লেখ্য, শাস্ত্রমতে বসন্তকাল দুর্গাপূজার প্রশস্ত সময় হলেও, আধুনিক যুগে শারদীয়া দুর্গাপূজাই অধিকতর প্রচলিত।

নাম-ব্যুৎপত্তিসম্পাদনা

সংস্কৃত ‘অকাল’ ও ‘বোধন’ শব্দদুটি বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ‘অকাল’ শব্দের অর্থ ‘অসময়, শুভকর্মের অযোগ্য কাল[১] বা অনুপযুক্ত কাল’।[২]। অন্যদিকে ‘বোধন’ শব্দটির অর্থ ‘উদ্বোধন, নিদ্রাভঙ্গকরণ, বা জাগান’[৩] ‘অকালবোধন’ শব্দবন্ধটির অর্থ ‘অসময়ে বোধন বা জাগরণ, (হিন্দু সংস্কারে) অসময়ে দেবী দুর্গার আরাধনা’।[৪]। এই প্রসঙ্গে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস লিখেছেন:[৫]

যে সময় (শ্রাবণ হ’তে পৌষ) দুর্গা পূজা হয় তখন সূর্য্যের গতি দক্ষিণ দিক্‌ দিয়া হয়। এই ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। অপর ছয় মাস (মাঘ হ’তে আষাঢ়) উত্তরায়ণ। উত্তরায়ণ দেবতাদের দিন এবং দক্ষিণায়ণ রাত্রি। রাত্রিকালে দেবী [দুর্গা] নিদ্রিত থাকেন বলিয়া তাঁহার বোধন করিয়া পূজা করিতে হয়। সাধারণত ষষ্ঠীতেই বোধন আরম্ভ হয়, পূজার পূর্ব্বদিন সায়ংকালে ষষ্ঠী না থাকিলে ও তৎপূর্ব্বদিনে থাকিলে তৎপূর্ব্বদিনেই বোধন হয়।

অপরপক্ষে দুর্গাপূজার বিধিসম্মত সময়কাল হল হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে চৈত্র মাস; যে পূজা বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত।[৬] হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে, রাজা সুরথসমাধি বৈশ্য দুর্গাপূজা করেছিলেন বসন্তকালেই। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ গ্রন্থে রয়েছে, রাজা সুরথ চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী ও নবমী তিথিতে শাস্ত্রবিধিমতে দেবী দুর্গতিনাশিনীর (দুর্গা) পূজা করেছিলেন। বসন্তকাল উত্তরায়ণের অন্তর্গত। উত্তরায়ণে দেবতারা জাগ্রত থাকেন বলে বাসন্তীপূজায় বোধনের প্রয়োজন হয় না।[৭]

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, প্রথম ভাগ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ও সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০০০ মুদ্রণ, পৃ. ৭
  2. আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ২০০৯ মুদ্রণ, পৃ. ৩
  3. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, দ্বিতীয় ভাগ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ও সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৯৮ মুদ্রণ, পৃ. ৭
  4. আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ২০০৯ মুদ্রণ, পৃ. ৪
  5. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, দ্বিতীয় ভাগ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ও সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৯৮ মুদ্রণ, পৃ. ১৬৪৫
  6. "Akaal Bodhan Article" 
  7. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২০০৫ মুদ্রণ, পৃ. ৩৮

পাদটিকাসম্পাদনা

১. “পূজিতা সুরথেনাদৌ দেবী দুর্গতিনাশিনী।
মধুমাসসিতাষ্টম্যাং নবম্যাং বিধিপূর্বকম্‌।।”, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, প্রকৃতি খণ্ড, ১/১৪৭

বহিঃসংযোগসম্পাদনা